ব্যাংকের ফরমে একটি ছোট ঘর থাকে — নমিনির নাম। অনেকে সেখানে এক সন্তানের নাম লিখে নিশ্চিন্ত হয়ে যান, ভাবেন সম্পত্তির ব্যবস্থা হয়ে গেল। আবার মৃত্যুর পর পরিবারে প্রশ্ন ওঠে — নমিনি টাকা তুলে নিলে বাকি ওয়ারিশরা কী পাবেন? প্রশ্নটির উত্তর এক কথায় দেওয়ার মতো সরল নয়, এবং সেটিই এখানে খোলাখুলি বলা হচ্ছে।
নমিনি আর ওয়ারিশ — দুটি আলাদা ধারণা
| নমিনি | ওয়ারিশ | |
|---|---|---|
| কে ঠিক করেন | হিসাবধারী নিজে, ফরমে লিখে | আইন — কারো ইচ্ছায় বদলায় না |
| কাজ কী | মৃত্যুর পর টাকা গ্রহণ করা | সম্পত্তিতে অংশের অধিকার |
| কতজন হতে পারেন | একজন বা কয়েকজন — যাকে খুশি | ফারায়েজে যাঁরা পড়েন, সবাই |
| বদলানো যায়? | হ্যাঁ, হিসাবধারী চাইলে যেকোনো সময় | না |
নমিনি হওয়া আর ওয়ারিশ হওয়া এক নয় — একজন একসঙ্গে দুটোই হতে পারেন, আবার শুধু একটিও হতে পারেন।
আইন কী বলে
বাংলাদেশে ব্যাংক আমানতের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক বিধানটি আছে ব্যাংক-কোম্পানী আইন, ১৯৯১ (১৯৯১ সনের ১৪ নং আইন)-এর ধারা ১০৩-এ, যার শিরোনাম “আমানতী অর্থ পরিশোধের জন্য মনোনয়ন দান”। এই বিধান অনুযায়ী হিসাবধারী মনোনয়ন দিয়ে রাখলে তাঁর মৃত্যুর পর ব্যাংক নমিনিকেই টাকা পরিশোধ করে।
আদালত কী বলেছেন
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ Civil Revision No. 1682 of 2015 মামলায় পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন যে নমিনি কেবল একজন ট্রাস্টি — তাঁর দায়িত্ব হলো মৃত হিসাবধারীর টাকা তাঁর আইনানুগ ওয়ারিশদের মধ্যে বিতরণ করা। অর্থাৎ নমিনি টাকা হাতে পান, কিন্তু নিজে তার একক মালিক হয়ে যান না।
ফারায়েজের দৃষ্টিকোণ পরিষ্কার
আইনি বিতর্ক যেখানেই থাকুক, শরিয়াহর দিকটি এখানে দুই রকম নয়। মৃত্যুর পর ব্যক্তির রেখে যাওয়া সব সম্পদ — ব্যাংকের টাকা সহ — তরিকা, অর্থাৎ উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি। দাফন-কাফনের খরচ, ঋণ ও বৈধ ওসিয়ত মেটানোর পর যা থাকে, তা ফারায়েজের নিয়মে সব ওয়ারিশের মধ্যে ভাগ হয়।
তাই কেবল নমিনি হওয়ার কারণে কেউ পুরো টাকার মালিক হয়ে যান — এই ধারণা ফারায়েজের সঙ্গে মেলে না। নমিনি যদি নিজে ওয়ারিশ হন, তিনি তাঁর প্রাপ্য অংশটুকু পাবেন; বাকিটা অন্য ওয়ারিশদের।
তাহলে নমিনি করে লাভ কী
- টাকা দ্রুত হাতে আসে। নমিনি থাকলে ব্যাংক তুলনামূলক সহজে পরিশোধ করতে পারে; না থাকলে অনেক ক্ষেত্রে আদালতের সাকসেশন সার্টিফিকেট লাগে, যা সময়সাপেক্ষ।
- পরিবার নগদ সংকটে পড়ে না। মৃত্যুর পরের খরচগুলো সামলাতে এই সুবিধাটি বাস্তবেই কাজে লাগে।
- দাবিদার কে, তা নিয়ে ব্যাংকের সঙ্গে টানাপোড়েন কমে।
অন্যান্য ক্ষেত্রেও নমিনির ঘর থাকে
ব্যাংক ছাড়াও বিমা পলিসি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, সঞ্চয়পত্র, পেনশন ও শেয়ারের বিও হিসাব — সবখানেই নমিনির ঘর থাকে। প্রতিটির নিজস্ব আইন ও শর্ত আলাদা, এবং কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনে বিশেষ বিধান থাকতে পারে।
যেখানে সবচেয়ে বেশি ভুল হয়
- ভুল ১ — নমিনি করা মানে ওসিয়ত করা ভেবে নেওয়া। দুটি সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস; নমিনেশন কোনো হস্তান্তর নয়।
- ভুল ২ — এক ছেলেকে নমিনি করে ভাবা মেয়েরা আর দাবি করতে পারবে না। ফারায়েজে কন্যার অংশ নমিনেশনের কারণে মুছে যায় না।
- ভুল ৩ — নমিনি নিজে ওয়ারিশ না হলেও পুরো টাকা রেখে দেওয়া। আদালতের ওই পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী নমিনির ভূমিকা ট্রাস্টির।
- ভুল ৪ — নমিনি না থাকায় হাল ছেড়ে দেওয়া। নমিনি না থাকলেও ওয়ারিশরা আইনি প্রক্রিয়ায় টাকা তুলতে পারেন — অনেক ক্ষেত্রে আদালতের সাকসেশন সার্টিফিকেট লাগে।
- ভুল ৫ — নমিনির নাম বদলানোর দরকার হলেও না বদলানো। বিবাহবিচ্ছেদ বা নমিনির মৃত্যুর পর পুরোনো নাম রেখে দিলে পরে জটিলতা তৈরি হয়।
ব্যাংকের টাকা ওয়ারিশদের মধ্যে কীভাবে ভাগ হবে
ব্যাংকে গচ্ছিত অঙ্কটি বসিয়ে দেখে নিন ফারায়েজ অনুযায়ী কে কত পাবেন।
ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →