ফারায়েজের হিসাব শেষ হলে হাতে আসে কয়েকটি ভগ্নাংশ — কেউ ১/৮, কেউ ৭/২০, কেউ ৭/৪০। কিন্তু বাস্তবে ভাগ করতে হয় জমি, আর জমির হিসাব হয় শতাংশ, কাঠা বা বিঘায়। ভগ্নাংশ থেকে জমিতে পৌঁছানোর এই ধাপটাতেই সবচেয়ে বেশি ভুল হয়।

মূল সূত্র — তিনটি ধাপ

  • ধাপ ১: ফারায়েজ অনুযায়ী প্রত্যেকের ভগ্নাংশ বের করুন
  • ধাপ ২: মোট জমি × ভগ্নাংশ = ওই ওয়ারিশের জমি
  • ধাপ ৩: একাধিক ওয়ারিশ একই শ্রেণীতে থাকলে তাঁদের মোট জমিকে সংখ্যা দিয়ে ভাগ করুন
ধাপ ৩ সবচেয়ে বেশি ভুল হয়। ফারায়েজের হিসাব সাধারণত গোষ্ঠীর মোট অংশ দেয় — যেমন “দুই ছেলে ৭/১০”। এটি দুজনের মোট, একজনের নয়। জনপ্রতি হিসাব করতে হলে ভাগ করতে হবে। গোষ্ঠীর অংশকে একজনের ভেবে নিলে জমি দ্বিগুণ হয়ে যায়।

এককের হিসাব

এককবর্গফুটশতাংশে
১ শতাংশ (ডেসিমেল)৪৩৫.৬
১ কাঠা৭২০১.৬৫২৯
১ বিঘা (২০ কাঠা)১৪,৪০০৩৩.০৫৭৯
১ একর৪৩,৫৬০১০০

বাংলাদেশে সবচেয়ে প্রচলিত মান। অঞ্চলভেদে কাঠা ও বিঘার মাপ ভিন্ন হতে পারে, তাই দলিলের কাজে স্থানীয় সার্ভেয়ারের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।

একটি পূর্ণ উদাহরণ

ধরুন মৃত ব্যক্তি রেখে গেছেন ১২০ শতাংশ জমি (প্রায় ১.২ একর)। ওয়ারিশ — স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে। ঋণ বা ওসিয়ত কিছু নেই, পুরো জমিই বণ্টনযোগ্য। প্রথমে ভগ্নাংশ:

এবার ভগ্নাংশগুলোকে জমিতে রূপান্তর করা যাক। খেয়াল করুন, ছেলেদের সারিতে গোষ্ঠীর মোট ও জনপ্রতি — দুটোই আলাদা করে দেখানো হয়েছে:

ওয়ারিশঅংশজমি (শতাংশ)কাঠায়বর্গফুটে
স্ত্রী১/৮১৫৯.০৭৫৬,৫৩৪
দুই ছেলে একসাথে৭/১০৮৪৫০.৮২৩৬,৫৯০.৪
প্রতি ছেলে৭/২০৪২২৫.৪১১৮,২৯৫.২
মেয়ে৭/৪০২১১২.৭০৫৯,১৪৭.৬
মোট১২০৭২.৬৫২,২৭২

মিলিয়ে দেখুন — ১৫ + ৮৪ + ২১ = ১২০ শতাংশ। যোগফল মোট জমির সমান না হলে কোথাও ভুল আছে।

হিস্যা থেকে জমি — খতিয়ানের ক্ষেত্রে

খতিয়ানে সাধারণত প্রতিটি মালিকের হিস্যা ভগ্নাংশে লেখা থাকে, আর দাগে জমির পরিমাণ আলাদা করে। আপনার জমি বের করতে হলে ওই দাগের মোট জমিকে আপনার হিস্যা দিয়ে গুণ করুন।

পুরনো খতিয়ানে হিস্যা আনা-গণ্ডা-কড়ায় লেখা থাকতে পারে। সেখানে পুরো সম্পত্তি ১৬ আনা ধরা হয় — অর্থাৎ ৮ আনা মানে অর্ধেক, ৪ আনা মানে এক-চতুর্থাংশ, ২ আনা মানে এক-অষ্টমাংশ।

