বিয়ের কাবিননামায় দেনমোহরের অঙ্ক লেখা হয়েছিল, কিন্তু পুরোটা কখনো পরিশোধ হয়নি। স্বামী মারা যাওয়ার পর প্রশ্ন ওঠে — এই টাকা কি এখন আর পাওয়া যাবে? উত্তরটি অনেকের ধারণার চেয়ে পরিষ্কার: দেনমোহর মাফ হয়ে যায় না। এটি একটি ঋণ, আর ঋণ মৃত্যুতে মুছে যায় না।

দেনমোহর ঋণ, দান নয়

দেনমোহর স্বামীর দয়া বা উপহার নয় — এটি বিয়ের চুক্তির শর্ত এবং স্ত্রীর আইনি ও শরিয়াহসম্মত পাওনা। পরিশোধ না হলে সেটি স্বামীর উপর ঋণ হয়ে থাকে, ঠিক যেমন ব্যাংকের ঋণ বা দোকানের বাকি।

বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ধারা ১০-এর মূল পাঠ অনুযায়ী — নিকাহনামা বা বিবাহচুক্তিতে দেনমোহর পরিশোধের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু উল্লেখ না থাকলে পুরো দেনমোহরের অঙ্ক দাবিমাত্র পরিশোধযোগ্য ধরা হবে।

ভাগ করার আগেই ঋণ শোধ

ফারায়েজের চার ধাপের ক্রমটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে প্রথমে দাফন-কাফনের খরচ, তারপর সব ঋণ, তারপর বৈধ ওসিয়ত — এই তিনটি মেটানোর পর যা থাকে, তা-ই ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ হয়। অপরিশোধিত দেনমোহর দ্বিতীয় ধাপে পড়ে, অর্থাৎ ওয়ারিশদের ভাগের আগেই এটি বাদ যায়।

ধাপকী মেটানো হয়
দাফন-কাফনের প্রয়োজনীয় খরচ
সব ঋণ — অপরিশোধিত দেনমোহরসহ
বৈধ ওসিয়ত (অবশিষ্টের সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত)
অবশিষ্ট সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে ফারায়েজ অনুযায়ী

দেনমোহর ধাপ ২-এ, ওয়ারিশদের ভাগ ধাপ ৪-এ — তাই আগে দেনমোহর, পরে ভাগ।

স্ত্রী দুই ভূমিকাতেই থাকেন

এই জায়গাটিতেই সবচেয়ে বেশি ভুল হয়। বিধবা স্ত্রী একই সঙ্গে পাওনাদার এবং ওয়ারিশ — দুটি আলাদা ভূমিকা। প্রথমে তিনি পাওনাদার হিসেবে অপরিশোধিত দেনমোহর পান, তারপর ওয়ারিশ হিসেবে অবশিষ্ট সম্পত্তির ১/৮ বা ১/৪ পান। একটি অন্যটির বদলি নয়।

একটি বাস্তব হিসাব

ধরুন মোট সম্পত্তি ৪০ লাখ টাকা। অপরিশোধিত দেনমোহর ৪ লাখ টাকা। দাফন-কাফনের খরচ ও অন্য কোনো ঋণ নেই, ওসিয়তও নেই। ওয়ারিশ — স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে।

  • ধাপ ২ — ৪০ লাখ থেকে দেনমোহর ৪ লাখ স্ত্রীকে ঋণ হিসেবে দেওয়া হলো। এই ৪ লাখ কোনো ভাগের অংশ নয়, এটি তাঁর পাওনা।
  • ধাপ ৪ — অবশিষ্ট ৩৬ লাখ টাকার উপর ফারায়েজের হিসাব হবে।

অর্থাৎ স্ত্রী মোট পাচ্ছেন ৪ লাখ (দেনমোহর) + ৪ লাখ ৫০ হাজার (ওয়ারিশ হিসেবে ১/৮) = ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। যদি ভুল করে দেনমোহরটি বাদ না দিয়ে সরাসরি ৪০ লাখের উপর ভাগ করা হতো, তিনি পেতেন মাত্র ৫ লাখ — সাড়ে তিন লাখ টাকা কম।

