প্রশ্নটি অনেক বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা — “আমি না থাকলে আমার প্রতিবন্ধী সন্তানের কী হবে?” ফারায়েজের উত্তরটি পরিষ্কার এবং আশ্বস্তকর: প্রতিবন্ধিতা উত্তরাধিকারের অংশ কমায় না। কিন্তু অংশ পাওয়া আর সেই সম্পত্তি সারাজীবন সুরক্ষিত থাকা — দুটি আলাদা প্রশ্ন, আর দ্বিতীয়টির জন্যই আগে থেকে ব্যবস্থা নিতে হয়।

অংশ ঠিক আর সব সন্তানের মতোই

প্রতিবন্ধী সন্তান অন্য সন্তানদের সমান অংশ পান। ছেলে হলে ছেলের অংশ, মেয়ে হলে মেয়ের অংশ। প্রতিবন্ধিতার কারণে অংশ কমানো বা বাড়ানো — কোনোটিরই ভিত্তি ফারায়েজে নেই।

চার সন্তানের একটি পরিবার — দুই ছেলে ও দুই মেয়ে, যাঁদের একজন প্রতিবন্ধী। সম্পত্তি ৬৪ লাখ টাকা:

হিসাবে কোথাও প্রতিবন্ধিতার প্রশ্ন আসেনি — এবং সেটিই সঠিক। প্রত্যেক ছেলে সমান, প্রত্যেক মেয়ে সমান।

আসল সমস্যা অংশে নয়, সুরক্ষায়

যে সন্তান নিজে সম্পত্তি দেখাশোনা করতে পারেন না, তাঁর ক্ষেত্রে ঝুঁকি তিনটি:

  • অংশ পেয়েও ভোগ করতে না পারা — জমি কেউ দখল করে রাখলে বা আয় অন্যের হাতে গেলে।
  • ভুল বুঝিয়ে সই নেওয়া — দলিলে সই করিয়ে অংশ হস্তান্তর করিয়ে নেওয়া।
  • দেখাশোনার ভার কে নেবেন তা অস্পষ্ট থাকা — বাবা-মা না থাকলে দায়িত্ব নিয়ে টানাপোড়েন হয়।

জীবিত অবস্থায় যা করতে পারেন

১. হেবা করে দেওয়া

সবচেয়ে নিশ্চিত ব্যবস্থা। জীবিত অবস্থায় হেবা করলে পরিমাণে কোনো সীমা নেই এবং সেই সম্পত্তি তরিকার বাইরে চলে যায়। তিনটি শর্ত — ঘোষণা, গ্রহণ ও দখল হস্তান্তর; স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮-এর ধারা ১৭ অনুযায়ী হেবা ঘোষণার রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক।

প্রতিবন্ধী সন্তানের ক্ষেত্রে দখল হস্তান্তর ও গ্রহণের বিষয়টি আইনগতভাবে সংবেদনশীল — সন্তানের অবস্থা অনুযায়ী কীভাবে সম্পন্ন করতে হবে তা আইনজীবীর সঙ্গে বসে ঠিক করুন। ভুল প্রক্রিয়ায় করা হেবা পরে চ্যালেঞ্জ হলে সন্তানটিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

২. ওসিয়ত — তবে সীমা জেনে

ওসিয়ত করে সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ দেওয়া যায়। কিন্তু সন্তান নিজেই ওয়ারিশ, তাই তাঁর জন্য করা ওসিয়ত কার্যকর হতে অন্য ওয়ারিশদের সম্মতি লাগে। তাঁরা আপত্তি করলে ওসিয়তটি কার্যকর হয় না — তাই এটি একা ভরসা করার মতো পথ নয়।

৩. আয়ের ব্যবস্থা করে রাখা

  • সন্তানের নামে সঞ্চয় বা বিনিয়োগ, যাতে নিয়মিত আয় আসে।
  • ভাড়া আসে এমন সম্পত্তি তাঁর নামে দেওয়া — যা বিক্রি না করেই আয় দেয়।
  • জীবিত অবস্থায় চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা করা।

৪. দায়িত্ব লিখিতভাবে নির্দিষ্ট করা

কে দেখাশোনা করবেন, কে সম্পত্তির হিসাব রাখবেন, কে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেবেন — এগুলো মুখের কথায় না রেখে লিখিতভাবে ঠিক করে রাখুন এবং অন্য সন্তানদের সম্মতি নিয়ে রাখুন। পারিবারিক আলোচনায় বিষয়টি স্পষ্ট করা বাবা-মায়ের জীবদ্দশাতেই সবচেয়ে সহজ।

বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থা

বাংলাদেশে এই বিষয়ে একটি বিশেষ আইন আছে — নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন, ২০১৩, এবং সেই আইনের অধীনে গঠিত সরকারি সংস্থা নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট, যার অফিসিয়াল পোর্টাল nddtrust.gov.bd

