প্রশ্নটি অনেক বাবা-মায়ের মনে থাকে কিন্তু মুখে আসে না — “আমার মেয়ের অবস্থা ছেলেদের চেয়ে খারাপ, তাকে কি একটু বেশি দিতে পারি?” উত্তরটি হ্যাঁ, তবে ফারায়েজের ভগ্নাংশ বদলে নয়। ফারায়েজের নির্দিষ্ট অংশ আল্লাহর নির্ধারিত — সেটি কেউ বদলাতে পারেন না। কিন্তু ফারায়েজের বাইরে বৈধ কয়েকটি পথ আছে, এবং সেগুলো ইসলামই অনুমোদন করেছে।

যা করা যায় না

ফারায়েজের ভগ্নাংশ পরিবর্তন করা যায় না। “ছেলে-মেয়ে সমান পাবে” বলে ওসিয়ত করলে, বা কাগজে লিখে রাখলে — সেই নির্দেশ ফারায়েজকে বাতিল করতে পারে না। মৃত্যুর পর অবশিষ্ট সম্পত্তির উপর ফারায়েজের নিয়মই চলবে। তাই যা করার, তা জীবিত অবস্থায় করতে হবে।

পথ ১ — জীবিত অবস্থায় হেবা

সবচেয়ে স্পষ্ট ও ব্যবহৃত পথ। মালিক জীবিত থাকতে নিজের সম্পত্তি যাকে খুশি দিতে পারেন, যতটুকু খুশি — কোনো সীমা নেই। হেবা সম্পূর্ণ হয়ে গেলে সেই সম্পত্তি আর তরিকার অংশ নয়, তাই ভাইদের ভাগে আসে না।

হেবার তিন শর্তকী করতে হবে
ঘোষণাস্পষ্টভাবে দিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করা
গ্রহণমেয়ে তা গ্রহণ করা
দখল হস্তান্তরসম্পত্তির দখল বাস্তবে মেয়ের হাতে দেওয়া

স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮-এর ধারা ১৭ অনুযায়ী হেবা ঘোষণার রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক।

দখল হস্তান্তর না হলে হেবা অসম্পূর্ণ। কাগজে মেয়ের নামে লিখে রেখে জমি নিজের দখলে-ভোগে রেখে দিলে মৃত্যুর পর সেটি চ্যালেঞ্জযোগ্য হয়ে যায়। নামজারি করিয়ে রাখা, খাজনা তাঁর নামে দেওয়া এবং ভোগদখলের প্রমাণ রাখা — তিনটিই কাজে লাগে।

তবে একটি সতর্কতা

হেবা আইনত বৈধ হলেও সন্তানদের মধ্যে অন্যায় বৈষম্য ইসলামে নিরুৎসাহিত। প্রয়োজনের ভিত্তিতে বেশি দেওয়া — যেমন মেয়ে অসচ্ছল, অসহায় বা তার দায়িত্ব বেশি — এক জিনিস। কোনো কারণ ছাড়া একজনকে বঞ্চিত করে আরেকজনকে সব দিয়ে দেওয়া আরেক জিনিস। উদ্দেশ্যটি পরিষ্কার রাখুন এবং সবাইকে জানিয়ে রাখুন।

পথ ২ — ওসিয়ত, তবে শর্তসহ

ওসিয়ত করে সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত দেওয়া যায়। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আছে যা অনেকে জানেন না।

ওয়ারিশের জন্য ওসিয়ত করলে অন্য ওয়ারিশদের সম্মতি লাগে। মেয়ে নিজেই একজন ওয়ারিশ, তাই তার জন্য করা ওসিয়ত কার্যকর হবে শুধু তখনই, যদি মৃত্যুর পর অন্য ওয়ারিশরা — অর্থাৎ ভাইয়েরা ও অন্যরা — সম্মতি দেন। তাঁরা আপত্তি করলে ওসিয়তটি কার্যকর হয় না। এই কারণেই ওসিয়ত মেয়েকে বেশি দেওয়ার নির্ভরযোগ্য পথ নয়