দেনমোহর আদায়ের পথ

স্বামীর মৃত্যুর পর দেনমোহর আদায়ে বাংলাদেশি আইনি সূত্রে যে পথগুলোর কথা পাওয়া যায়:

  • পারিবারিকভাবে নিষ্পত্তি — ওয়ারিশরা সম্মত হলে সম্পত্তি ভাগের আগেই দেনমোহরের অঙ্কটি বাদ দিয়ে হিসাব করা। এটিই সবচেয়ে সহজ ও সঠিক পথ।
  • আইনি দাবি — ওয়ারিশরা স্বীকার না করলে বিধবা স্বামীর আইনি ওয়ারিশদের বিরুদ্ধে মামলা করে দেনমোহর আদায় করতে পারেন, কারণ এটি মৃত স্বামীর সম্পত্তির উপর ঋণ।
  • দখল ধরে রাখা — স্বামীর সম্পত্তিতে বিধবার আইনসম্মত দখল থাকলে, দেনমোহর পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত তিনি সেই দখল ধরে রাখার অধিকার রাখেন — মুসলিম আইনে এটি বিধবার right of retention হিসেবে পরিচিত।
দখল ধরে রাখার অধিকারটির শর্ত ও সীমা মামলার বাস্তবতার উপর নির্ভর করে এবং এখানে কোনো মামলার সাইটেশন দেওয়া হচ্ছে না। এই অধিকারের উপর ভরসা করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই আইনজীবীর পরামর্শ নিন। দাবি করতে দেরি হলে আইনি জটিলতা বাড়ে, তাই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া ভালো।

কাবিননামা খুঁজে বের করুন

দেনমোহরের দাবির ভিত্তি কাবিননামা। তাই প্রথম কাজ — নিকাহনামার কপি সংগ্রহ করা। হারিয়ে গেলে যে নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছে বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছিল, তাঁর কাছে রেজিস্টার বইয়ে নকল থাকে। সেখান থেকে সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করা যায়।

  • কাবিননামায় দেনমোহরের মোট অঙ্ক কত লেখা আছে দেখুন।
  • কতটুকু নগদ (মুয়াজ্জাল) ও কতটুকু বাকি (মুয়াজ্জাল নয়, অর্থাৎ বিলম্বিত) — এই বিভাজন লেখা আছে কি না দেখুন।
  • ইতিমধ্যে কতটুকু পরিশোধ হয়েছে, তার কোনো রসিদ বা প্রমাণ আছে কি না খুঁজুন।
  • স্বর্ণালংকার বা জিনিসপত্র দেনমোহর হিসেবে দেওয়া হয়ে থাকলে সেটিও হিসাবে আসবে — কাবিননামায় তা উল্লেখ থাকতে পারে।

অন্যান্য যে প্রশ্নগুলো ওঠে

স্ত্রী আগে মারা গেলে?

দেনমোহর তখনও মাফ হয় না। অপরিশোধিত দেনমোহর মৃত স্ত্রীর সম্পত্তির অংশ হয়ে যায় এবং তাঁর ওয়ারিশরা — সন্তান, মা-বাবা এবং স্বামী নিজেও — সেটি পান। অর্থাৎ স্বামীকে সেই ঋণ তাঁর স্ত্রীর ওয়ারিশদের কাছে পরিশোধ করতে হয়।

বহু বছর পরে দাবি করা যায়?

দেনমোহর মাফ হয়ে যায় না, তবে দেরিতে দাবি করলে তামাদি সংক্রান্ত আইনি প্রশ্ন উঠতে পারে এবং প্রমাণ জোগাড় করাও কঠিন হয়ে যায়। এই বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমার কথা এখানে বলা হচ্ছে না — আপনার ক্ষেত্রে কী প্রযোজ্য, তা আইনজীবীর কাছ থেকে জেনে নিন।

স্ত্রী নিজে মাফ করে দিলে?

