“বাবা বেঁচে থাকতে ফুফুরা কখনো মুখ ফুটে চাননি, বাবাও দেননি। এখন বাবা নেই — জমি তো আমাদের নামেই রেকর্ড।” বাংলাদেশের বহু পরিবারে এই অবস্থা চলে আসছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। দাদার জমিতে মেয়েদের ভাগ দেওয়া হয়নি, তারপর ভাইয়েরা মারা গেছেন, এখন তাঁদের সন্তানেরা সেই জমি নিজেদের মধ্যে ভাগ করতে বসেছেন।

বাবার ভুলের দায় সন্তানদের নয় — কিন্তু বাবার রেখে যাওয়া সম্পদের মধ্যে অন্যের হক মিশে থাকলে সেটি আলাদা না করে ভাগ করা সন্তানদের নিজেদের দায় হয়ে দাঁড়ায়।

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী: আটকে রাখা অংশ তরিকা নয়

উত্তরাধিকারের মালিকানা মৃত্যুর মুহূর্তেই তৈরি হয়। দাদা যেদিন মারা গেছেন, সেদিনই ফুফুরা সূরা নিসার ১১ নম্বর আয়াতে নির্ধারিত অংশের মালিক হয়েছেন। নামজারি হোক বা না হোক, দখল কার হাতে থাকুক — মালিকানা বদলায়নি।

তাই বাবা যা দখলে রেখেছিলেন, তার একটি অংশ ছিল ফুফুদের আমানত, বাবার সম্পত্তি নয়। মৃত ব্যক্তির কাছে থাকা অন্যের জিনিস তাঁর তরিকায় ঢোকে না — এই সাধারণ নীতির বিস্তারিত আছে মৃত ব্যক্তির কাছে থাকা অন্যের জিনিস কি তরিকায় গণ্য হবে লেখায়।

বিষয়টি কতটা গুরুতর: সূরা নিসার ১৩–১৪ নম্বর আয়াতে মিরাসের সীমা লঙ্ঘনের ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী আছে। আর সহিহ বুখারির ২৪৫২ নম্বর হাদিসে এসেছে, কেউ অন্যায়ভাবে কারও জমি দখল করলে কিয়ামতের দিন সাত স্তর জমিন তার গলায় বেড়ি হিসেবে পরানো হবে। যে সন্তান জেনেও ফুফুর অংশ নিজের ভাগে তুলে নেন, তিনি নিজেই এই দায়ে যুক্ত হন।

ধাপে ধাপে কী করবেন

  1. দাদার মৃত্যুর দিন ধরে হিসাব করুন — দাদা মারা যাওয়ার সময় কারা জীবিত ছিলেন, তাঁদের নিয়ে দাদার সম্পত্তি ভাগ করুন। এখানে ফুফুদের অংশ বেরিয়ে আসবে।
  2. ফুফুদের অংশ আলাদা করুন — যে জমি বা সম্পদ ফুফুর অংশ, তা বাবার সম্পত্তির তালিকা থেকে বাদ দিন।
  3. ফুফু জীবিত না থাকলে — তাঁর অংশ তাঁর নিজের ওয়ারিশদের: তাঁর সন্তান, স্বামী, আর প্রয়োজনে অন্যরা। অর্থাৎ ফুফাতো ভাই-বোনেরা এর হকদার হতে পারেন।
  4. তারপর বাবার সম্পত্তি ভাগ — বাবার নিজের অংশ, নিজের অর্জিত সম্পদ — এগুলো নিয়ে বাবার মৃত্যুর দিনের ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ করুন।

ভাগের আগেই কোনো ওয়ারিশ মারা গেলে কীভাবে ধাপে ধাপে হিসাব সাজাতে হয়, তা আছে এক ওয়ারিশ ভাগ পাওয়ার আগেই মারা গেলে লেখায়।

একটি উদাহরণ

দাদা মারা গিয়েছিলেন ৫০ শতক জমি রেখে; দাদি তাঁর আগেই মারা গেছেন। ওয়ারিশ ছিলেন দুই ছেলে (আপনার বাবা ও চাচা) এবং এক মেয়ে (আপনার ফুফু)।

হিসাব অনুযায়ী প্রত্যেক ছেলে ২০ শতক, ফুফু ১০ শতক। কিন্তু ফুফুর ১০ শতক বাবা দখলে রেখেছিলেন, তাই বাবার হাতে ছিল ৩০ শতক।

বাবার হাতে থাকা জমিপরিমাণকার
দাদার কাছ থেকে বাবার নিজের অংশ২০ শতকবাবার তরিকা — বাবার ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ হবে
ফুফুর আটকে রাখা অংশ১০ শতকফুফু বা তাঁর ওয়ারিশদের — ফেরত দিতে হবে

বাবার ওয়ারিশরা ভাগ করবেন ২০ শতক (আর বাবার অন্য সম্পদ), ৩০ শতক নয়।

জমি বিক্রি হয়ে গেলে বা হাতবদল হয়ে গেলে

বাবা যদি ফুফুর অংশসহ জমি বিক্রি করে থাকেন, তাহলে ফুফুর অংশের মূল্য তাঁর প্রাপ্য থেকে যায়; সেটি বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে পরিশোধের প্রশ্ন আসে — ঠিক যেমন অন্য ঋণ আগে পরিশোধ হয়, তারপর মিরাস। দেখুন মৃত ব্যক্তির ঋণ থাকলে সম্পত্তি কীভাবে ভাগ হবে। মূল্য কোন দিনের দামে ধরা হবে, কতটুকু ফেরত দিতে হবে — এসব নির্দিষ্ট পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে; যোগ্য আলেমের কাছে পুরো তথ্য দিয়ে ফয়সালা নিন।

