পারিবারিক ঝগড়ার পর বাবা রাগ করে বলে দেন, “তুমি আমার ছেলে না, আমার সম্পত্তির এক ইঞ্চিও পাবে না।” কেউ কেউ আরও এক ধাপ এগিয়ে নোটারি পাবলিকের কাছে গিয়ে “ত্যাজ্যনামা” করেন। বাবার মৃত্যুর পর তখন ভাইবোনেরা সেই কাগজ দেখিয়ে বলেন — তুমি তো ত্যাজ্য, তোমার ভাগ নেই।

প্রশ্নটি তাই দুই স্তরের: ফারায়েজের দৃষ্টিতে এমন ঘোষণার কোনো মূল্য আছে কি না, আর বাস্তবে কোন কাজ করলে সন্তানের ভাগ সত্যিই কমে যায়।

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী: মিরাস আসে বংশ থেকে, আচরণ থেকে নয়

সূরা নিসার ১১ নম্বর আয়াতে সন্তানদের অংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, আর ১৩–১৪ নম্বর আয়াতে এই সীমাগুলোকে “আল্লাহর সীমা” বলে সেগুলো লঙ্ঘনের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। অংশটি কোনো ব্যক্তির দান নয় যে তিনি চাইলে ফিরিয়ে নেবেন।

হানাফি আলেমদের ফতোয়াতেও একই কথা: অবাধ্য, পথভ্রষ্ট বা গুনাহগার সন্তানও বাবা-মায়ের ওয়ারিশ; ব্যতিক্রম কেবল খুব বিরল অবস্থা, যেমন ইসলাম ত্যাগ করা বা বাবা-মাকে হত্যা করা। অর্থাৎ বাবা-মা নিজের ইচ্ছায় কোনো সন্তানকে মিরাস থেকে বাদ দিতে পারেন না।

পরিস্থিতিমৃত্যুর পর ওয়ারিশ থাকে কি?
বাবা মুখে “ত্যাজ্য” ঘোষণা করেছেনহ্যাঁ — ঘোষণায় বংশের সম্পর্ক বদলায় না
নোটারি করা ত্যাজ্যনামা আছেফারায়েজে হ্যাঁ — কাগজটি নির্ধারিত অংশ বাতিল করতে পারে না
সন্তান অবাধ্য, বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে নাহ্যাঁ — এটি গুরুতর গুনাহ, কিন্তু মিরাস বাতিলের কারণ নয়
পরিবারের অমতে বিয়ে করেছেহ্যাঁ
নামাজ পড়ে না, বা অন্য গুনাহে জড়িতগুনাহের কারণে অংশ কমে না; তবে কেউ স্পষ্টভাবে ইসলাম ত্যাগ করলে সেটি আলাদা প্রশ্ন (নিচে দেখুন)
বাবা বা মাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছেনা — এটি স্বীকৃত বঞ্চনার কারণ

টেবিলের শেষ সারি ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রে সন্তান অন্য ভাইবোনের মতোই ভাগ পান — ছেলে ছেলের হারে, মেয়ে মেয়ের হারে।

কোন কারণে সন্তান সত্যিই বঞ্চিত হয়

ফারায়েজে ওয়ারিশ হওয়ার বাধা নির্দিষ্ট ও সীমিত। বাংলাদেশের পরিবারে প্রাসঙ্গিক দুটি:

  • অন্যায় হত্যা — যে সন্তান বাবা বা মাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে, সে তাঁর সম্পত্তি পায় না। কোন ধরনের মৃত্যুতে এই নিয়ম খাটে এবং কে তা নির্ধারণ করবেন, সেই আলোচনা আছে হত্যাকারী কি ওয়ারিশ হতে পারেন লেখায়।
  • ধর্মের ভিন্নতা — সহিহ বুখারির ৬৭৬৪ নম্বর হাদিসে এসেছে, মুসলিম অমুসলিমের ওয়ারিশ হয় না, অমুসলিমও মুসলিমের ওয়ারিশ হয় না। মৃত্যুর সময় সন্তান ইসলাম ত্যাগ করে থাকলে এই নিয়ম প্রাসঙ্গিক। বিস্তারিত অমুসলিম আত্মীয় কি অংশ পান লেখায়।
পার্থক্যটা খেয়াল করুন: এই বাধাগুলো শরিয়াহ নিজে ঠিক করেছে, বাবা-মা নন। বাবা নিজে “তুমি বাদ” বললে তালিকায় নতুন কোনো বাধা যোগ হয় না। আর কাউকে ইসলাম-ত্যাগী বলে ধরে নেওয়া পরিবারের আন্দাজের বিষয় নয় — এমন দাবি উঠলে যোগ্য মুফতির কাছ থেকে ফয়সালা নিন।