স্ত্রী স্বেচ্ছায়, বুঝেশুনে ও কোনো চাপ ছাড়া দেনমোহর মাফ করলে সেটি গ্রহণযোগ্য। কিন্তু চাপ, ভয় বা প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া মাফ শরিয়াহ ও আইন — দুই দিক থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ।

যেখানে সবচেয়ে বেশি ভুল হয়

  • ভুল ১ — দেনমোহর বাদ না দিয়ে সরাসরি পুরো সম্পত্তির উপর ভাগ করা। এতে স্ত্রী তাঁর পাওনা থেকে বঞ্চিত হন।
  • ভুল ২ — স্ত্রীর ১/৮ অংশটিকে দেনমোহরের বদলি ধরা। দুটি আলাদা পাওনা।
  • ভুল ৩ — মৌখিকভাবে “দেনমোহর দেওয়া হয়ে গেছে” বলা, কিন্তু কোনো প্রমাণ না থাকা।
  • ভুল ৪ — স্বামীর মৃত্যুর পর দেনমোহরকে অভদ্র দাবি মনে করা। এটি আইনি পাওনা, লজ্জার বিষয় নয়।
  • ভুল ৫ — কাবিননামা সংগ্রহ না করে শুধু স্মৃতির উপর নির্ভর করা। নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে কপি তোলা যায়।

দেনমোহর বাদ দেওয়ার পর হিসাব করুন

ক্যালকুলেটরে সম্পত্তির অঙ্ক দিন — তবে আগে দেনমোহর ও অন্য ঋণ বাদ দিয়ে ভাগযোগ্য পরিমাণটি বসান।

ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

না। দেনমোহর একটি ঋণ, আর ঋণ মৃত্যুতে মুছে যায় না। অপরিশোধিত দেনমোহর মৃত স্বামীর সম্পত্তির উপর ঋণ হিসেবে থাকে এবং ওয়ারিশদের ভাগের আগেই তা পরিশোধযোগ্য।
না, সম্পূর্ণ আলাদা। দেনমোহর তাঁর পাওনা, যা ঋণ হিসেবে আগে পরিশোধ হয়। এরপর অবশিষ্ট সম্পত্তির উপর তিনি ওয়ারিশ হিসেবে ১/৮ (সন্তান থাকলে) বা ১/৪ (সন্তান না থাকলে) পান। তিনি দুটোই পাবেন।
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ধারা ১০ অনুযায়ী, নিকাহনামা বা বিবাহচুক্তিতে পরিশোধের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু না থাকলে পুরো অঙ্কটি দাবিমাত্র পরিশোধযোগ্য ধরা হবে।
প্রথমে পারিবারিকভাবে নিষ্পত্তির চেষ্টা করুন এবং কাবিননামার কপি সংগ্রহ করে রাখুন। না হলে স্বামীর আইনি ওয়ারিশদের বিরুদ্ধে মামলা করে দেনমোহর আদায় করা যায়। আপনার ক্ষেত্রে কোন পথটি প্রযোজ্য, তা আইনজীবীর কাছ থেকে জেনে নিন।
মুসলিম আইনে বিধবার দখল ধরে রাখার অধিকার স্বীকৃত — আইনসম্মত দখল থাকলে দেনমোহর পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত তিনি দখল ধরে রাখতে পারেন। তবে এই অধিকারের শর্ত ও সীমা মামলার বাস্তবতার উপর নির্ভর করে, তাই আইনজীবীর পরামর্শ প্রয়োজন।
যে নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছে বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছিল, তাঁর রেজিস্টার বইয়ে নকল সংরক্ষিত থাকে। সেখান থেকে সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করা যায়।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। প্রতিটি পরিবারের অবস্থা আলাদা এবং ছোট একটি তথ্য পুরো হিসাব বদলে দিতে পারে। দলিল, নামজারি বা বণ্টননামার আগে স্থানীয় আলেম ও আইনজীবীর সঙ্গে মিলিয়ে নিন।