গ্রামের অনেক পরিবারে মেয়েদের মিরাস দেওয়া হয় ফসলি জমি থেকে, আর বসতবাড়ি থেকে যায় ছেলেদের নামে। যুক্তি হিসেবে বলা হয়: “মেয়ে তো শ্বশুরবাড়ি চলে গেছে, বাপের ভিটায় তার ঘর উঠবে না।” কেউ কেউ আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, ভিটা আর অস্থাবর জিনিসে মেয়েদের কোনো হকই নেই।

এখানে দুটি প্রশ্ন আলাদা: মেয়ে ভিটায় অংশের মালিক কি না, আর সেই অংশ কীভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। প্রথমটির উত্তর ফারায়েজে স্পষ্ট; দ্বিতীয়টিতে পরিবারের হাতে বেশ কিছু বৈধ পথ আছে।

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী: ভিটা তরিকার বাইরে নয়

সূরা নিসার ৭ নম্বর আয়াত উত্তরাধিকারের মূল ঘোষণা: পুরুষদের জন্য অংশ আছে মা-বাবা ও নিকটাত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পদে, নারীদের জন্যও অংশ আছে — তা কম হোক বা বেশি, এটি নির্ধারিত অংশ। আয়াতে সম্পদের কোনো ধরন বাদ রাখা হয়নি।

তাই মৃত্যুর দিন বাবার মালিকানায় যা ছিল — বসতবাড়ি, ভিটার জমি, পুকুর, বাগান, গোয়ালঘর, আসবাব, গয়না, নগদ টাকা — সবই এক তরিকা। মেয়ের অংশ এর প্রতিটিতে একই অনুপাতে। অন্য ওয়ারিশ না থাকলে দুই ছেলে ও এক মেয়ের পরিবারে মেয়ে পুরো তরিকার ১/৫ পান, ভিটারও ১/৫।

সম্পদমেয়ের অংশ আছে?
বসতবাড়ি ও ভিটার জমিহ্যাঁ — অন্য জমির মতোই
পুকুর, বাগান, গাছপালাহ্যাঁ
ঘরের আসবাব, গবাদিপশু, যানবাহনহ্যাঁ — অস্থাবরও তরিকা
দোকান বা ব্যবসার মালিকানাহ্যাঁ
বাবা জীবদ্দশায় যা হেবা করে দখল দিয়ে গেছেননা — সেটি আর বাবার তরিকায় নেই

শেষ সারির ব্যতিক্রম ছেলে-মেয়ে সবার জন্য সমান; আর জীবদ্দশার হেবার নিয়ম দেখুন হেবা ও উত্তরাধিকার লেখায়।

মেয়ের অংশ কত, তা নির্ভর করে পরিবারে আর কারা আছেন তার উপর — দেখুন মেয়ে বাবার সম্পত্তিতে কতটুকু পাবে। এখানে প্রশ্নটি শুধু এই: ভিটা সেই হিসাবের বাইরে থাকে কি না। থাকে না।

ভিটা কেটে ভাগ করতেই হবে কি?

না। মালিকানায় মেয়ের অংশ আছে, কিন্তু সেই অংশ বুঝিয়ে দেওয়ার পথ একাধিক। বসতবাড়ি ছোট হলে টুকরো করলে কারও কাজে আসে না — তখন পরিবার সাধারণত নিচের কোনো একটি পথ নেয়:

  • মূল্য দিয়ে সমন্বয় — ভাইয়েরা ভিটা রাখেন, বোনদের অংশের ন্যায্য বাজারমূল্য টাকায় বা অন্য জমিতে দেন। দাম কীভাবে ঠিক করবেন, তা আছে একজন বাড়ি নিলে অন্যরা টাকা লেখায়।
  • অন্য সম্পদ দিয়ে সমান করা — মোট তরিকার মূল্য হিসাব করে মেয়েকে ফসলি জমি বা অন্য সম্পদ বেশি দিয়ে ভিটার অংশ পুষিয়ে দেওয়া — যদি মোট মূল্যে তাঁর পূর্ণ অংশ পূরণ হয়।
  • যৌথ মালিকানা রাখা — ভাগ না করে সবার নাম রেখে দেওয়া; পরে বিক্রি হলে মেয়ে নিজের অংশের টাকা পান।
শর্ত একটাই: মেয়ের মোট প্রাপ্য মূল্যের চেয়ে কম দিয়ে “ভিটার বদলে এটা নাও” বলা যায় না। ফসলি জমির অংশ তো তাঁর এমনিতেই প্রাপ্য — সেটি দিয়ে ভিটার অংশ “শোধ” হয় না। সমন্বয় মানে মোট হিসাবে পুরোটা বুঝিয়ে দেওয়া।

যৌথ পরিবারে বাড়ি ও ভিটা ভাগের ব্যবহারিক জটিলতা নিয়ে আলোচনা আছে যৌথ পরিবারের সম্পত্তি কীভাবে ভাগ হয় লেখায়।

মেয়ে নিজে ছেড়ে দিলে

প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে জেনে-বুঝে, খুশিমনে নিজের অংশ ভাইদের দিয়ে দিতে পারেন — এটি তাঁর অধিকার। কিন্তু সমাজের চাপে, “ভাইদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হবে” ভয়ে বা “বাপের বাড়ির ভাগ চাওয়া লজ্জার” ধারণা থেকে ছাড়ানো আর স্বেচ্ছায় ছাড়া এক নয়। নাবালিকা মেয়ের অংশ অভিভাবক বা ভাইয়েরা কোনোভাবেই ছেড়ে দিতে পারেন না।

কোনো ওয়ারিশ অংশ না নিলে সেই অংশের কী হয়, তা আছে ওয়ারিশ ভাগ না নিলে সেই অংশ কোথায় যায় লেখায়।

বিয়ের খরচ কি ভিটার অংশ থেকে কাটা যায়?

