“দাদা মারা গেছেন, আমরা নাতি — আমরা কি কিছু পাব?” প্রশ্নটি শুনতে সহজ, কিন্তু উত্তর তিনটি ভিন্ন দিকে যেতে পারে। কারণ বাংলায় আমরা “নাতি” বলতে একসঙ্গে দুই রকম সম্পর্ক বোঝাই — ছেলের ছেলে এবং মেয়ের ছেলে — অথচ ফারায়েজে এই দুজনের অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা। আবার নাতির বাবা কখন মারা গেছেন, দাদার আগে না পরে, সেটিও ফল পাল্টে দেয়।
এই লেখায় হানাফি মাযহাব ও বাংলাদেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তিনটি অবস্থাই আলাদা করে, হিসাবসহ দেখানো হলো।
অবস্থা ১: মৃত ব্যক্তির কোনো ছেলে জীবিত আছেন
ফারায়েজের একটি মূল নীতি হলো — কাছের ওয়ারিশ থাকলে দূরের ওয়ারিশ বাদ পড়েন। একে বলা হয় হাজব। পুত্র ও পৌত্রের সম্পর্ক ঠিক এমনই।
মৃত ব্যক্তির একজন ছেলে বেঁচে থাকলে সেই ছেলের নিজের ছেলেরা, এমনকি অন্য ছেলের ঘরের নাতিরাও, ফারায়েজের সাধারণ নিয়মে কিছুই পান না। বাবা জীবিত থাকতে ছেলে দাদার সম্পত্তির ওয়ারিশ হন না — কারণ প্রতিনিধিত্বের সাধারণ কোনো নিয়ম ফারায়েজে নেই।
এখানেই এসে বাংলাদেশের আইন একটি ব্যতিক্রম তৈরি করেছে, যা নিচে আলাদা করে বলা হয়েছে।
অবস্থা ২: কোনো ছেলে নেই — পৌত্র ছেলের স্থান নেন
মৃত ব্যক্তির কোনো ছেলে জীবিত না থাকলে পুত্রের ছেলে আসাবা হিসেবে দাঁড়িয়ে যান। অর্থাৎ নির্দিষ্ট অংশীদাররা (স্ত্রী, মেয়ে, বাবা, মা) তাঁদের ভাগ নেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে তা তিনি পান।
একটি উদাহরণ দেখা যাক। মৃত ব্যক্তি রেখে গেছেন স্ত্রী, এক মেয়ে এবং এক পৌত্র (আগে মারা যাওয়া ছেলের ছেলে)। বণ্টনযোগ্য সম্পত্তি ৮০ লাখ টাকা।
| ওয়ারিশ | ভিত্তি | অংশ | ৮০ লাখ টাকায় |
|---|---|---|---|
| স্ত্রী | নির্দিষ্ট ১/৮ | ১/৮ | ১০,০০,০০০ |
| মেয়ে | নির্দিষ্ট ১/২ | ৪/৮ | ৪০,০০,০০০ |
| পৌত্র (পুত্রের ছেলে) | আসাবা — অবশিষ্ট | ৩/৮ | ৩০,০০,০০০ |
| মোট | ৮/৮ | ৮০,০০,০০০ |
লক্ষ করুন, পৌত্র এখানে মৃত ব্যক্তির ভাই বা চাচার আগে অবস্থান করছেন — আসাবার ক্রমে পুত্রের পুত্র অনেক উপরে। এক মেয়ে থাকলে অবশিষ্ট অংশ কার কাছে যায় তার পূর্ণ ব্যাখ্যা আছে একমাত্র মেয়ে থাকলে সম্পত্তি কে কত পাবে লেখায়, আর আসাবার ক্রমে ভাই কোথায় পড়েন দেখুন ছেলে না থাকলে ভাই কি সম্পত্তি পাবে লেখায়।
পৌত্র ও পৌত্রী একসঙ্গে থাকলে
পুত্রের ছেলে ও পুত্রের মেয়ে একসঙ্গে ওয়ারিশ হলে তাঁদের মধ্যেও সন্তানদের মতোই ২ঃ১ অনুপাত খাটে। ধরা যাক মৃত ব্যক্তির কোনো ছেলে-মেয়ে জীবিত নেই, আছেন স্ত্রী, এক পৌত্র ও এক পৌত্রী। সম্পত্তি ৪৮ লাখ টাকা।
| ওয়ারিশ | ভিত্তি | অংশ | ৪৮ লাখ টাকায় |
|---|---|---|---|
| স্ত্রী | নির্দিষ্ট ১/৮ | ১/৮ | ৬,০০,০০০ |
| পৌত্র | আসাবা, ২ ভাগ | অবশিষ্টের ২/৩ | ২৮,০০,০০০ |
| পৌত্রী | আসাবা, ১ ভাগ | অবশিষ্টের ১/৩ | ১৪,০০,০০০ |
| মোট | ৪৮,০০,০০০ |
