সৎ মা বা সৎ বাবা সম্পত্তির ভাগ পান কি? প্রশ্নটি সহজ শোনালেও এখানে দুটি সম্পর্ক গুলিয়ে যায়। উত্তরটি এক লাইনে: সৎ মা বা সৎ বাবা সৎ সন্তানের ওয়ারিশ নন — কারণ তাঁদের মধ্যে রক্তের সম্পর্কও নেই, বিয়ের সম্পর্কও নেই। তবে সৎ মা তাঁর নিজের স্বামীর ওয়ারিশ, আর সেখানেই বিভ্রান্তিটা তৈরি হয়।

ফারায়েজে ওয়ারিশ হওয়ার তিনটি পথ

পথউদাহরণসৎ মা/বাবা?
রক্তের সম্পর্কসন্তান, মা-বাবা, ভাই-বোন, দাদা-দাদিনা — রক্তের সম্পর্ক নেই
বিয়ের সম্পর্কস্বামী বা স্ত্রীনা — সৎ সন্তানের সঙ্গে বিয়ের সম্পর্ক নেই
আইনি বিশেষ বিধানবাংলাদেশে ধারা ৪-এর প্রতিনিধিত্বনা — এটি সৎ সম্পর্কে প্রযোজ্য নয়

তিনটি পথের কোনোটিতেই সৎ মা বা সৎ বাবা পড়েন না — তাই তাঁরা সৎ সন্তানের সম্পত্তির ওয়ারিশ নন।

লালন-পালন ওয়ারিশ বানায় না। সৎ মা সারাজীবন সন্তানকে বড় করলেও ফারায়েজে তিনি সেই সন্তানের ওয়ারিশ হন না — ঠিক যেমন দত্তক নেওয়াও ওয়ারিশ তৈরি করে না। এটি ভালোবাসা বা কৃতজ্ঞতার অস্বীকার নয়, শুধু উত্তরাধিকারের নিয়ম।

যেখানে বিভ্রান্তি হয় — সৎ মা স্ত্রী হিসেবে ওয়ারিশ

এখানেই ছবিটা পরিষ্কার হওয়া দরকার। একজন পুরুষ মারা গেলে তাঁর বর্তমান স্ত্রী ওয়ারিশ হন — স্ত্রী হিসেবে, সৎ মা হিসেবে নয়। সেই স্ত্রী যদি প্রথম বিয়ের সন্তানদের সৎ মা হন, তবু তাঁর অংশ আসে স্ত্রীর অধিকার থেকে।

ধরুন একজন পুরুষ মারা গেলেন, রেখে গেলেন স্ত্রী (যিনি প্রথম বিয়ের সন্তানদের সৎ মা), দুই ছেলে ও এক মেয়ে। ২৪ লাখ টাকার সম্পত্তিতে:

স্ত্রী ১/৮ পাচ্ছেন। এই অংশ তিনি পাচ্ছেন কারণ তিনি মৃতের স্ত্রী — সন্তানদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এখানে অপ্রাসঙ্গিক।

একাধিক স্ত্রী থাকলে

মৃত ব্যক্তির একাধিক স্ত্রী থাকলে স্ত্রীর জন্য নির্ধারিত ১/৮ (বা সন্তান না থাকলে ১/৪) তাঁরা সবাই মিলে ভাগ করেন — প্রত্যেকে আলাদা করে ১/৮ পান না:

দুই স্ত্রী মিলে ১/৮ পাচ্ছেন, জনপ্রতি ১/১৬। এই জায়গাটিতেও ভুল খুব সাধারণ — প্রত্যেক স্ত্রীকে ১/৮ দিয়ে দিলে মোট যোগফল ১ ছাড়িয়ে যায় এবং সন্তানদের অংশ কমে যায়।

উল্টো দিক — সৎ সন্তান কি সৎ মায়ের ওয়ারিশ

একইভাবে না। সৎ মা মারা গেলে তাঁর সম্পত্তিতে সৎ সন্তানরা ওয়ারিশ নন। তাঁর ওয়ারিশ হন তাঁর নিজের সন্তান, স্বামী, মা-বাবা ও ভাই-বোনেরা।

এর একটি ব্যবহারিক ফল আছে। সৎ মা তাঁর স্বামীর সম্পত্তি থেকে যে অংশ পান, তাঁর মৃত্যুর পর সেটি যায় তাঁর নিজের ওয়ারিশদের কাছে — সৎ সন্তানদের কাছে নয়। তাই পরিবারে কোন সম্পত্তি কোন পথে যাচ্ছে, তা আগেই বুঝে রাখা ভালো।

তবে সৎ ভাই-বোনেরা ওয়ারিশ

এটি সবচেয়ে বেশি অবাক করে। সৎ মা-বাবা ওয়ারিশ না হলেও সৎ ভাই-বোনেরা ওয়ারিশ হন — কারণ তাঁদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক আছে।

সম্পর্ককীভাবেওয়ারিশ?
বৈমাত্রেয় ভাই-বোনএকই পিতা, ভিন্ন মাতাহ্যাঁ
বৈপিত্রেয় ভাই-বোনএকই মাতা, ভিন্ন পিতাহ্যাঁ
সৎ মাপিতার অন্য স্ত্রীনা
সৎ বাবামাতার অন্য স্বামীনা
সৎ ভাই-বোন যাঁদের সঙ্গে কোনো পিতা-মাতাই এক নয়সৎ মায়ের আগের বিয়ের সন্তাননা

