বাবার মৃত্যুর পর অনেক সংসারে এক ধরনের নীরব সমঝোতা হয়: মা বেঁচে থাকতে ভাগের কথা তোলা যাবে না, জমির ধান, দোকানের ভাড়া, ব্যাংকের টাকা — সব মায়ের হাতে থাকবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর পেছনে ভালোবাসা আর সম্মানই থাকে। সমস্যা শুরু হয় যখন মা কোনো এক সন্তানের নামে জমি লিখে দিতে চান, কিংবা কোনো সন্তান নিজের অংশ চেয়ে বসেন।

প্রশ্নটির তিনটি স্তর আছে: মালিকানা কার, ভোগ কে করতে পারেন, আর নাবালকের অংশের কী হবে।

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী: মালিকানা মৃত্যুর মুহূর্তেই ভাগ হয়ে যায়

উত্তরাধিকার কারও অনুমতির অপেক্ষা করে না। স্বামীর মৃত্যুর মুহূর্তে সূরা নিসার ১১–১২ নম্বর আয়াতে নির্ধারিত হারে প্রত্যেক ওয়ারিশ তাঁর অংশের মালিক হয়ে যান — কাগজে ভাগ হোক বা না হোক। মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে স্ত্রীর অংশ ১/৮।

ধরুন ওয়ারিশ স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে। তখন মা পান ১/৮; বাকি অংশ সন্তানদের।

৮০ লাখ টাকার সম্পত্তি হলে মায়ের নিজের অংশ ১০ লাখ; বাকি ৭০ লাখ সন্তানদের মালিকানা, যদিও সবটাই হয়তো মায়ের হাতে বা মায়ের নামে রাখা। স্ত্রীর অংশের বিস্তারিত নিয়ম আছে স্বামী মারা গেলে স্ত্রী কত সম্পত্তি পাবে লেখায়।

মায়ের দেনমোহর আলাদা: স্বামীর কাছে মায়ের দেনমোহর পাওনা থাকলে সেটি ঋণ — মিরাস ভাগের আগেই পরিশোধ হয়, তারপর বাকি সম্পত্তিতে মায়ের ১/৮। দেখুন দেনমোহর পরিশোধ না হলে।

মা যা করতে পারেন, আর যা পারেন না

কাজঅবস্থান
নিজের ১/৮ অংশ ভোগ, বিক্রি বা দানপারেন — এটি তাঁর সম্পত্তি
প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের অংশ ভোগ বা দেখাশোনাপারেন — তাঁদের স্বেচ্ছা সম্মতি থাকলে, যতদিন সম্মতি থাকে
ভাগ কিছুদিন পিছিয়ে রাখাসবার সম্মতিতে পারেন; কেউ নিজের অংশ চাইলে তা আটকে রাখা যায় না
অন্য ওয়ারিশের অংশ বিক্রি বা বন্ধকপারেন না — মালিকের অনুমতি ছাড়া নয়
পুরো সম্পত্তি কোনো এক সন্তানের নামে লিখে দেওয়ানিজের অংশের বাইরে পারেন না
নাবালক সন্তানের অংশ ছেড়ে দেওয়া বা অন্যকে দেওয়াপারেন না — কারও সম্মতিতেই নয়

সংক্ষেপে: ভোগের অনুমতি সম্মতি থেকে আসে, মালিকানা আসে ফারায়েজ থেকে। সম্মতি ফেরত নেওয়া যায়, মালিকানা থেকে যায়।

সন্তানের সম্মতি কখন বৈধ

প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ বুদ্ধির সন্তান জেনে-বুঝে বললেন, “আম্মা, আমার অংশ আপনি যতদিন ইচ্ছা ভোগ করুন” — এটি বৈধ এবং অনেক পরিবারে সুন্দর সমাধান। কিন্তু এতে মালিকানা মায়ের কাছে চলে যায় না; সন্তান পরে নিজের অংশ চাইলে তা দিতে হবে। আর সন্তান যদি নিজের অংশ স্থায়ীভাবে মাকে দিয়ে দিতে চান, সেটি আলাদা একটি দান — যা স্পষ্টভাবে ও লিখিতভাবে হওয়া উচিত।

চাপে, লজ্জায় বা “মায়ের অবাধ্য হবো না” ভয়ে দেওয়া সম্মতি মন থেকে দেওয়া সম্মতি নয়। মায়ের প্রতি সম্মান আর নিজের হক — দুটি পরস্পরবিরোধী নয়।

নাবালক সন্তানের অংশ

সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গা এটি। নাবালক সন্তানের অংশ তার আমানত; কেউ — মা, বড় ভাই, চাচা — তার পক্ষে তা ছাড় দিতে, বিক্রি করতে বা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতে পারেন না। তার অংশ আলাদা করে তার উপকারে সংরক্ষণ করতে হয়।

হানাফি ফিকহে নাবালকের লালন-পালনের অধিকার আর তার সম্পদ পরিচালনার অভিভাবকত্ব দুটি আলাদা বিষয়। মা সাধারণত সন্তানকে লালন-পালনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পান, কিন্তু সম্পদের অভিভাবকত্বের ক্রম ভিন্ন — সেটি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আলেমের পরামর্শ নিন। বাংলাদেশে নাবালকের সম্পত্তির আইনি সুরক্ষা নিয়ে আছে অপ্রাপ্তবয়স্ক ওয়ারিশের অংশ কীভাবে সুরক্ষিত রাখবেন লেখা।

