ক্যালকুলেটর মুহূর্তে উত্তর দেয়, কিন্তু মাদ্রাসার ফিকহের পরীক্ষা, মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে বণ্টন বুঝিয়ে দেওয়া, কিংবা নিজে হিসাব মিলিয়ে দেখার জন্য হাতে অংক কষতে জানা দরকার। ফারায়েজের অংকে আসল কৌশল একটিই: সব ভগ্নাংশকে একটি সাধারণ সংখ্যায় রূপান্তর করা, যাতে প্রত্যেকের ভাগ পূর্ণসংখ্যায় লেখা যায়।
আউল আর রদ ধারণা হিসেবে কী, তা আলাদা লেখায় আছে — আউল কী ও রদ কী। এখানে শুধু খাতা-কলমের পদ্ধতি। নিচের প্রতিটি উদাহরণের ফল সাইটের ক্যালকুলেটরে মিলিয়ে দেখা।
ধাপ ০: কে কোন শ্রেণিতে
অংক শুরুর আগে ওয়ারিশদের দুই দলে ভাগ করুন — কারা নির্দিষ্ট অংশধারী (স্বামী, স্ত্রী, মা, বাবা, মেয়ে, বোন ইত্যাদি), আর কারা অবশিষ্টভোগী (ছেলে, ভাই, চাচা ইত্যাদি)। কেউ বঞ্চিত হলে তাঁকে বাদ দিন। এই ধাপে ভুল হলে পরের অংক যতই নিখুঁত হোক, ফল ভুল হবে। তালিকা দুটি দেখুন জাবিল ফুরুজ কারা ও আসাবা কারা লেখায়।
ধাপ ১ ও ২: মূল সংখ্যা ও অবশিষ্ট — প্রথম উদাহরণ
ওয়ারিশ: স্বামী, এক ছেলে, এক মেয়ে (স্ত্রীর মৃত্যু)।
- নির্দিষ্ট অংশধারী শুধু স্বামী — সন্তান থাকায় ১/৪। হর ৪, তাই মূল সংখ্যা ৪।
- স্বামী ৪-এর ১ ভাগ। বাকি ৩ ভাগ ছেলে-মেয়ের।
- ছেলে-মেয়ের মাথা গুনুন: ছেলে = ২, মেয়ে = ১, মোট ৩। অবশিষ্ট ৩ ভাগ ৩ মাথায় ঠিকঠাক ভাগ হয় — ছেলে ২, মেয়ে ১।
| ওয়ারিশ | মূল সংখ্যা ৪-এ ভাগ | ভগ্নাংশ |
|---|---|---|
| স্বামী | ১ | ১/৪ |
| ছেলে | ২ | ১/২ |
| মেয়ে | ১ | ১/৪ |
| মোট | ৪ | ১ |
ধাপ ৩: তাসহীহ — ভাগ যখন মাথাপিছু মেলে না
ওয়ারিশ: স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে।
- স্ত্রী সন্তান থাকায় ১/৮ → মূল সংখ্যা ৮। স্ত্রী ১, অবশিষ্ট ৭।
- ছেলে-মেয়ের মাথা: ২ + ১ = ৩। কিন্তু ৭ ভাগকে ৩ দিয়ে ভাগ করা যায় না।
- সমাধান: মূল সংখ্যাকে মাথার সংখ্যা ৩ দিয়ে গুণ করুন → ৮ × ৩ = ২৪। এটিই তাসহীহ (সংশোধিত সংখ্যা)।
- এখন প্রত্যেকের ভাগকেও ৩ দিয়ে গুণ করুন: স্ত্রী ১ × ৩ = ৩; অবশিষ্ট ৭ × ৩ = ২১, যা ৩ মাথায় ৭ করে — ছেলে ১৪, মেয়ে ৭।
| ওয়ারিশ | মূল ৮-এ | তাসহীহ ২৪-এ | ভগ্নাংশ |
|---|---|---|---|
| স্ত্রী | ১ | ৩ | ১/৮ |
| ছেলে | ৭ | ১৪ | ৭/১২ |
| মেয়ে | ৭ | ৭/২৪ | |
| মোট | ৮ | ২৪ | ১ |
একই পদ্ধতিতে স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে হলে মাথা হয় ২ + ২ + ১ = ৫; ৭ ভাগ ৫-এ মেলে না, তাই ৮ × ৫ = ৪০ — স্ত্রী ৫, প্রত্যেক ছেলে ১৪, মেয়ে ৭। ক্যালকুলেটরের ফল: স্ত্রী ১/৮, দুই ছেলে মিলে ৭/১০, মেয়ে ৭/৪০ — অর্থাৎ ৫/৪০, ২৮/৪০ ও ৭/৪০।
ধাপ ৪ক: আউল — যোগফল মূল সংখ্যা ছাড়িয়ে গেলে
ওয়ারিশ: স্বামী, দুই মেয়ে, বাবা, মা।
- অংশ: স্বামী ১/৪, দুই মেয়ে ২/৩, বাবা ১/৬, মা ১/৬। হর ৪, ৩, ৬ → ল.সা.গু. ১২।
- ১২-এ বসান: স্বামী ৩, মেয়েরা ৮, বাবা ২, মা ২ → যোগফল ১৫।
- ১৫ > ১২, অর্থাৎ ভাগ বেশি, সম্পত্তি কম। তখন ১৫-কেই নতুন হর ধরুন — মূল সংখ্যা ১২ থেকে ১৫-তে আউল হলো।
- ফল: স্বামী ৩/১৫ = ১/৫, দুই মেয়ে ৮/১৫, বাবা ২/১৫, মা ২/১৫।
