“এটা তো পৈতৃক সম্পত্তি, এতে আমার জন্মগত অধিকার আছে” — কথাটি বাংলাদেশে প্রায়ই শোনা যায়। আবার উল্টো দিকে শোনা যায় “এটা আমার নিজের অর্জিত, এতে ছেলেমেয়ের কিছু নেই”। মুসলিম উত্তরাধিকারে এই দুটি ভাগই নেই — আর এই ভুল ধারণা কোথা থেকে এসেছে, সেটিও জানা দরকার।
মুসলিম আইনে পার্থক্যটি নেই
পিতা, মাতা, এক ছেলে ও এক মেয়ে — এই পরিবারের হিসাব একই থাকবে, সম্পত্তিটি কোথা থেকে এসেছে তা নির্বিশেষে:
ভুল ধারণাটি কোথা থেকে এসেছে
পৈতৃক ও অর্জিত সম্পত্তির এই ভাগটি আসে হিন্দু আইনের ধারণা থেকে, যেখানে যৌথ পরিবারের সম্পত্তি ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির মধ্যে আইনি পার্থক্য আছে এবং পৈতৃক সম্পত্তিতে জন্মসূত্রে অধিকার তৈরি হওয়ার ধারণা রয়েছে। একই অঞ্চলে পাশাপাশি বাস করার কারণে ধারণাটি মুসলিম পরিবারেও ঢুকে গেছে — কিন্তু মুসলিম আইনে এর কোনো ভিত্তি নেই।
| মুসলিম আইন | হিন্দু আইনের ধারণা | |
|---|---|---|
| পৈতৃক ও অর্জিতের ভাগ | নেই | আছে |
| জন্মসূত্রে অধিকার | নেই — অধিকার তৈরি হয় মৃত্যুতে | পৈতৃক সম্পত্তিতে আছে |
| পিতার জীবদ্দশায় সন্তানের দাবি | নেই | নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে থাকতে পারে |
| পিতার সম্পত্তি বিক্রির স্বাধীনতা | সম্পূর্ণ | সীমিত হতে পারে |
এই লেখাটি মুসলিম উত্তরাধিকার নিয়ে; হিন্দু আইনের বিধান আলাদা বিষয়।
সবচেয়ে জরুরি ফল — জীবদ্দশায় সন্তানের দাবি নেই
এই কথাটির দুই দিক আছে, আর দুটোই জানা দরকার:
- একদিকে — সন্তানরা পিতার জীবদ্দশায় ভাগ দাবি করতে পারেন না, জমি বিক্রিতে বাধা দিতে পারেন না।
- অন্যদিকে — পিতা চাইলে জীবিত অবস্থায় হেবা করে সম্পত্তি বিলি করে দিতে পারেন, এবং মৃত্যুর পর ভাগ করার মতো কিছু না-ও থাকতে পারে। এটিই হেবার মাধ্যমে মেয়েদের বঞ্চিত করার পথ তৈরি করে।
দাদার সম্পত্তি সম্পর্কে যা বোঝা দরকার
প্রশ্নটি প্রায়ই আসে — “দাদার সম্পত্তিতে আমার অধিকার আছে কি?” মুসলিম আইনে উত্তরটি ধাপে ধাপে ভাবতে হয়:
- দাদা জীবিত থাকতে — নাতি-নাতনির কোনো অধিকার নেই।
- দাদা মারা গেলে, পিতা জীবিত থাকলে — সম্পত্তি পিতা পান। তখন সেটি পিতার নিজের সম্পত্তি হয়ে যায়, এবং পিতা তা নিয়ে যা খুশি করতে পারেন। নাতি-নাতনিদের সেখানে দাবি নেই।
- দাদার আগেই পিতা মারা গেলে — এখানে বাংলাদেশের আইনে বিশেষ বিধান আছে (নিচে দেখুন)।
বাংলাদেশের আইনে বিশেষ বিধান
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ধারা ৪-এর মূল পাঠ অনুযায়ী — উত্তরাধিকার খোলার আগে মৃত ব্যক্তির কোনো ছেলে বা মেয়ে মারা গিয়ে থাকলে তাঁর জীবিত সন্তানরা per stirpes (শাখা অনুযায়ী) সেই অংশটি পাবেন, যা তাঁদের পিতা বা মাতা জীবিত থাকলে পেতেন।
যৌথভাবে গড়া সম্পত্তি
একটি বাস্তব প্রশ্ন — ছেলে বাবার সঙ্গে মিলে জমি কিনেছেন বা ব্যবসা বড় করেছেন। সেই সম্পত্তি কার? মুসলিম আইনে উত্তরটি নির্ভর করে মালিকানা কার নামে ও কার টাকায় — “যৌথ পরিবারের সম্পত্তি” বলে আলাদা কোনো আইনি শ্রেণি নেই।
যেখানে সবচেয়ে বেশি ভুল হয়
- ভুল ১ — পৈতৃক সম্পত্তিতে জন্মগত অধিকার দাবি করা। মুসলিম আইনে এমন অধিকার নেই — অধিকার তৈরি হয় মৃত্যুতে।
- ভুল ২ — “অর্জিত সম্পত্তিতে সন্তানের কিছু নেই” ভাবা। মৃত্যুর পর অর্জিত সম্পত্তিও একইভাবে ভাগ হয়।
- ভুল ৩ — পৈতৃক সম্পত্তিতে মেয়েদের অংশ কম বা শূন্য ধরা। সম্পত্তির উৎস দিয়ে ভগ্নাংশ বদলায় না।
- ভুল ৪ — দাদার সম্পত্তিতে নাতির সরাসরি জন্মগত দাবি ভাবা। পিতা জীবিত থাকলে সেটি পিতার সম্পত্তি।
- ভুল ৫ — পিতার জীবদ্দশায় জমি বিক্রিতে বাধা দেওয়া। মালিক হিসেবে তিনি স্বাধীন।
- ভুল ৬ — যৌথভাবে গড়া সম্পত্তিতে নিজের অবদান কাগজে না রাখা। পরে প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব।
সম্পত্তির উৎস নির্বিশেষে হিসাব একই
মোট সম্পত্তির পরিমাণ দিন — পৈতৃক না অর্জিত, সেই প্রশ্ন হিসাবে আসবে না।
ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →