মা মারা যাওয়ার কয়েক বছর পর বাবা আবার বিয়ে করেছেন, সেই সংসারে সন্তানও হয়েছে। মায়ের নামে কিছু জমি ছিল, যা এখনো ভাগ হয়নি। প্রথম সংসারের সন্তানদের মনে তখন দুশ্চিন্তা — মায়ের জমি কি সৎ মা আর তাঁর সন্তানদের হাতে চলে যাবে?

এর উত্তরে দুটি হিসাব আলাদা রাখতে হয়: মায়ের তরিকা আর বাবার তরিকা। দুটি মিশিয়ে ফেললেই হয় “সব আমাদের” অথবা “সবাই সমান” — দুটোই ভুল।

প্রথম ধাপ: মায়ের সম্পত্তি ভাগ হয় মায়ের মৃত্যুর দিনের ওয়ারিশদের মধ্যে

ধরুন আমেনা বেগম মারা গেলেন; রেখে গেলেন স্বামী, এক ছেলে ও এক মেয়ে। তাঁর মা-বাবা আগেই মারা গেছেন। সন্তান থাকায় স্বামী পাবেন ১/৪; বাকি ৩/৪ ছেলে-মেয়ের মধ্যে ২ঃ১ হারে।

এখানে সৎ মায়ের কোনো জায়গা নেই — আমেনা বেগমের মৃত্যুর দিন তিনি এই পরিবারের কেউ ছিলেন না, আর থাকলেও সতিন একে অপরের ওয়ারিশ নন। বাবার দ্বিতীয় সংসারের সন্তানেরাও আমেনা বেগমের সন্তান নন, তাই তাঁর তরিকায় তাঁদের অংশ নেই।

মায়ের সম্পত্তি ভাগের সাধারণ নিয়ম দেখুন মায়ের সম্পত্তি ছেলে মেয়ের মধ্যে কীভাবে ভাগ হবে লেখায়; আর মা মারা গেলে স্বামী, ছেলে ও মেয়ের পূর্ণ হিসাব আছে মা মারা গেলে স্বামী, ছেলে ও মেয়ে কে কত পাবেন লেখায়।

বাবার ১/৪ অংশ কার?

প্রশ্নের জটটা এখানেই। মায়ের কাছ থেকে বাবা যা পেয়েছেন, সেটি এখন বাবার নিজের সম্পত্তি — ভাগ হোক বা না হোক। ফারায়েজে সম্পত্তির গায়ে “মায়ের জমি” বা “বাপের জমি” লেবেল থেকে যায় না; মালিক যিনি, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ওয়ারিশরাই পান। এই কারণেই পৈতৃক ও নিজের অর্জিত সম্পত্তিতে ফারায়েজের হিসাব আলাদা হয় না — দেখুন পৈতৃক ও অর্জিত সম্পত্তি।

তাই বাবা জীবিত থাকতে এই ১/৪ অংশ নিয়ে কারও দাবি নেই। প্রথম সংসারের সন্তানেরা এটি “মায়ের” বলে ফেরত চাইতে পারেন না, আর দ্বিতীয় সংসারও বাবার জীবদ্দশায় এর কিছু দাবি করতে পারে না।

দ্বিতীয় ধাপ: বাবার মৃত্যুর পর

ধরুন বাবা পরে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন, সেই সংসারে একটি ছেলে হয়েছে। বাবা মারা গেলেন; ওয়ারিশ: দ্বিতীয় স্ত্রী, দুই ছেলে (দুই সংসারের একজন করে) এবং প্রথম সংসারের মেয়ে। বাবার নিজের সম্পত্তি — আমেনা বেগমের কাছ থেকে পাওয়া অংশসহ — এখন এভাবে ভাগ হবে:

লক্ষ করুন, বাবার সম্পত্তিতে দুই সংসারের ছেলে সমান — প্রত্যেকে ৭/২০। সন্তান কোন স্ত্রীর গর্ভের, তা বাবার সম্পত্তিতে কোনো পার্থক্য করে না।

টাকায় পুরো পথটা দেখুন

আমেনা বেগমের সম্পত্তি ৪০ লাখ টাকা, আর বাবার নিজের আলাদা সম্পত্তি ৫০ লাখ টাকা ধরা যাক।

ওয়ারিশমায়ের সম্পত্তি থেকে সরাসরিবাবার সম্পত্তি (৫০ + ১০ = ৬০ লাখ) থেকেমোট
প্রথম সংসারের ছেলে২০,০০,০০০২১,০০,০০০৪১,০০,০০০
প্রথম সংসারের মেয়ে১০,০০,০০০১০,৫০,০০০২০,৫০,০০০
দ্বিতীয় সংসারের ছেলে—২১,০০,০০০২১,০০,০০০
সৎ মা (দ্বিতীয় স্ত্রী)—৭,৫০,০০০৭,৫০,০০০
বাবা১০,০০,০০০ (পরে তাঁর তরিকায় যুক্ত)——