আনায় হিস্যাভগ্নাংশেশতকরা
১৬ আনা১০০%
৮ আনা১/২৫০%
৪ আনা১/৪২৫%
২ আনা১/৮১২.৫%
১ আনা১/১৬৬.২৫%

একাধিক দাগ থাকলে প্রতিটি দাগের হিস্যা আলাদা হতে পারে — প্রতিটি আলাদা করে হিসাব করুন।

ভাগ করার সময় যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেন

  • জমির সব অংশ সমান মূল্যের নয়। রাস্তার পাশের জমি আর পেছনের জমি একই শতাংশ হলেও দাম আলাদা। শুধু পরিমাণ সমান করলেই ন্যায্য ভাগ হয় না।
  • ভগ্নাংশে জমি ভাগ করা সবসময় বাস্তবসম্মত নয়। ছোট জমি টুকরো করলে কারো কাজেই আসে না। এমন ক্ষেত্রে একজন নিয়ে অন্যদের টাকায় ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সমঝোতা হতে পারে।
  • দখল আর মালিকানা আলাদা। কে কোথায় থাকেন তার সঙ্গে কে কতটুকুর মালিক তার সম্পর্ক নেই।
  • নাবালকের অংশ আলাদা রাখতে হয়। তাঁর পক্ষে কেউ ছাড় দিতে পারেন না।

বাংলাদেশের আইনে বিশেষ বিধান

ফারায়েজ অনুযায়ী মালিকানা মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই জন্মায়, কিন্তু কাগজে-কলমে সেটি প্রতিষ্ঠিত করতে আলাদা প্রক্রিয়া লাগে — ওয়ারিশ সনদ, নামজারি এবং প্রয়োজনে বণ্টননামা দলিল। এই প্রক্রিয়া শেষ না হলে জমি বিক্রি বা বন্ধক রাখতে সমস্যা হয়।

অর্থাৎ হিসাব করে জেনে নেওয়া এক জিনিস, আর সেই হিসাব সরকারি রেকর্ডে তোলা আরেক জিনিস। দুটোই আলাদা করে করতে হয়।

জমির হিসাব সহজ করে নিন

ভগ্নাংশ থেকে শতাংশ, কাঠা ও বিঘা — জমির হিস্যা ক্যালকুলেটরে এক ক্লিকে হিসাব করে নিতে পারেন।

জমির টুলস খুলুন →

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১ শতাংশ = ৪৩৫.৬ বর্গফুট। হিসাবটি একর থেকে আসে — ১ একর ৪৩,৫৬০ বর্গফুট, আর ১ শতাংশ তার একশো ভাগের এক ভাগ।
না, সেটি দুজনের মোট। উদাহরণে দুই ছেলে একসাথে ৮৪ শতাংশ পাচ্ছেন, অর্থাৎ প্রত্যেকে ৪২ শতাংশ। একাধিক ওয়ারিশ একই শ্রেণীতে থাকলে সবসময় ভাগ করে নিতে হবে।
আইনগতভাবে প্রত্যেকের অংশ ঠিকই থাকে। বাস্তবে অনেক পরিবার সমঝোতা করেন — একজন পুরো জমি নিয়ে অন্যদের বাজারমূল্যে টাকা দিয়ে দেন। সবাই প্রাপ্তবয়স্ক ও সম্মত হলে এতে বাধা নেই।
পুরো সম্পত্তি ১৬ আনা ধরে হিসাব করুন। ৪ আনা মানে এক-চতুর্থাংশ, ২ আনা মানে এক-অষ্টমাংশ। এরপর ওই ভগ্নাংশ দিয়ে দাগের জমি গুণ করলেই আপনার জমি পাওয়া যাবে।
না। এখানে দেশের সবচেয়ে প্রচলিত মান ধরা হয়েছে — ১ কাঠা ৭২০ বর্গফুট, ১ বিঘা ২০ কাঠা। কিছু অঞ্চলে স্থানীয় প্রথা ভিন্ন, তাই দলিলের কাজে স্থানীয়ভাবে যাচাই করে নিন।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। প্রতিটি পরিবারের অবস্থা আলাদা এবং ছোট একটি তথ্য পুরো হিসাব বদলে দিতে পারে। দলিল, নামজারি বা বণ্টননামার আগে স্থানীয় আলেম ও আইনজীবীর সঙ্গে মিলিয়ে নিন।