অনেক পরিবারে বলা হয়, মেয়ের বিয়েতে বাবা অনেক খরচ করেছেন, গয়না দিয়েছেন — তাই ভিটায় তাঁর আর দাবি নেই। বাবা জীবদ্দশায় কাউকে যা দিয়ে গেছেন, তা পরে তাঁর মিরাসের অংশ থেকে কেটে রাখার বিধান ফারায়েজে নেই; ছেলেদের পড়াশোনা বা ব্যবসায় বাবার খরচও তো কাটা হয় না। মৃত্যুর দিন যা ছিল, তা সব ওয়ারিশের মধ্যে নির্ধারিত হারে ভাগ হবে।

বাংলাদেশের আইন ও প্রক্রিয়ায়

  • নামজারি — ওয়ারিশ সূত্রে নামজারিতে মেয়েদের নামও আসার কথা; বাদ পড়লে সংশোধনের পথ দেখুন ওয়ারিশ সনদ বা নামজারিতে নাম বাদ পড়লে লেখায়।
  • বণ্টননামা — মূল্য দিয়ে সমন্বয় বা ছাড় দেওয়া হলে তা লিখিত ও নিবন্ধিত বণ্টননামায় রাখাই নিরাপদ; দেখুন বণ্টননামা দলিল।
  • বসতবাড়ি-সংক্রান্ত বিশেষ বিধান — বসতবাড়ির অংশ বিক্রি বা অগ্রক্রয়ের অধিকার নিয়ে বাংলাদেশে আলাদা আইনি বিধান থাকতে পারে, কিন্তু আমরা সরকারি উৎসে তা যাচাই করিনি; তাই এখানে কোনো ধারা উল্লেখ করা হলো না। বিক্রির আগে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়

  • ভুল ১ — ধরে নেওয়া যে ভিটা ও বসতবাড়ি শুধু ছেলেদের। এটি প্রথা, শরিয়াহর বিধান নয়।
  • ভুল ২ — মেয়েকে শুধু ফসলি জমির অংশ দিয়ে ভিটার অংশ “মাফ” ধরা। মোট মূল্যে পূর্ণ অংশ দিতে হয়।
  • ভুল ৩ — বাজারমূল্যের অনেক কম দামে বোনের ভিটার অংশ কিনে নেওয়া, আর সেটাকে “সমন্বয়” বলা।
  • ভুল ৪ — বিয়ের খরচ বা গয়নাকে মিরাসের অগ্রিম হিসেবে ধরা।
  • ভুল ৫ — অস্থাবর জিনিস — আসবাব, গয়না, গবাদিপশু — ভাগ না করে বাড়িতে থাকা ভাইদের কাছে রেখে দেওয়া। এগুলোও তরিকা।
  • ভুল ৬ — মুখে “ছেড়ে দিলাম” বলাকে চূড়ান্ত ধরা, কোনো লিখিত বণ্টন ছাড়াই। পরে বিরোধ হলে প্রমাণ থাকে না।

ভিটাসহ পুরো তরিকার হিসাব করুন

মোট সম্পত্তির মূল্য বসিয়ে দেখুন প্রত্যেক মেয়ের অংশ টাকায় কত — সমন্বয়ের সময় এটিই ভিত্তি।

উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটরে হিসাব করুন →

প্রাথমিক সূত্র

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

হ্যাঁ। বসতবাড়ি ও ভিটা বাবার তরিকার অংশ; মেয়ে তাঁর নির্ধারিত হারে এতেও অংশের মালিক, অন্য জমির মতোই।
হ্যাঁ, সবার সম্মতিতে পারে — যদি বোনকে তাঁর অংশের ন্যায্য মূল্য দেওয়া হয়। কম দামে জোর করে নেওয়া বৈধ সমন্বয় নয়।
হ্যাঁ। আসবাব, গয়না, নগদ টাকা, গবাদিপশু — মৃত্যুর দিন বাবার মালিকানার সবকিছুই তরিকা, মেয়েরা তাতে নির্ধারিত অংশ পান।
না। জীবদ্দশায় দেওয়া খরচ বা উপহার পরে মিরাস থেকে কেটে রাখার বিধান ফারায়েজে নেই। মৃত্যুর দিন যা ছিল, তা নির্ধারিত হারে ভাগ হবে।
প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে জেনে-বুঝে স্বেচ্ছায় ছাড়তে পারেন। চাপে ছাড়ানো বা নাবালিকার অংশ অভিভাবকের ছেড়ে দেওয়া বৈধ নয়।
না। সবার সম্মতিতে মূল্য দিয়ে সমন্বয়, অন্য সম্পদ দিয়ে সমান করা বা যৌথ মালিকানা রাখা — যেকোনো পথ নেওয়া যায়, যদি মোট মূল্যে প্রত্যেকে পূর্ণ অংশ পান।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখায় ফারায়েজের নীতি ও বাংলাদেশে প্রযোজ্য আইন/প্রক্রিয়া আলাদা করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নিজের ক্ষেত্রে প্রয়োগের আগে পরিস্থিতি যাচাই করুন।