মায়ের দেখাশোনার দায় কার

“সম্পত্তি ভাগ হয়ে গেলে মা কোথায় যাবেন, কী খাবেন?” — এই ভয় থেকেই অনেক সময় মা সব আটকে রাখেন। সমাধানটা ফারায়েজের বাইরে, কিন্তু শরিয়াহর ভেতরেই: অভাবী মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব সচ্ছল সন্তানদের। তাই মায়ের নিরাপত্তার জন্য সম্পত্তির মালিকানা কেড়ে নেওয়ার দরকার পড়ে না; দরকার সন্তানদের দায়িত্ব পালন। আর সন্তানেরা চাইলে নিজেদের অংশ থেকে স্বেচ্ছায় মাকে দিতে পারেন।

বাংলাদেশের প্রক্রিয়ায়

  • ব্যাংকের টাকা ও নমিনি — মা নমিনি হলেই পুরো টাকার মালিক হয়ে যান কি না — এ প্রশ্নের আলোচনা আছে নমিনি কি সম্পত্তির মালিক লেখায়।
  • ভাগের সময়সীমা — কত দিনের মধ্যে ভাগ করতে হয় এবং দেরির ঝুঁকি কী, তা আছে কত দিনের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টন করতে হয় লেখায়।
  • লিখিত সমঝোতা — মা ভোগ করবেন আর সন্তানেরা সম্মতি দিচ্ছেন — এমন ব্যবস্থা হলে সেটি লিখে রাখা ভালো, যাতে পরে মালিকানা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি না হয়।

যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়

  • ভুল ১ — মা “সংসারের প্রধান” বলে পুরো সম্পত্তির মালিক ধরা। তাঁর মালিকানা নিজের অংশে সীমিত।
  • ভুল ২ — মায়ের জীবদ্দশায় ভাগ চাওয়াকে বেয়াদবি মনে করা। নিজের অংশ চাওয়া শরিয়াহসম্মত অধিকার — ভদ্রতা বজায় রেখে চাওয়াই যথেষ্ট।
  • ভুল ৩ — মা কোনো এক সন্তানকে পুরো জমি লিখে দেওয়া, অন্যদের অংশসহ।
  • ভুল ৪ — নাবালক সন্তানের অংশ পরিবারের খরচে মিশিয়ে ফেলা বা “বড় হলে দেখা যাবে” বলে হিসাব না রাখা।
  • ভুল ৫ — মা মারা গেলে পুরো সম্পত্তিকে মায়ের তরিকা ধরে ভাগ করা। মায়ের তরিকা শুধু তাঁর নিজের অংশ ও নিজের সম্পদ; বাকিটা আগেই সন্তানদের।

মায়ের ও সন্তানদের অংশ আলাদা করে দেখুন

স্ত্রী ও সন্তানদের তালিকা বসিয়ে দেখে নিন কার মালিকানা কতটুকু — ভাগ পরে হলেও হিসাবটা আজই পরিষ্কার থাকুক।

উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটরে হিসাব করুন →

প্রাথমিক সূত্র

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

না। সন্তান থাকলে মা স্ত্রী হিসেবে ১/৮ অংশের মালিক হন; বাকি অংশ মৃত্যুর মুহূর্তেই সন্তান ও অন্য ওয়ারিশদের মালিকানায় চলে যায়।
ভাগ করা যায় এবং কোনো ওয়ারিশ নিজের অংশ চাইলে তা আটকে রাখা যায় না। তবে সবাই স্বেচ্ছায় রাজি থাকলে ভাগ কিছুদিন পিছিয়ে রাখাও নিষিদ্ধ নয়।
নিজের অংশ ছাড়া পারেন না। অন্য ওয়ারিশদের অংশ তাঁদের মালিকানা; তাঁদের অনুমতি ছাড়া মা তা কাউকে দিতে পারেন না।
না। নাবালকের অংশ তার আমানত; মা বা অন্য কেউ তার পক্ষে তা ছাড় দিতে বা অন্যকে দিতে পারেন না। তা আলাদা করে সংরক্ষণ করতে হয়।
হ্যাঁ। প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের স্বেচ্ছা সম্মতিতে মা তাঁদের অংশ ভোগ করতে পারেন। তবে এতে মালিকানা বদলায় না; সন্তান পরে নিজের অংশ চাইতে পারেন।
শুধু মায়ের নিজের মালিকানার সম্পদ — স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া অংশ, দেনমোহর ও নিজের অন্য সম্পদ। সন্তানদের অংশ তাঁর হাতে থাকলেও তা তাঁর তরিকা নয়।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখায় ফারায়েজের নীতি ও বাংলাদেশে প্রযোজ্য আইন/প্রক্রিয়া আলাদা করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নিজের ক্ষেত্রে প্রয়োগের আগে পরিস্থিতি যাচাই করুন।