“আমার স্বামী তো এই বাড়িরই ছেলে ছিলেন, তাঁর ভাগের জমি আমার সন্তানদের নিয়ে আমি পাব না কেন?” — বিধবা পুত্রবধূর এই প্রশ্ন বাংলাদেশের পরিবারে খুব পরিচিত। একইভাবে কোনো জামাই শ্বশুরের ব্যবসায় বছরের পর বছর খাটার পর ধরে নেন, শ্বশুরের মৃত্যুর পর তাঁরও কিছু প্রাপ্য।
উত্তরের দুটি অংশ। প্রথমত — কে সরাসরি ওয়ারিশ। দ্বিতীয়ত — কে কারও মাধ্যমে ঘুরে অংশ পান। এই দুটি আলাদা না করলেই বিভ্রান্তি হয়।
ওয়ারিশ হওয়ার ভিত্তি: রক্ত ও নিজের বিবাহ
সূরা নিসার ১১ ও ১২ নম্বর আয়াতে যাঁদের অংশ বলা হয়েছে, তাঁরা হয় মৃত ব্যক্তির রক্তের আত্মীয় — সন্তান, মা-বাবা, ভাই-বোন — নয়তো তাঁর নিজের স্বামী বা স্ত্রী। সূরা আনফালের ৭৫ নম্বর আয়াতেও বলা হয়েছে, আল্লাহর বিধানে আত্মীয়রা (রক্তের সম্পর্কে) একে অপরের বেশি হকদার।
বিবাহ উত্তরাধিকার তৈরি করে শুধু দুজনের মধ্যে — স্বামী ও স্ত্রী। সেই বিয়ের কারণে যে আত্মীয়তা গড়ে ওঠে (শ্বশুরবাড়ি, জামাই, পুত্রবধূ), তা সম্মান ও দায়িত্বের সম্পর্ক, কিন্তু উত্তরাধিকারের নয়।
| সম্পর্ক | কার সম্পত্তিতে প্রশ্ন | সরাসরি ওয়ারিশ? |
|---|---|---|
| ছেলের বউ (পুত্রবধূ) | শ্বশুর বা শাশুড়ির | না |
| জামাই | শ্বশুর বা শাশুড়ির | না |
| শ্বশুর-শাশুড়ি | ছেলের বউ বা জামাইয়ের | না |
| ভাবি, দেবর, ননদ | একে অপরের | না |
| শালা, শালী, দুলাভাই | একে অপরের | না |
| স্বামী বা স্ত্রী | নিজের স্ত্রী বা স্বামীর | হ্যাঁ |
শেষ সারিটি ছাড়া বাকি সবাই বৈবাহিক আত্মীয়। নিজের স্বামী-স্ত্রীর অংশ কত, তা আছে স্ত্রীর অংশ ও স্বামীর অংশ লেখায়।
সময়ের ক্রম যেখানে সব বদলে দেয়
বৈবাহিক আত্মীয় সরাসরি ওয়ারিশ নন, কিন্তু ধাপে ধাপে অংশ পেতে পারেন। নিয়মটি হলো: কেউ মারা গেলে তাঁর মৃত্যুর মুহূর্তে যাঁরা জীবিত, তাঁরাই ওয়ারিশ। সেই ওয়ারিশের অংশ তাঁর নিজের সম্পত্তি হয়ে যায় — ভাগ না হলেও। পরে তিনি মারা গেলে সেই অংশও তাঁর নিজের ওয়ারিশদের কাছে যায়। ফারায়েজে এই ধাপে ধাপে হিসাবকে বলে মুনাসাখা।
| ঘটনার ক্রম | ছেলের বউ কী পান |
|---|---|
| আগে শ্বশুর, পরে ছেলে মারা গেছেন | শ্বশুরের মৃত্যুতে ছেলে ওয়ারিশ হয়েছিলেন; ছেলের সেই অংশ থেকে বউ স্ত্রী হিসেবে ভাগ পান |
| আগে ছেলে, পরে শ্বশুর মারা গেছেন | শ্বশুরের সম্পত্তিতে কিছু পান না — তাঁর মৃত্যুর সময় ছেলে জীবিত ছিলেন না। বউ পান শুধু ছেলের নিজের রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে |
উদাহরণ: আগে শ্বশুর, পরে ছেলে
ধরুন রহিম সাহেব মারা গেলেন; ওয়ারিশ দুই ছেলে ও এক মেয়ে, আর কেউ নেই। প্রত্যেক ছেলে পাবেন ২/৫, মেয়ে ১/৫।
সম্পত্তি ভাগ হওয়ার আগেই বড় ছেলে করিম মারা গেলেন; তাঁর ওয়ারিশ স্ত্রী ও এক ছেলে। করিমের নিজের সম্পত্তিতে এখন বাবার কাছ থেকে পাওয়া ২/৫ অংশও আছে। সেখান থেকে স্ত্রী পাবেন ১/৮, ছেলে ৭/৮।
রহিম সাহেবের সম্পত্তি ৬০ লাখ টাকা হলে করিমের অংশ ২৪ লাখ; তার ১/৮, অর্থাৎ ৩ লাখ টাকা করিমের স্ত্রী পাবেন — শ্বশুরের ওয়ারিশ হিসেবে নয়, স্বামীর ওয়ারিশ হিসেবে। বাকি ২১ লাখ করিমের ছেলের। ভাগের আগেই কোনো ওয়ারিশ মারা গেলে কীভাবে হিসাব সাজাতে হয়, তা বিস্তারিত আছে এক ওয়ারিশ ভাগ পাওয়ার আগেই মারা গেলে লেখায়।
ছেলে আগে মারা গেলে
ক্রম উল্টো হলে — করিম আগে, রহিম সাহেব পরে মারা গেলে — ফারায়েজের মূল নিয়মে রহিম সাহেবের মৃত্যুর দিন করিম জীবিত ছিলেন না, তাই তাঁর ওয়ারিশ-তালিকায় করিম নেই। করিমের স্ত্রী শ্বশুরের সম্পত্তিতে কোনো অবস্থায় সরাসরি অংশ পান না।
জামাইয়ের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম
জামাই শ্বশুরের ওয়ারিশ নন — শ্বশুরের ব্যবসায় খাটলেও, শ্বশুরবাড়িতে থাকলেও। তবে শ্বশুর আগে মারা যাওয়ার পর মেয়ে মারা গেলে মেয়ের পাওয়া অংশ মেয়ের নিজের সম্পত্তি হয়; সেখান থেকে জামাই স্বামী হিসেবে অংশ পান — সন্তান থাকলে ১/৪, না থাকলে ১/২।
উপরের উদাহরণে রহিম সাহেবের মেয়ে যদি পরে মারা যান, রেখে যান স্বামী ও এক ছেলে, তাহলে তাঁর ১/৫ অংশের (১২ লাখ টাকা) ১/৪, অর্থাৎ ৩ লাখ টাকা জামাই পাবেন। শ্বশুর-শাশুড়ি উল্টো দিকেও একই নিয়ম মানেন: জামাই বা পুত্রবধূর সম্পত্তিতে তাঁরা ওয়ারিশ নন।
পুত্রবধূ বা জামাইকে কিছু দিতে চাইলে
শ্বশুর-শাশুড়ি চাইলে বৈধ পথে দিতে পারেন:
- ওসিয়ত — পুত্রবধূ বা জামাই ওয়ারিশ নন বলে তাঁদের জন্য ওসিয়ত করা যায়, তবে মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে। দেখুন ওসিয়ত কতটুকু করা যায়।
- হেবা — জীবদ্দশায় দান করে দখল বুঝিয়ে দিলে তা তাঁদের মালিকানা হয়ে যায়; দেখুন হেবা ও উত্তরাধিকার।
বিধবা পুত্রবধূ ও এতিম নাতি-নাতনির ভবিষ্যৎ নিয়ে যে পরিবার চিন্তিত, তাদের জন্য এই দুটি পথই কার্যকর — মৃত্যুর পরে ফারায়েজ দিয়ে এই ফাঁক পূরণ হয় না।
যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়
- ভুল ১ — স্বামী আগে মারা গেলেও বিধবা পুত্রবধূকে শ্বশুরের ওয়ারিশ-তালিকায় রাখা। তিনি সরাসরি ওয়ারিশ নন।
- ভুল ২ — উল্টো ভুল: শ্বশুর আগে মারা যাওয়ার পর ছেলে মারা গেলেও তাঁর বউকে কিছু না দেওয়া। তখন ছেলের অংশে স্ত্রীর হক আছে।
- ভুল ৩ — দুই মৃত্যুর হিসাব এক করে ফেলা। আগে প্রথম মৃত ব্যক্তির তরিকা, তারপর দ্বিতীয় জনের — আলাদা ধাপে।
- ভুল ৪ — শ্বশুরবাড়িতে থাকা বা ব্যবসায় খাটার কারণে জামাইকে ওয়ারিশ ধরা। শ্রমের পাওনা থাকলে সেটি আলাদা দাবি, মিরাস নয়।
- ভুল ৫ — শাশুড়ি মারা গেলে পুত্রবধূকে “সংসারের লোক” হিসেবে গয়নার ভাগ দেওয়া। উপহার দিতে চাইলে প্রাপ্তবয়স্ক ওয়ারিশরা নিজ নিজ অংশ থেকে স্বেচ্ছায় দিতে পারেন।
প্রথম মৃত্যুর তালিকা দিয়ে শুরু করুন
যিনি আগে মারা গেছেন, তাঁর মৃত্যুর দিন যাঁরা জীবিত ছিলেন — শুধু তাঁদের বসিয়ে প্রথম ধাপের হিসাব করুন।
উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটরে হিসাব করুন →প্রাথমিক সূত্র
- কুরআন ৪:১১–১২ — ওয়ারিশদের তালিকা
- কুরআন ৮:৭৫ — রক্তের আত্মীয়রা বেশি হকদার
- সহিহ বুখারি ২৭৪২ — ওসিয়তের এক-তৃতীয়াংশ সীমা
প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
সম্পর্কিত লেখা
বি.দ্র. এই লেখার হিসাব হানাফি ফারায়েজ নীতির সাধারণ ব্যাখ্যা। বাস্তব বণ্টনের আগে ওয়ারিশের পূর্ণ তালিকা, ঋণ ও ওসিয়ত যাচাই করে নিন।