লক্ষ করুন, আউলে কারও অংশ বাদ যায় না — সবার অংশ একই অনুপাতে ছোট হয়। মূল সংখ্যা ৬ থেকেও আউল হয়: যেমন স্বামী ও দুই আপন বোন থাকলে স্বামী ৩, বোনেরা ৪ → ৭; ফল স্বামী ৩/৭, দুই বোন ৪/৭। এই পূর্ণ পারিবারিক হিসাবটি দেখুন স্বামী, দুই মেয়ে ও বাবা-মা থাকলে আউলসহ পূর্ণ হিসাব লেখায়।
ধাপ ৪খ: রদ — ভাগ দেওয়ার পরও কিছু থেকে গেলে
নির্দিষ্ট অংশের যোগফল মূল সংখ্যার চেয়ে কম, আর বাকিটা নেওয়ার মতো অবশিষ্টভোগী নেই — তখন রদ। পদ্ধতি দুই রকম, স্বামী-স্ত্রী আছেন কি না তার উপর।
(ক) স্বামী-স্ত্রী নেই: মা ও এক আপন বোন। মা ১/৩, বোন ১/২ → মূল ৬-এ মা ২, বোন ৩, যোগফল ৫। বাকি ১ ভাগ তাঁদেরই অনুপাতে ফেরে — তাই সরাসরি ৫-কে হর ধরুন: মা ২/৫, বোন ৩/৫।
(খ) স্বামী বা স্ত্রী আছেন: স্ত্রী, এক মেয়ে, মা। স্বামী-স্ত্রী রদ পান না, তাই দুই ধাপে করুন:
- প্রথমে স্ত্রীর অংশ আলাদা করুন: ১/৮। বাকি ৭/৮।
- রদ পাবেন মেয়ে (১/২) ও মা (১/৬)। তাঁদের অনুপাত ৩ : ১ (৬-এর ভিত্তিতে ৩ ও ১)।
- বাকি ৭/৮-কে ৩ : ১ হারে ভাগ করুন: মেয়ে ৭/৮ × ৩/৪ = ২১/৩২, মা ৭/৮ × ১/৪ = ৭/৩২।
- হাতে লেখার সুবিধায় মূল সংখ্যা ৩২: স্ত্রী ৪, মেয়ে ২১, মা ৭।
এই পরিবারের পূর্ণ বণ্টন আছে স্ত্রী, এক মেয়ে ও মা ওয়ারিশ হলে লেখায়।
শেষ ধাপ: টাকায় বা জমিতে রূপান্তর
চূড়ান্ত মূল সংখ্যা পেলে বাকি কাজ সহজ — মোট সম্পত্তিকে সেই সংখ্যা দিয়ে ভাগ করে প্রত্যেকের ভাগ দিয়ে গুণ করুন। যেমন ৪৮ লাখ টাকা ও তাসহীহ ২৪ হলে এক ভাগ = ২ লাখ; স্ত্রী ৩ ভাগ = ৬ লাখ, ছেলে ১৪ ভাগ = ২৮ লাখ, মেয়ে ৭ ভাগ = ১৪ লাখ। জমির শতক, কাঠা বা বিঘায় রূপান্তরের নিয়ম আছে জমি ভাগের হিসাব লেখায়।
একজন ওয়ারিশ ভাগের আগেই মারা গেলে দুটি আলাদা মাসআলা মিলিয়ে একটি সাধারণ সংখ্যায় আনতে হয় — এর নাম মুনাসাখা; ধাপগুলো দেখুন এক ওয়ারিশ ভাগ পাওয়ার আগেই মারা গেলে লেখায়।
যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়
- ভুল ১ — বঞ্চিত ওয়ারিশকে বাদ না দিয়েই মূল সংখ্যা ঠিক করা। ধাপ ০ আগে।
- ভুল ২ — তাসহীহ করার সময় শুধু অবশিষ্টভোগীদের ভাগ গুণ করা, স্ত্রী বা অন্যদের ভাগ গুণ না করা। সবার ভাগ একই সংখ্যায় গুণ করতে হয়।
- ভুল ৩ — ছেলে-মেয়ের মাথা গোনার সময় ছেলেকে ১ ধরা। ছেলে ২ মাথা, মেয়ে ১ মাথা।
- ভুল ৪ — আউলে বড় অংশধারীর ভাগ থেকে কেটে বাকিদের পূর্ণ দেওয়া। আউলে সবার অংশ সমানুপাতে কমে।
- ভুল ৫ — রদে স্বামী বা স্ত্রীকেও বাড়তি অংশ দেওয়া।
- ভুল ৬ — অবশিষ্টভোগী থাকা সত্ত্বেও রদ করা। অবশিষ্টভোগী থাকলে বাকিটা তাঁরই, রদের প্রশ্ন ওঠে না।
হাতের অংক ক্যালকুলেটরে মিলিয়ে নিন
খাতায় কষা ফল সঠিক কি না, একই ওয়ারিশ তালিকা বসিয়ে মুহূর্তে যাচাই করুন।
উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটরে হিসাব করুন →প্রাথমিক সূত্র
- কুরআন ৪:১১–১২ — সন্তান, মা-বাবা ও স্বামী-স্ত্রীর নির্দিষ্ট অংশ
- কুরআন ৪:১৭৬ — বোনের অংশ
- সহিহ বুখারি ৬৭৩২ — নির্ধারিত অংশের পর অবশিষ্ট
প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
সম্পর্কিত লেখা
বি.দ্র. এই লেখার হিসাব হানাফি ফারায়েজ নীতির সাধারণ ব্যাখ্যা। বাস্তব বণ্টনের আগে ওয়ারিশের পূর্ণ তালিকা, ঋণ ও ওসিয়ত যাচাই করে নিন।