নির্ধারক প্রশ্ন — পিতা বা মাতা, অন্তত একজন এক কি না।

শেষ সারিটি খেয়াল করুন। সৎ মায়ের আগের বিয়ের সন্তানদের সঙ্গে আপনার কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই — না পিতা এক, না মাতা। তাঁরা আপনার ওয়ারিশ নন, আপনিও তাঁদের নন। অথচ একই বাড়িতে বড় হওয়ার কারণে এই সম্পর্কটিকেই অনেকে সৎ ভাই-বোন ভেবে ভাগ দিয়ে ফেলেন।

যা করা যায়

সৎ মা-বাবা বা সৎ সন্তানকে কিছু দিতে চাইলে ফারায়েজের বাইরে বৈধ পথ আছে। আর তাঁরা ওয়ারিশ না হওয়ায় এখানে একটি সুবিধাও আছে:

  • জীবিত অবস্থায় হেবা — পরিমাণে সীমা নেই।
  • ওসিয়ত — সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত। এবং যেহেতু তাঁরা ওয়ারিশ নন, তাঁদের জন্য করা ওসিয়তে অন্য ওয়ারিশদের সম্মতি লাগে না — এটি ওয়ারিশের জন্য করা ওসিয়তের চেয়ে অনেক নির্ভরযোগ্য।
  • বণ্টনের পর ওয়ারিশরা স্বেচ্ছায় দান করা — সম্পূর্ণ বৈধ।
অর্থাৎ সৎ মা বা সৎ সন্তানের জন্য ওসিয়ত একটি কার্যকর পথ, কারণ তাঁরা ওয়ারিশ নন। উল্টো দিকে নিজের সন্তানের জন্য ওসিয়ত অন্যদের সম্মতি ছাড়া কার্যকর হয় না — নিয়মটি এখানে ঠিক বিপরীত দিকে কাজ করে।

যেখানে সবচেয়ে বেশি ভুল হয়

  • ভুল ১ — সৎ মাকে সৎ সন্তানের সম্পত্তির ওয়ারিশ ধরা। তিনি নন।
  • ভুল ২ — সৎ মা স্ত্রী হিসেবে পাচ্ছেন বলে ভাবা তিনি সৎ মা হিসেবে পাচ্ছেন। অংশটি আসে স্ত্রীর অধিকার থেকে।
  • ভুল ৩ — প্রত্যেক স্ত্রীকে আলাদা করে ১/৮ দেওয়া। একাধিক স্ত্রী মিলে ১/৮ ভাগ করেন।
  • ভুল ৪ — সৎ ভাই-বোনদের ওয়ারিশ তালিকা থেকে বাদ দেওয়া। পিতা বা মাতা এক হলে তাঁরা ওয়ারিশ।
  • ভুল ৫ — সৎ মায়ের আগের বিয়ের সন্তানদের সৎ ভাই-বোন ধরে ভাগ দেওয়া। তাঁদের সঙ্গে কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই।
  • ভুল ৬ — লালন-পালনের কৃতজ্ঞতা থেকে সৎ মাকে ওয়ারিশ বানিয়ে ভাগ দেওয়া। দিতে চাইলে হেবা বা ওসিয়তের পথ ব্যবহার করুন — সেটি বৈধ ও পরিষ্কার।

ওয়ারিশ কারা — যাচাই করে নিন

পরিবারের সদস্যদের তালিকা দিন — কারা ওয়ারিশ আর কারা নন, পরিষ্কারভাবে দেখতে পাবেন।

ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

না। ফারায়েজে ওয়ারিশ হন রক্তের সম্পর্ক বা বিয়ের সম্পর্কের মাধ্যমে — সৎ মায়ের সৎ সন্তানের সঙ্গে দুটির কোনোটিই নেই। লালন-পালন ওয়ারিশ তৈরি করে না।
তিনি পাচ্ছেন তাঁর নিজের স্বামীর সম্পত্তি থেকে — স্ত্রী হিসেবে, সৎ মা হিসেবে নয়। সন্তান থাকলে স্ত্রীর অংশ ১/৮, সন্তান না থাকলে ১/৪।
না। স্ত্রীর জন্য নির্ধারিত ১/৮ (বা সন্তান না থাকলে ১/৪) সব স্ত্রী মিলে ভাগ করেন। দুই স্ত্রী থাকলে জনপ্রতি ১/১৬।
হ্যাঁ। বৈমাত্রেয় (একই পিতা, ভিন্ন মাতা) ও বৈপিত্রেয় (একই মাতা, ভিন্ন পিতা) ভাই-বোনেরা ওয়ারিশ, কারণ তাঁদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক আছে। তবে যাঁদের সঙ্গে পিতা বা মাতা কেউই এক নয়, তাঁরা ওয়ারিশ নন।
জীবিত অবস্থায় হেবা করতে পারেন (সীমা নেই), অথবা ওসিয়ত করতে পারেন সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত। যেহেতু তিনি ওয়ারিশ নন, তাঁর জন্য করা ওসিয়তে অন্য ওয়ারিশদের সম্মতি লাগে না — তাই এটি নির্ভরযোগ্য পথ।
না। তাঁর ওয়ারিশ হন তাঁর নিজের সন্তান, স্বামী, মা-বাবা ও ভাই-বোনেরা। স্বামীর সম্পত্তি থেকে তিনি যে অংশ পেয়েছিলেন, তা-ও তাঁর নিজের ওয়ারিশদের কাছে যায়।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। প্রতিটি পরিবারের অবস্থা আলাদা এবং ছোট একটি তথ্য পুরো হিসাব বদলে দিতে পারে। দলিল, নামজারি বা বণ্টননামার আগে স্থানীয় আলেম ও আইনজীবীর সঙ্গে মিলিয়ে নিন।