মায়ের ৪০ লাখের মধ্যে ৩০ লাখ সরাসরি মায়ের সন্তানেরা পেয়েছেন। বাকি ১০ লাখ বাবার সম্পত্তিতে মিশে গিয়ে সবার মধ্যে ভাগ হয়েছে — সৎ মা ও সৎ ভাইয়ের হাতে যা গেছে, তা এসেছে বাবার ওয়ারিশ হিসেবে।

ধাপের ক্রম জরুরি: বাবা যদি মায়ের সম্পত্তি ভাগ হওয়ার আগেই মারা যান, তাতেও হিসাব বদলায় না — আগে মায়ের তরিকা ভাগ করে বাবার অংশ আলাদা করুন, তারপর বাবার তরিকা। দুটি একসঙ্গে করলে ভুল হবেই। ধাপে ধাপে হিসাবের পদ্ধতি আছে এক ওয়ারিশ ভাগ পাওয়ার আগেই মারা গেলে লেখায়।

উল্টো দিকের প্রশ্ন: সৎ মা মারা গেলে

একই নিয়ম উল্টো দিকেও খাটে। সৎ মায়ের নিজের সম্পত্তিতে প্রথম সংসারের সন্তানেরা ওয়ারিশ নন — তাঁরা তাঁর সন্তান নন। সৎ মা ও সৎ সন্তানের সম্পর্কের সাধারণ নিয়ম আছে সৎ মা ও সৎ বাবা কি সম্পত্তির ভাগ পান লেখায়।

সৎ ভাই-বোনদের মধ্যে কিন্তু সম্পর্ক ভিন্ন: বাবা একই হলে তাঁরা বৈমাত্রেয় ভাই-বোন, যাঁরা নির্দিষ্ট অবস্থায় একে অপরের ওয়ারিশ হতে পারেন। সেই হিসাব আছে সৎ ভাই বোন কি সম্পত্তি পাবে লেখায়।

যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়

  • ভুল ১ — সৎ মাকে মায়ের ওয়ারিশ-তালিকায় রাখা। মায়ের তরিকায় তাঁর কোনো অংশ নেই।
  • ভুল ২ — উল্টো ভুল: বাবার সম্পত্তি ভাগের সময় মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অংশ আলাদা করে শুধু প্রথম সংসারের সন্তানদের দেওয়া। সেটি বাবার সম্পত্তি, তাই বাবার সব ওয়ারিশের।
  • ভুল ৩ — মায়ের সম্পত্তি ভাগ না করে সরাসরি বাবার ওয়ারিশদের মধ্যে সব ভাগ করা। এতে প্রথম সংসারের সন্তানেরা মায়ের সরাসরি অংশ হারান।
  • ভুল ৪ — দুই সংসারের সন্তানদের বাবার সম্পত্তিতে ভিন্ন হারে ধরা। বাবার সম্পত্তিতে সব ছেলে সমান, সব মেয়ে সমান।
  • ভুল ৫ — সম্পত্তি কার নামে রেকর্ড আছে তা দেখে ওয়ারিশ ঠিক করা। ফারায়েজে দেখা হয় মালিক কে ছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর দিন কারা জীবিত।

দুই ধাপে নিজের হিসাব করুন

প্রথমে মায়ের মৃত্যুর দিনের ওয়ারিশ বসান, বাবার অংশ আলাদা করুন; তারপর বাবার ওয়ারিশদের নিয়ে দ্বিতীয় হিসাব।

উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটরে হিসাব করুন →

প্রাথমিক সূত্র

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

না। সৎ মা আপনার মায়ের ওয়ারিশ নন। মায়ের ওয়ারিশ তাঁর স্বামী, নিজের সন্তান এবং জীবিত থাকলে তাঁর মা-বাবা।
মায়ের সরাসরি তরিকায় না, কারণ তাঁরা মায়ের সন্তান নন। তবে বাবা মায়ের কাছ থেকে যে অংশ পেয়েছিলেন, বাবার মৃত্যুর পর সেটি বাবার সব সন্তানের মধ্যে ভাগ হয়।
মায়ের সন্তান থাকলে স্বামী হিসেবে বাবা ১/৪ পান, সন্তান না থাকলে ১/২। এটি বাবার নিজের সম্পত্তি হয়ে যায়।
না। উত্তরাধিকারে পাওয়ার পর সেটি বাবার মালিকানা; তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সব ওয়ারিশের মধ্যে ফারায়েজ অনুযায়ী ভাগ হবে।
হ্যাঁ। বাবার সম্পত্তিতে সন্তান কোন স্ত্রীর, তা দেখা হয় না — সব ছেলে সমান, সব মেয়ে সমান, আর ছেলে মেয়ের দ্বিগুণ।
আগে মায়ের মৃত্যুর দিনের ওয়ারিশ ধরে মায়ের সম্পত্তি ভাগ করুন এবং বাবার অংশ আলাদা করুন। তারপর সেই অংশ বাবার বাকি সম্পত্তির সঙ্গে যোগ করে বাবার ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ করুন।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখার হিসাব হানাফি ফারায়েজ নীতির সাধারণ ব্যাখ্যা। বাস্তব বণ্টনের আগে ওয়ারিশের পূর্ণ তালিকা, ঋণ ও ওসিয়ত যাচাই করে নিন।