ভাগের হিসাবও বদলায় না। ধরুন কারও দুই ছেলে ও এক মেয়ে, এক ছেলেকে তিনি ত্যাজ্য ঘোষণা করেছিলেন। তাহলেও দুই ছেলে সমান অংশ পাবেন, আর প্রত্যেক ছেলে মেয়ের দ্বিগুণ। ছেলে ও মেয়ের এই অনুপাত কেন, তা দেখুন ছেলে ও মেয়ের অংশ ২ঃ১ কেন লেখায়।

ফলাফল যেখানে বদলায়: জীবদ্দশায় হেবা

ত্যাজ্যনামা মিরাস বদলাতে পারে না, কিন্তু বাবা জীবিত থাকতে নিজের সম্পত্তি কাউকে হেবা (দান) করে দখল বুঝিয়ে দিলে সেই সম্পত্তি আর তাঁর মালিকানায় থাকে না। মৃত্যুর পর মিরাস ভাগ হয় কেবল তিনি মৃত্যুর দিন যা রেখে গেছেন তা থেকে। তাই বাস্তবে বঞ্চনা ঘটে এই পথেই — অন্য সন্তানদের নামে জমি লিখে দিয়ে।

কিন্তু এই পথ শরিয়াহর দৃষ্টিতে মুক্ত নয়। সহিহ বুখারির ২৫৮৭ নম্বর হাদিসে নুমান ইবনে বাশির (রা.)-এর বাবা এক সন্তানকে দান করে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সাক্ষী করতে চাইলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, সব সন্তানকে কি এমন দিয়েছেন? “না” শুনে বলেন — আল্লাহকে ভয় করো এবং সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ করো। তাঁর বাবা দানটি ফিরিয়ে নেন।

অর্থাৎ কোনো সন্তানকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে জীবদ্দশায় বাকিদের সব লিখে দেওয়া একজন মুসলমানের জন্য গুরুতর প্রশ্নের বিষয় — এমনকি দলিলটি কাগজে টিকে গেলেও। হেবা কখন সম্পন্ন হয় এবং মিরাসের সঙ্গে এর পার্থক্য কী, তা আছে হেবা ও উত্তরাধিকার — পার্থক্য ও আইনি শর্ত লেখায়; জীবদ্দশায় ভাগ করে দেওয়ার দিকগুলো আছে জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি বণ্টন করা যায় কি লেখায়।

ওসিয়ত করে কি বাদ দেওয়া যায়?

না। ওসিয়তের সীমা সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ — সহিহ বুখারির ২৭৪২ নম্বর হাদিসে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা.) এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত অনুমতি দিয়ে বলেছিলেন, ওয়ারিশদের সচ্ছল রেখে যাওয়া তাদের অভাবী রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম। “আমার অমুক সন্তান কিছু পাবে না” — এমন লেখা আসলে ওসিয়ত নয়; এটি আল্লাহর নির্ধারিত অংশ বাতিলের চেষ্টা, তাই এর ভিত্তিতে ভাগ হবে না। ওসিয়তের নিয়ম দেখুন ওসিয়ত কতটুকু করা যায় লেখায়।

বাংলাদেশের আইন ও প্রক্রিয়ায়

এই অংশটি ফারায়েজ থেকে আলাদা করে পড়ুন।

  • ত্যাজ্যনামার আইনি মূল্য — নোটারি করা ত্যাজ্যনামা দিয়ে সন্তানকে উত্তরাধিকার থেকে বাদ দেওয়ার কোনো বিধান আমরা সরকারি আইন-উৎসে যাচাই করতে পারিনি, তাই এখানে কোনো ধারা উল্লেখ করা হলো না। কাগজটি নিয়ে বিরোধ হলে একজন আইনজীবীকে দেখান।
  • দলিল করা হেবা — জীবদ্দশায় রেজিস্ট্রি করা দানপত্র একটি আলাদা আইনি দলিল; এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে সেটি আদালতের বিষয়, ত্যাজ্যনামার নয়।
  • ওয়ারিশ সনদ ও নামজারি — ত্যাজ্য বলে কারও নাম বাদ দিয়ে ওয়ারিশ সনদ বা নামজারি করা হলে সংশোধনের পথ আছে; দেখুন ওয়ারিশ সনদ বা নামজারিতে নাম বাদ পড়লে।

যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়

  • ভুল ১ — ত্যাজ্যনামাকে মিরাস বাতিলের দলিল মনে করা। ফারায়েজে এর কোনো প্রভাব নেই।
  • ভুল ২ — অবাধ্যতা, বেনামাজি হওয়া বা পালিয়ে বিয়েকে বঞ্চনার কারণ ভাবা। গুনাহ আর মিরাসের বাধা এক জিনিস নয়।
  • ভুল ৩ — “বাবার শেষ ইচ্ছা ছিল” বলে ত্যাজ্য সন্তানের অংশ অন্য ভাইবোনের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া। ওয়ারিশের অংশ ইচ্ছার বিষয় নয়।
  • ভুল ৪ — ধরে নেওয়া যে জীবদ্দশায় এক সন্তানকে বাদ দিয়ে বাকিদের লিখে দিলে কোনো দায় নেই। দলিল টিকলেও ইনসাফের দায় থেকে যায়।
  • ভুল ৫ — ত্যাজ্য সন্তান মারা গেলে বাবা-মা তাঁর ওয়ারিশ নন ভাবা। সম্পর্ক উভয় দিকেই বহাল — সেই সন্তান আগে মারা গেলে বাবা-মা নিয়ম অনুযায়ী তাঁর ওয়ারিশ হন।

ত্যাজ্য সন্তানকে বাদ না দিয়ে হিসাব করুন

সব ছেলে-মেয়েকে তালিকায় রেখে দেখুন প্রত্যেকে কত পান — কাগজে ত্যাজ্য লেখা থাকলেও।

উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটরে হিসাব করুন →

প্রাথমিক সূত্র

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

ফারায়েজের দৃষ্টিতে আপনি ওয়ারিশ। সন্তানের অংশ বংশের সম্পর্কের ভিত্তিতে আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন; ত্যাজ্যনামা সেই সম্পর্ক বা অংশ বাতিল করে না। আইনি বিরোধ হলে কাগজটি আইনজীবীকে দেখান।
না। বাবা-মায়ের অবাধ্যতা গুরুতর গুনাহ, কিন্তু এটি মিরাসের বাধা নয়। হানাফি ফতোয়া অনুযায়ী বাধা কেবল বিরল কিছু কারণে হয়, যেমন বাবা-মাকে হত্যা বা ইসলাম ত্যাগ।
নামাজ না পড়ার কারণে অংশ কমে না বা বাতিল হয় না। কেউ স্পষ্টভাবে ইসলাম ত্যাগ করেছে কি না — সেটি আলাদা প্রশ্ন, যার ফয়সালা পরিবার নয়, যোগ্য মুফতি দেবেন।
হ্যাঁ। পরিবারের অমতে বিয়ে করায় মেয়ের নির্ধারিত অংশ বাতিল হয় না; সে অন্য মেয়েদের মতোই অংশ পায়।
দখলসহ সম্পন্ন হেবা হলে সেই সম্পত্তি আর তরিকায় থাকে না, তাই মিরাসে ভাগ হয় না। তবে সহিহ বুখারির হাদিসে সন্তানদের দানে ইনসাফ করার নির্দেশ আছে; বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে এমন দান শরিয়াহর দৃষ্টিতে আপত্তিকর।
না। ওসিয়ত দিয়ে কোনো ওয়ারিশের নির্ধারিত অংশ বাতিল করা যায় না। ভাগ হবে ফারায়েজের নিয়মে।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখায় ফারায়েজের নীতি ও বাংলাদেশে প্রযোজ্য আইন/প্রক্রিয়া আলাদা করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নিজের ক্ষেত্রে প্রয়োগের আগে পরিস্থিতি যাচাই করুন।