স্বামী গোপনে বা প্রথম স্ত্রীর আপত্তি সত্ত্বেও দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর প্রথম সংসার থেকে প্রায়ই দাবি ওঠে — “অনুমতি ছাড়া বিয়ে আইনে চলে না, তাই ওই স্ত্রী আর তার সন্তানেরা কিছু পাবে না।” প্রশ্নটির উত্তর দুই স্তরে আলাদা করে দেখতে হয়: শরিয়াহর দৃষ্টিতে বিয়েটি বৈধ কি না, আর বাংলাদেশের আইন অনুমতিহীন বিয়ের কী পরিণতি ঠিক করেছে।
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী: বিয়ের বৈধতা, অনুমতি নয়
সূরা নিসার ৩ নম্বর আয়াতে ন্যায়বিচারের শর্তে একাধিক বিয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, আর ইনসাফ করতে না পারার আশঙ্কা থাকলে একজনেই সীমিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হানাফি ফিকহে নিকাহ সহিহ হওয়ার শর্ত হলো বৈধ ইজাব-কবুল, প্রয়োজনীয় সাক্ষী এবং শরিয়াহর কোনো বাধা (যেমন মাহরাম হওয়া বা চারজন স্ত্রী থাকা অবস্থায় পঞ্চম বিয়ে) না থাকা। প্রথম স্ত্রীর অনুমতি এই শর্তগুলোর মধ্যে নেই।
ফলে শরিয়াহর শর্ত পূরণ হলে:
- দ্বিতীয় স্ত্রী — স্বামীর মৃত্যুর দিন বিয়ে বহাল থাকলে তিনি স্ত্রী হিসেবে ওয়ারিশ। স্ত্রীদের জন্য নির্ধারিত অংশ (সন্তান থাকলে ১/৮, না থাকলে ১/৪) সব স্ত্রী সমান ভাগে ভাগ করেন — দ্বিতীয় বা গোপন স্ত্রী বলে কম নয়। বিস্তারিত একাধিক স্ত্রী থাকলে সম্পত্তি ভাগ লেখায়।
- দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান — বৈধ বিয়ের সন্তান হিসেবে তাদের বংশ-পরিচয় বাবার সঙ্গে সাব্যস্ত; তারা প্রথম সংসারের সন্তানদের সমান হারে বাবার ওয়ারিশ — ছেলে ছেলের হারে, মেয়ে মেয়ের হারে।
- প্রথম স্ত্রী — তাঁর অংশও বহাল; দ্বিতীয় বিয়ের কারণে তিনি ওয়ারিশ থাকা বন্ধ হন না।
বিয়েটির শরয়ি বৈধতা নিয়েই যদি প্রশ্ন থাকে — যেমন সাক্ষী ছিল না, বা ইদ্দতের মধ্যে বিয়ে হয়েছিল — তাহলে প্রশ্নটি আর “অনুমতি” নিয়ে নয়; সেটি নিয়ে একজন মুফতির কাছ থেকে ফয়সালা নিন। বৈধ বিয়ের সন্তানের বংশ-পরিচয় নিয়ে সন্দেহ তোলার সীমা আলোচনা করা হয়েছে বিবাহবহির্ভূত সন্তান কার ওয়ারিশ লেখায়।
বাংলাদেশের আইনে: মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ — ধারা ৬
সরকারি আইন-ওয়েবসাইট bdlaws.minlaw.gov.bd-তে প্রকাশিত ধারা ৬ (Polygamy)-এর পাঠ অনুযায়ী মূল কথাগুলো:
| উপধারা | যা বলা হয়েছে (সংক্ষেপে) |
|---|---|
| ৬(১) | বিদ্যমান বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় কোনো পুরুষ সালিশি পরিষদের পূর্ব লিখিত অনুমতি ছাড়া আরেকটি বিয়ে করবেন না; অনুমতি ছাড়া করা এমন বিয়ে ১৯৭৪ সালের নিবন্ধন আইনে নিবন্ধিত হবে না |
| ৬(২) | অনুমতির আবেদন চেয়ারম্যানের কাছে; তাতে প্রস্তাবিত বিয়ের কারণ এবং বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না, তা উল্লেখ করতে হয় |
| ৬(৩) | আবেদনকারী ও বর্তমান স্ত্রীর প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত সালিশি পরিষদ বিয়েটি প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সংগত মনে করলে অনুমতি দিতে পারে |
| ৬(৪) | সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্ধারিত পদ্ধতিতে সহকারী জজের কাছে রিভিশন আবেদন করা যায় |