অর্থাৎ ওসিয়ত ব্যবহার করা যায়, কিন্তু তার উপর সম্পূর্ণ ভরসা করা যায় না। নিশ্চিত ব্যবস্থা চাইলে জীবিত অবস্থায় হেবাই বেশি নির্ভরযোগ্য।

পথ ৩ — ভাইয়েরা নিজেদের অংশ থেকে দেওয়া

বণ্টনের পর প্রত্যেক ওয়ারিশ নিজের অংশের পূর্ণ মালিক। তখন ভাইয়েরা চাইলে নিজেদের অংশ থেকে বোনকে দিতে পারেন — সেটি সম্পূর্ণ বৈধ এবং প্রশংসনীয়। এটি ফারায়েজের পরিবর্তন নয়, বরং ফারায়েজ মেনে নেওয়ার পর স্বেচ্ছায় দান।

এই পথটির একটি বড় সুবিধা আছে — এখানে কোনো আইনি জটিলতা নেই। ভাগ হয়ে যাওয়ার পর যে যা দিতে চান, দিতে পারেন। তবে লিখিতভাবে ও রেজিস্ট্রি করে দেওয়াই নিরাপদ, যাতে পরবর্তী প্রজন্মে প্রশ্ন না ওঠে।

পথ ৪ — জীবিত অবস্থায় অন্যভাবে ব্যবস্থা করা

  • শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ — মেয়েকে উচ্চশিক্ষা বা পেশাগত দক্ষতা দেওয়া সম্পত্তির চেয়ে বেশি টেকসই হতে পারে।
  • ব্যবসার মূলধন বা কর্মসংস্থান — নগদ সহায়তা দিয়ে তাকে স্বাবলম্বী করা।
  • বাসস্থানের ব্যবস্থা — জীবিত অবস্থায় তার নামে বাড়ি বা ফ্ল্যাট কিনে দেওয়া।
  • তার নামে সঞ্চয় বা বিনিয়োগ — মালিকানা তার নামে হলে সেটি আর তরিকার অংশ থাকে না।
  • দেনমোহর নিশ্চিত করা — মেয়ের বিয়েতে দেনমোহরের অঙ্ক ও পরিশোধ নিয়ে সচেতন থাকা তার নিজের সম্পত্তি গড়ে তোলার একটি পথ।

প্রথমে দেখুন ফারায়েজ কী দিচ্ছে

অনেক পরিবারে ধারণা করা হয় মেয়ে খুব কম পায়। বাস্তবে ছেলে না থাকলে মেয়েরাই সিংহভাগ পান। স্বামী ও তিন মেয়ে থাকলে — মেয়েরা মিলে ৩/৪, ১২ লাখ টাকার সম্পত্তিতে জনপ্রতি ৩ লাখ:

এখানে রদের নিয়মে মেয়েদের নির্দিষ্ট ২/৩ বেড়ে ৩/৪ হয়েছে, কারণ কোনো আসাবা জীবিত নেই। ছেলে থাকলে ছবিটি ভিন্ন হয়:

এই ৪৮ লাখ টাকার সম্পত্তিতে এক ছেলে ২১ লাখ এবং দুই মেয়ে মিলেও ২১ লাখ — জনপ্রতি সাড়ে ১০ লাখ পাচ্ছেন। হেবা বা অন্য ব্যবস্থার কথা ভাবার আগে নিজের পরিবারের প্রকৃত হিসাবটি দেখে নিন — অনেক সময় ধারণার চেয়ে চিত্রটি আলাদা হয়।

