কারো মৃত্যুর পর পরিবারের ভেতর সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি ওঠে তা হলো — কে কতটুকু পাবেন। কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে আরেকটি প্রশ্ন আছে যা প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয়: ভাগ করার মতো সম্পত্তি আসলে কতটুকু? মৃত ব্যক্তি যা রেখে গেছেন তার পুরোটা ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ হয় না। তার আগে তিনটি দায় মেটাতে হয়, নির্দিষ্ট ক্রমে। সেই ক্রম উল্টে গেলে হিসাবটাই ভুল হয়ে যায়।

এই লেখায় পুরো প্রক্রিয়াটি একসাথে ধাপে ধাপে দেখানো হলো — শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। প্রতিটি ধাপের বিস্তারিত আলাদা লেখায় আছে, এখানে থাকছে মানচিত্রটি।

চারটি ধাপ — এই ক্রমেই

ধাপকীকতটুকু
দাফন-কাফনের খরচযুক্তিসঙ্গত, মধ্যম মানের
ঋণ পরিশোধসম্পূর্ণ — যত টাকাই হোক
ওসিয়ত কার্যকর১ ও ২ বাদ দেওয়ার পর যা থাকে তার সর্বোচ্চ ১/৩
ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টনযা অবশিষ্ট থাকে, তার পুরোটা

প্রথম তিনটি ধাপ শেষ না করে চতুর্থ ধাপে যাওয়া যায় না।

ক্রমটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, একটি উদাহরণেই পরিষ্কার হয়। ধরুন ঋণ পরিশোধের আগেই ওয়ারিশরা সম্পত্তি ভাগ করে নিলেন। পরে পাওনাদার এলে দেখা যাবে টাকা আর নেই — জমি বিক্রি হয়ে গেছে, ভাগ হয়ে গেছে। তখন প্রত্যেক ওয়ারিশের কাছ থেকে টাকা ফেরত চাইতে হবে, আর সেটি প্রায়ই আদালত পর্যন্ত গড়ায়।

ধাপ ১ — দাফন-কাফনের খরচ

সবার আগে মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনের প্রয়োজনীয় খরচ তাঁর সম্পত্তি থেকেই যায়। গোসল, কাফনের কাপড়, খাটিয়া, কবর খনন, পরিবহন — এগুলো এর মধ্যে পড়ে। খরচটি হবে মধ্যম মানের — মৃত ব্যক্তি জীবদ্দশায় যেমন পোশাক পরতেন তার সমতুল্য। অপচয় নয়, আবার কৃপণতাও নয়।

কুলখানি, চেহলাম বা মিলাদের খাওয়ার খরচ এর মধ্যে পড়ে না। ওগুলো ওয়ারিশদের নিজেদের সিদ্ধান্ত ও নিজেদের টাকায় — বিশেষ করে যদি ওয়ারিশদের মধ্যে নাবালক কেউ থাকেন, কারণ তাঁর অংশ থেকে তাঁর অনুমতি ছাড়া কিছু খরচ করা যায় না।

কোন খরচ ধরা যাবে আর কোনটি নয়, কে দেবেন, সম্পত্তি না থাকলে কী হবে — বিস্তারিত আছে দাফন-কাফনের খরচ কে দেবে লেখায়।

ধাপ ২ — ঋণ পরিশোধ

এরপর মৃত ব্যক্তির সব ঋণ পরিশোধ হবে। ব্যাংক ঋণ, ব্যক্তিগত ধার, বাকিতে কেনা মালের দাম, অপরিশোধিত দেনমোহর — সবই ঋণের মধ্যে পড়ে। ঋণের পরিমাণ যদি মোট সম্পত্তির সমান বা বেশি হয়, তাহলে ওয়ারিশরা কিছুই পাবেন না। তবে ওয়ারিশদের নিজেদের সম্পদ থেকে ঋণ শোধ করার বাধ্যবাধকতাও নেই — দায় সম্পত্তি পর্যন্তই।

একটি বিষয় অনেকে ভুল বোঝেন: ঋণ বাদ দিলে ওয়ারিশদের ভগ্নাংশ বদলায় না। স্ত্রী ১/৮-ই পাবেন, ছেলে আসাবাই থাকবেন। শুধু ভগ্নাংশটি কোন অঙ্কের উপর বসছে সেটি ছোট হয়।

ঋণসহ পূর্ণ হিসাব ও উদাহরণ আছে ঋণ থাকলে সম্পত্তি কীভাবে ভাগ হবে লেখায়।

ধাপ ৩ — ওসিয়ত

মৃত ব্যক্তি যদি কারো জন্য ওসিয়ত করে গিয়ে থাকেন, সেটি এবার কার্যকর হবে। কিন্তু দুটি শর্ত আছে। এক, পরিমাণ সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ — আর সেই এক-তৃতীয়াংশ হিসাব হয় দাফন ও ঋণ বাদ দেওয়ার পরের অঙ্কের উপর, মোট সম্পত্তির উপর নয়। দুই, ওয়ারিশের জন্য ওসিয়ত চলে না — যিনি এমনিতেই ভাগ পাচ্ছেন তাঁকে অন্য ওয়ারিশদের সম্মতি ছাড়া ওসিয়ত করে বাড়তি দেওয়া যায় না।

সীমা, ব্যতিক্রম ও উদাহরণ আছে ওসিয়ত কতটুকু করা যায় লেখায়।

ধাপ ৪ — ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন

তিনটি ধাপ শেষ হলে যা অবশিষ্ট থাকে, সেটিই ফারায়েজ অনুযায়ী ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ হয়। এই ভাগের নিজস্ব একটি ক্রম আছে — প্রথমে যাঁদের অংশ কোরআনে নির্দিষ্ট করা আছে (স্ত্রী, স্বামী, মা, বাবা, মেয়ে প্রমুখ) তাঁরা নিজেদের ভাগ পান, তারপর যা থাকে তা যান অবশিষ্টভোগীদের কাছে।

পুরো প্রক্রিয়া একটি উদাহরণে

ধরুন একজন মারা গেছেন। তিনি রেখে গেছেন ২০,০০,০০০ টাকার সম্পত্তি। ওয়ারিশ — স্ত্রী, দুই ছেলে, এক মেয়ে ও মা।

ধাপবিবরণটাকাঅবশিষ্ট
শুরুমোট সম্পত্তি২০,০০,০০০
দাফন-কাফন৫০,০০০১৯,৫০,০০০
ব্যাংক ঋণ১,৫০,০০০১৮,০০,০০০
ওসিয়ত (এতিমখানায়)১,০০,০০০১৭,০০,০০০

ওসিয়তের সর্বোচ্চ সীমা ছিল ১৮,০০,০০০ এর এক-তৃতীয়াংশ = ৬,০০,০০০ টাকা। এখানে ১,০০,০০০ দেওয়া হয়েছে, তাই সীমার মধ্যেই আছে।

এখন এই ১৭,০০,০০০ টাকা ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ হবে। নিচের হিসাবটি হানাফি ফারায়েজের নিয়ম অনুযায়ী তৈরি:

ওয়ারিশঅংশ১৭,০০,০০০ টাকায়
স্ত্রী১/৮২,১২,৫০০
মা১/৬২,৮৩,৩৩৩
দুই ছেলে (একসাথে)১৭/৩০৯,৬৩,৩৩৩
— প্রতি ছেলে১৭/৬০৪,৮১,৬৬৭
মেয়ে১৭/১২০২,৪০,৮৩৩

উপরের ভগ্নাংশগুলো ১৭ লাখের উপর নয়, পুরো বণ্টনযোগ্য অংশের উপর — অর্থাৎ ১৭ লাখই এখানে ১০০%।

একটি সাধারণ ভুল এখানেই হয়। উপরের টেবিলে “দুই ছেলে একসাথে ১৭/৩০” লেখা আছে — এটি দুজনের মোট, একজনের নয়। একাধিক ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী বা ভাই-বোন থাকলে ফারায়েজের হিসাব প্রথমে গোষ্ঠীর মোট অংশ বের করে, তারপর তা সমান ভাগে বিভক্ত হয়। গোষ্ঠীর অংশকে একজনের অংশ ভেবে নিলে হিসাব দ্বিগুণ-তিনগুণ ভুল হয়ে যায়।

যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়

  • ক্রম উল্টে ফেলা। আগে ভাগ করে পরে ঋণ শোধ করতে গিয়ে সমস্যা তৈরি হয়।
  • ওসিয়তের এক-তৃতীয়াংশ মোট সম্পত্তির উপর ধরা। এটি দাফন ও ঋণ বাদ দেওয়ার পরের অঙ্কের উপর।
  • কুলখানি-চেহলামের খরচ সম্পত্তি থেকে নেওয়া। এটি দাফনের খরচের মধ্যে পড়ে না।
  • দেনমোহরকে উত্তরাধিকারের অংশ ভাবা। অপরিশোধিত দেনমোহর ঋণ — ধাপ ২-তে আলাদা করে যায়, তারপর স্ত্রী নিজের ১/৮ বা ১/৪ অংশ আলাদাভাবে পান।
  • নাবালক ওয়ারিশের অংশ থেকে খরচ করা। তাঁর অনুমতি দেওয়ার বয়স হয়নি, তাই তাঁর অংশ অক্ষত রাখতে হয়।

বাংলাদেশের আইনে বিশেষ বিধান

উপরের চারটি ধাপ ক্লাসিক হানাফি ফারায়েজের। বাংলাদেশে এর সাথে একটি বড় ব্যতিক্রম যুক্ত হয়েছে — ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৪ ধারা। কোনো ছেলে বা মেয়ে যদি বাবা-মায়ের আগে মারা গিয়ে থাকেন, প্রচলিত ফারায়েজে তাঁর সন্তানরা কিছুই পেতেন না। ৪ ধারা সেই সন্তানদের অংশ পাওয়ার অধিকার দিয়েছে।

এই ব্যতিক্রমটি কেবল ওই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতেই প্রযোজ্য, সব ক্ষেত্রে নয়। বিস্তারিত আছে এতিম নাতি-নাতনির অংশ ও ধারা ৪ লেখায়।

আপনার নিজের পরিবারের হিসাব করুন

ওয়ারিশদের নাম ও সম্পদের পরিমাণ দিন — মুহূর্তেই পাবেন বিস্তারিত বণ্টন তালিকা, হিসাবের ধাপ এবং প্রিন্টযোগ্য রিপোর্ট।

ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

দাফন-কাফনের খরচ আগে। এটিই প্রথম ধাপ। এরপর ঋণ, তারপর ওসিয়ত, সবশেষে ওয়ারিশদের বণ্টন।
না। দায় মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তি পর্যন্তই। ওয়ারিশদের নিজেদের সম্পদ থেকে শোধ করার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে কেউ স্বেচ্ছায় শোধ করতে চাইলে সেটি তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত।
হ্যাঁ। ওসিয়ত না থাকলে দাফন ও ঋণ বাদ দেওয়ার পর যা থাকে তার পুরোটাই সরাসরি ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ হবে।
ফারায়েজের দিক থেকে মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই ওয়ারিশদের মালিকানা জন্মায়, তাই দেরি করলে অধিকার নষ্ট হয় না। তবে দেরি হলে বাস্তবে জটিলতা বাড়ে — দখল, নামজারি ও কাগজপত্র নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়।
না, সেটি সবার মিলিত অংশ। উদাহরণে দুই ছেলে একসাথে ১৭/৩০ পাচ্ছেন, অর্থাৎ প্রত্যেকে ১৭/৬০। একইভাবে একাধিক স্ত্রী থাকলে তাঁরা মিলে ১/৮ পান, প্রত্যেকে আলাদা করে নয়।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। প্রতিটি পরিবারের অবস্থা আলাদা এবং ছোট একটি তথ্য পুরো হিসাব বদলে দিতে পারে। দলিল, নামজারি বা বণ্টননামার আগে স্থানীয় আলেম ও আইনজীবীর সঙ্গে মিলিয়ে নিন।