এই আইনের কোনো ধারা, শর্ত বা ট্রাস্টের নির্দিষ্ট সেবার বিবরণ এখানে দেওয়া হচ্ছে না — সেগুলো এই লেখায় যাচাই করা যায়নি এবং সরকারি ব্যবস্থাগুলো সময়ে সময়ে বদলায়। আপনার সন্তানের ক্ষেত্রে কী সুবিধা ও সুরক্ষা প্রযোজ্য, তা nddtrust.gov.bd অথবা সমাজসেবা অধিদফতরের স্থানীয় কার্যালয় থেকে সরাসরি জেনে নিন, এবং আইনি পরিকল্পনার জন্য আইনজীবীর সঙ্গে বসুন।

প্রতিবন্ধী সন্তানের সম্পত্তির উত্তরাধিকার

আরেকটি প্রশ্ন কম আলোচিত — প্রতিবন্ধী সন্তান নিজে মারা গেলে তাঁর সম্পত্তি কার হবে? উত্তরটি সাধারণ নিয়মেই: তাঁর নিজের ওয়ারিশদের মধ্যে ফারায়েজ অনুযায়ী ভাগ হবে। বিয়ে ও সন্তান না থাকলে মা-বাবা ও ভাই-বোনেরা ওয়ারিশ হন।

এই দিকটি আগে থেকে ভেবে রাখা জরুরি। বাবা-মায়ের দেওয়া সম্পত্তি শেষে কোথায় যাবে, সেটি জেনে পরিকল্পনা করলে ভাই-বোনদের মধ্যেও ভবিষ্যতে বিরোধের আশঙ্কা কমে।

যেখানে সবচেয়ে বেশি ভুল হয়

  • ভুল ১ — প্রতিবন্ধী সন্তানকে কম অংশ দেওয়া, “সে তো বুঝবে না” ভেবে। তাঁর অংশ অন্য সন্তানদের সমান।
  • ভুল ২ — তাঁর অংশ অন্য ভাই-বোনের নামে লিখে রাখা, “দেখাশোনার সুবিধার জন্য” যুক্তিতে। এটি কার্যত বঞ্চিত করা এবং আইনি ঝুঁকিও তৈরি করে।
  • ভুল ৩ — শুধু ওসিয়তের উপর ভরসা করা। ওয়ারিশের জন্য ওসিয়ত অন্যদের সম্মতি ছাড়া কার্যকর হয় না।
  • ভুল ৪ — দেখাশোনার দায়িত্ব লিখিতভাবে নির্দিষ্ট না করা।
  • ভুল ৫ — সরকারি ব্যবস্থার খোঁজ না নেওয়া। বাংলাদেশে এই বিষয়ে আলাদা আইন ও ট্রাস্ট আছে — খোঁজ নিয়ে দেখুন।
  • ভুল ৬ — আইনজীবীর পরামর্শ ছাড়া নিজে দলিল করে ফেলা। প্রক্রিয়াগত ভুলে হেবা বা ওসিয়ত দুটোই বাতিল হতে পারে।

সবার অংশ হিসাব করে দেখে নিন

সন্তানদের তালিকা দিন — প্রত্যেকের প্রাপ্য অংশ দেখে তারপর অতিরিক্ত সুরক্ষার পরিকল্পনা করুন।

ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

না। প্রতিবন্ধিতা উত্তরাধিকারের অংশ কমায় না — ছেলে হলে ছেলের অংশ, মেয়ে হলে মেয়ের অংশ, অন্য সন্তানদের সমান।
জীবিত অবস্থায় হেবা করে যায় — পরিমাণে সীমা নেই এবং সেই সম্পত্তি তরিকার বাইরে চলে যায়। তবে প্রতিবন্ধী সন্তানের ক্ষেত্রে গ্রহণ ও দখল হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সংবেদনশীল, তাই আইনজীবীর সঙ্গে বসে করুন।
একা ভরসা করার মতো পথ নয়। সন্তান নিজেই ওয়ারিশ, তাই তাঁর জন্য করা ওসিয়ত কার্যকর হতে অন্য ওয়ারিশদের সম্মতি লাগে। তাঁরা আপত্তি করলে এটি কার্যকর হয় না।
দেখাশোনার সুবিধার যুক্তিতেও এটি কার্যত বঞ্চিত করা এবং আইনি ঝুঁকিপূর্ণ। সম্পত্তি তাঁর নামেই রাখুন এবং দেখাশোনা ও হিসাবের দায়িত্ব আলাদাভাবে লিখিতভাবে নির্দিষ্ট করুন।
আছে — নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন, ২০১৩ এবং সেই আইনের অধীনে গঠিত নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট (nddtrust.gov.bd)। কী সুবিধা ও শর্ত প্রযোজ্য তা ট্রাস্টের পোর্টাল বা সমাজসেবা অধিদফতরের স্থানীয় কার্যালয় থেকে সরাসরি জেনে নিন।
সাধারণ নিয়মেই — তাঁর নিজের ওয়ারিশদের মধ্যে ফারায়েজ অনুযায়ী ভাগ হবে। বিয়ে ও সন্তান না থাকলে মা-বাবা ও ভাই-বোনেরা ওয়ারিশ হন।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। প্রতিটি পরিবারের অবস্থা আলাদা এবং ছোট একটি তথ্য পুরো হিসাব বদলে দিতে পারে। দলিল, নামজারি বা বণ্টননামার আগে স্থানীয় আলেম ও আইনজীবীর সঙ্গে মিলিয়ে নিন।