যেখানে সবচেয়ে বেশি ভুল হয়

  • ভুল ১ — ওসিয়ত করে ছেলে-মেয়ের অংশ সমান করার চেষ্টা। ফারায়েজের ভগ্নাংশ ওসিয়ত দিয়ে বদলানো যায় না।
  • ভুল ২ — মেয়ের জন্য ওসিয়ত করে নিশ্চিন্ত থাকা। মেয়ে নিজেই ওয়ারিশ, তাই তার জন্য ওসিয়ত কার্যকর হতে অন্য ওয়ারিশদের সম্মতি লাগে।
  • ভুল ৩ — হেবা করে দখল হস্তান্তর না করা। হেবা তখন অসম্পূর্ণ ও চ্যালেঞ্জযোগ্য।
  • ভুল ৪ — স্থাবর সম্পত্তির হেবা রেজিস্ট্রি না করা।
  • ভুল ৫ — গোপনে হেবা করা। মৃত্যুর পর ভাইয়েরা জানতে পেরে বিরোধে গেলে মেয়েকেই আদালতে দৌড়াতে হয়।
  • ভুল ৬ — ছেলেদের সম্পূর্ণ বঞ্চিত করে সব মেয়েকে দিয়ে দেওয়া। উল্টো দিকের অন্যায়ও অন্যায়ই।

আগে দেখুন ফারায়েজে মেয়ে কত পাচ্ছে

ওয়ারিশদের তালিকা দিন — মেয়ের প্রকৃত অংশ দেখে তারপর অতিরিক্ত ব্যবস্থার কথা ভাবুন।

ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

ফারায়েজের ভগ্নাংশ বদলে নয়। তবে জীবিত অবস্থায় হেবা করে, তার নামে সম্পত্তি কিনে বা অন্য বৈধ ব্যবস্থায় বেশি দেওয়া যায়। মৃত্যুর পর অবশিষ্ট সম্পত্তির উপর ফারায়েজের নিয়মই চলবে।
নির্ভরযোগ্য পথ নয়। ওয়ারিশের জন্য করা ওসিয়ত কার্যকর হয় শুধু অন্য ওয়ারিশদের সম্মতিতে — আর মেয়ে নিজেই একজন ওয়ারিশ। ভাইয়েরা আপত্তি করলে ওসিয়তটি কার্যকর হয় না।
বৈধভাবে সম্পূর্ণ হেবার পর সম্পত্তিটি আর মৃতের তরিকার অংশ নয়, তাই ভাইয়েরা সেখানে ভাগ দাবি করতে পারেন না। তবে দখল হস্তান্তর বা রেজিস্ট্রেশনের শর্ত পূরণ না হলে হেবা চ্যালেঞ্জযোগ্য হয়ে যায়।
প্রয়োজনের ভিত্তিতে — যেমন মেয়ে অসচ্ছল বা তার দায়িত্ব বেশি — বেশি দেওয়ায় সমস্যা নেই। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়া সন্তানদের মধ্যে অন্যায় বৈষম্য করা নিরুৎসাহিত। উদ্দেশ্য পরিষ্কার রাখা ও সবাইকে জানিয়ে রাখা জরুরি।
পারেন এবং সেটি সম্পূর্ণ বৈধ। বণ্টনের পর প্রত্যেকে নিজের অংশের পূর্ণ মালিক, তাই যে যা দিতে চান দিতে পারেন। লিখিতভাবে ও রেজিস্ট্রি করে দেওয়াই নিরাপদ।
জীবিত অবস্থায় সম্পূর্ণ হেবা — ঘোষণা, গ্রহণ ও দখল হস্তান্তর তিনটিই করে এবং স্থাবর সম্পত্তি হলে রেজিস্ট্রি করে। সঙ্গে সবাইকে জানিয়ে রাখলে পরে বিরোধের আশঙ্কাও কমে।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। প্রতিটি পরিবারের অবস্থা আলাদা এবং ছোট একটি তথ্য পুরো হিসাব বদলে দিতে পারে। দলিল, নামজারি বা বণ্টননামার আগে স্থানীয় আলেম ও আইনজীবীর সঙ্গে মিলিয়ে নিন।