| ৬(৫) | অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে স্বামীকে (ক) বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের পুরো মোহর — তাৎক্ষণিক দেয় (prompt) হোক বা বিলম্বিত (deferred) — সঙ্গে সঙ্গে পরিশোধ করতে হবে, না দিলে তা ভূমি রাজস্বের বকেয়ার মতো আদায়যোগ্য; এবং (খ) অভিযোগের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত হলে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড, দশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ড |
পাঠটি সংক্ষেপে বাংলায় উপস্থাপিত; হুবহু পাঠের জন্য নিচের সরকারি সূত্র দেখুন। লক্ষ করুন, আইনটি অনুমতি দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছে সালিশি পরিষদকে; বর্তমান স্ত্রীর সম্মতির কথা আবেদনে উল্লেখ করার বিষয় হিসেবে এসেছে।
ধারা ৬ যা বলেনি
ধারাটির সরকারি পাঠে অনুমতিহীন বিয়েকে বাতিল বা অকার্যকর ঘোষণা করার কোনো কথা নেই, আর উত্তরাধিকার নিয়েও কিছু বলা হয়নি। পরিণতি হিসেবে বলা হয়েছে তিনটি: নিবন্ধন না হওয়া, বর্তমান স্ত্রীর পুরো মোহর তাৎক্ষণিক পাওনা হওয়া, এবং স্বামীর শাস্তি। দ্বিতীয় স্ত্রী বা সন্তানের উত্তরাধিকার নিয়ে আদালত কোনো নির্দিষ্ট মামলায় কী সিদ্ধান্ত দিয়েছে, তা আমরা এখানে যাচাই করিনি — বিরোধ আদালতে গেলে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
মোহরের দিকটি মিরাসের আগে
স্বামীর মৃত্যুর সময় কোনো স্ত্রীর মোহর অপরিশোধিত থাকলে সেটি তাঁর ঋণ; মিরাস ভাগের আগে পুরো সম্পত্তি থেকে পরিশোধ করতে হয় — প্রথম ও দ্বিতীয় দুই স্ত্রীর ক্ষেত্রেই। ধারা ৬(৫)(ক) শুধু জীবদ্দশায় প্রথম স্ত্রীর মোহর তাৎক্ষণিক পাওনা করেছে; মৃত্যুর পর অপরিশোধিত থাকলে তা তরিকা থেকেই আদায় হবে। দেখুন দেনমোহর পরিশোধ না হলে সম্পত্তি থেকে কীভাবে আদায় হয়।
যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়
- ভুল ১ — “অনুমতি ছাড়া বিয়ে অবৈধ, তাই দ্বিতীয় স্ত্রী কিছু পাবেন না” — ধারা ৬-এর পাঠে বিয়ে বাতিলের কথা নেই, আর হানাফি ফিকহে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি বৈধতার শর্ত নয়।
- ভুল ২ — দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তানদের প্রথম সংসারের সন্তানদের চেয়ে কম দেওয়া। বাবার সম্পত্তিতে সব সন্তান সমান হারে।
- ভুল ৩ — দুই স্ত্রীর প্রত্যেককে আলাদা ১/৮ দেওয়া। স্ত্রীদের মোট অংশ একটিই, তা সমান ভাগে।
- ভুল ৪ — ধারা ৬-এর শাস্তিকে দ্বিতীয় স্ত্রীর শাস্তি ভাবা। শাস্তি ও মোহর পরিশোধের দায় স্বামীর।
- ভুল ৫ — আইনি বাধ্যবাধকতাকে হালকা করে দেখা। অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে বাংলাদেশে দণ্ডনীয়; মিরাসের প্রশ্ন আলাদা হলেও আইন মানার দায় স্বামীর উপর থাকে।
দুই সংসারের ওয়ারিশ একসঙ্গে হিসাব করুন
স্ত্রীদের সংখ্যা ও দুই সংসারের সব সন্তান বসিয়ে দেখুন প্রত্যেকে কত পান।
উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটরে হিসাব করুন →প্রাথমিক সূত্র
- মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ — ধারা ৬ (Polygamy) — সরকারি পাঠ, bdlaws.minlaw.gov.bd
- কুরআন ৪:৩ — একাধিক বিয়ে ও ইনসাফের শর্ত
- কুরআন ৪:১১–১২ — সন্তান ও স্ত্রীর অংশ
প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
সম্পর্কিত লেখা
বি.দ্র. এই লেখায় ফারায়েজের নীতি ও বাংলাদেশে প্রযোজ্য আইন/প্রক্রিয়া আলাদা করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নিজের ক্ষেত্রে প্রয়োগের আগে পরিস্থিতি যাচাই করুন।