ফুফু যদি নিজেই ছেড়ে দেন

প্রাপ্তবয়স্ক ফুফু সবকিছু জেনে-বুঝে, খুশিমনে নিজের অংশ ভাইয়ের সন্তানদের দিয়ে দিতে পারেন — এটি তাঁর অধিকার। কিন্তু দুটি বিষয় মনে রাখুন:

  • “ফুফুরা তো কখনো চাননি” — চুপ থাকা মানে ছেড়ে দেওয়া নয়। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা সম্পর্ক রক্ষার জন্য বা লজ্জায় চাননি।
  • ফুফু মারা গিয়ে থাকলে তাঁর সন্তানেরা এখন হকদার — ফুফুর নীরবতা তাঁদের হক বাতিল করে না।

একই কথা মেয়েরা কি বাবার ভিটেবাড়ির অংশ পায় লেখাতেও আলোচিত হয়েছে — স্বেচ্ছায় ছাড়া আর চাপে ছাড়ানো এক নয়।

বাংলাদেশের আইন ও প্রক্রিয়ায়

  • রেকর্ড আর মালিকানা — খতিয়ানে বাবার নাম থাকা মানেই ফারায়েজের দৃষ্টিতে পুরো জমি বাবার নয়। রেকর্ড ও দলিলের পার্থক্য বুঝতে দেখুন খতিয়ান, পর্চা ও দলিল — পার্থক্য কোথায়।
  • সময়ের প্রশ্ন — বহু বছর পর দাবি উঠলে আদালতে তামাদি বা দখলের মতো আইনি প্রশ্ন আসতে পারে। এ বিষয়ে কোনো ধারা আমরা সরকারি উৎসে যাচাই করিনি, তাই এখানে উল্লেখ করা হলো না। তবে আইনি দাবি টিকুক বা না টিকুক, শরিয়াহর দৃষ্টিতে হক ফেরত দেওয়ার দায় সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না।
  • লিখিত মীমাংসা — ফুফু বা তাঁর ওয়ারিশদের অংশ বুঝিয়ে দেওয়ার পর নিবন্ধিত বণ্টননামা বা দলিল করে রাখুন; দেখুন বণ্টননামা দলিল।

যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়

  • ভুল ১ — রেকর্ডে বাবার নামে থাকা সব জমিকে বাবার তরিকা ধরে ভাই-বোনদের মধ্যে ভাগ করা।
  • ভুল ২ — ফুফু মারা গেছেন বলে তাঁর হকও শেষ ধরে নেওয়া। তাঁর অংশ তাঁর ওয়ারিশদের।
  • ভুল ৩ — ফুফুর নীরবতা বা “কখনো চাননি”-কে ছাড় দেওয়া হিসেবে গণ্য করা।
  • ভুল ৪ — ফুফুর অংশ বাবার ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ করে তারপর “যার যার ভাগ থেকে কিছু দিয়ে দেওয়া”। আগে পুরো অংশ আলাদা করতে হয়, তারপর বাবার সম্পত্তি ভাগ।
  • ভুল ৫ — উল্টো অতিরিক্ত দায় চাপানো: বাবার ছেলে থাকা সত্ত্বেও বাবার নিজের সম্পত্তিতে ফুফুদের ভাগ দাবি করা। ছেলে থাকলে বাবার সম্পত্তিতে তাঁর বোনেরা ওয়ারিশ নন; ফুফুর হক তখন দাদার তরিকায় তাঁর অংশে।

আগে দাদার হিসাবটি করুন

দাদার মৃত্যুর দিনের ওয়ারিশ বসিয়ে দেখে নিন ফুফুদের প্রকৃত অংশ কত — বাবার সম্পত্তির হিসাব তার পরে।

উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটরে হিসাব করুন →

প্রাথমিক সূত্র

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

না। ফুফুদের অংশ দাদার মৃত্যুর দিনই তাঁদের মালিকানায় গেছে; বাবা দখলে রাখলেও তা বাবার তরিকা নয়। সেটি ফুফু বা তাঁর ওয়ারিশদের ফেরত দিতে হবে।
ফুফুর নিজের ওয়ারিশরা — সাধারণত তাঁর সন্তান ও স্বামী, আর প্রয়োজনে অন্য আত্মীয়। ফুফাতো ভাই-বোনেরা তাই এর হকদার হতে পারেন।
হ্যাঁ। দাবি না করা মানে ছেড়ে দেওয়া নয়। ফুফু স্পষ্টভাবে ও স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিলে ভিন্ন কথা; নইলে তাঁর অংশ তাঁরই।
ফুফুর অংশের মূল্য তাঁর প্রাপ্য থেকে যায়; তা বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে পরিশোধের প্রশ্ন আসে, মিরাস ভাগের আগে। নির্দিষ্ট অঙ্ক ঠিক করতে আলেমের পরামর্শ নিন।
না, যদি বাবার মৃত্যুর সময় তাঁর ছেলে বা অন্য নিকটতর ওয়ারিশ থাকেন। ফুফুদের হক মূলত দাদার সম্পত্তিতে তাঁদের অংশে।
শরিয়াহর দৃষ্টিতে সময়ের কারণে কারও মালিকানা মুছে যায় না। আদালতে সময়ের আইনি প্রশ্ন থাকতে পারে, সেজন্য আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখায় ফারায়েজের নীতি ও বাংলাদেশে প্রযোজ্য আইন/প্রক্রিয়া আলাদা করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নিজের ক্ষেত্রে প্রয়োগের আগে পরিস্থিতি যাচাই করুন।