এই ২ঃ১ অনুপাতের ভিত্তি ও যুক্তি নিয়ে বিস্তারিত আছে ছেলে ও মেয়ের অংশ ২ঃ১ কেন লেখায়।
পৌত্রী একা থাকলে
পুত্রের মেয়ে যদি কোনো পৌত্র ছাড়াই ওয়ারিশ হন, তখন তিনি আসাবা নন — নির্দিষ্ট অংশ পান, এবং পরিমাণটি নির্ভর করে মৃত ব্যক্তির নিজের মেয়ে আছেন কি না তার উপর:
| অবস্থা | পুত্রের মেয়ের অংশ |
|---|---|
| মৃত ব্যক্তির কোনো ছেলে-মেয়ে নেই, পুত্রের মেয়ে একজন | ১/২ |
| মৃত ব্যক্তির কোনো ছেলে-মেয়ে নেই, পুত্রের মেয়ে দুই বা তার বেশি | সবাই মিলে ২/৩ |
| মৃত ব্যক্তির একজন মেয়ে আছেন | ১/৬ (দুই-তৃতীয়াংশ পূর্ণ করতে) |
| মৃত ব্যক্তির দুই বা তার বেশি মেয়ে আছেন | সাধারণত কিছুই নয় |
শেষ সারির ক্ষেত্রেও একটি ব্যতিক্রম আছে — সমপর্যায়ের কোনো পৌত্র (পুত্রের ছেলে) জীবিত থাকলে তিনি পৌত্রীকে সঙ্গে নিয়ে আসাবা হয়ে যান, তখন দুজনেই ২ঃ১ অনুপাতে অবশিষ্ট অংশ পান।
আপনার নিজের পরিবারের হিসাব করুন
নাতি-নাতনিসহ সব ওয়ারিশ বসিয়ে সঠিক ভাগ দেখে নিন।
উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটরে হিসাব করুন →অবস্থা ৩: মেয়ের ছেলে — নিয়ম সম্পূর্ণ আলাদা
মেয়ের ছেলে বা মেয়ের মেয়ে ফারায়েজের নির্দিষ্ট অংশীদারও নন, আসাবাও নন। তাঁরা পড়েন যবিল আরহাম শ্রেণিতে — অর্থাৎ এমন আত্মীয়, যাঁরা কেবল তখনই পান যখন নির্দিষ্ট অংশীদার ও আসাবা শ্রেণির কেউই জীবিত নেই (স্বামী বা স্ত্রী থাকলেও তাঁদের অংশের পর)।
বাস্তবে এর মানে দাঁড়ায় — দাদার ছেলে, পৌত্র, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, চাচা বা চাচাতো ভাই কেউ জীবিত থাকলে মেয়ের ছেলে কিছুই পাবেন না। বিষয়টি অনেক পরিবারে কষ্টের কারণ হয়, কিন্তু এটিই সাধারণ নিয়ম।
বাংলাদেশের আইনে গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৪ ধারা অনুযায়ী, দাদা বা দাদির আগেই যে ছেলে বা মেয়ে মারা গেছেন, তাঁর সন্তানরা সেই মৃত পিতা বা মাতা জীবিত থাকলে যে অংশ পেতেন, সেই অংশ পাবেন। অর্থাৎ এতিম নাতি-নাতনিকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হতে হয় না।
দুটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি:
- এটি প্রযোজ্য কেবল সেই সন্তানের সন্তানদের জন্য, যিনি দাদার আগে মারা গেছেন। দাদার পরে মারা গেলে সম্পত্তি সাধারণ নিয়মেই সেই সন্তানের ওয়ারিশদের কাছে যাবে।
- প্রাপ্য অংশ তাঁদের মৃত বাবা বা মা যা পেতেন তার বেশি হবে না।
এই ধারার পূর্ণ ব্যাখ্যা, শর্ত ও উদাহরণ দেওয়া আছে দাদার সম্পত্তিতে এতিম নাতি-নাতনি কি অংশ পাবে লেখায়।
মতভেদ কোথায়
এই ৪ ধারাটি নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে, এবং দুই পক্ষের কথাই জানা দরকার।
- আইনগত অবস্থান: বাংলাদেশের আদালত ও ভূমি অফিসে ৪ ধারাটি কার্যকর। এটি প্রয়োগ করেই ওয়ারিশান সনদ ও নামজারি হয়।
- ফিকহি আপত্তি: অনেক আলেমের মতে ধ্রুপদী হানাফি ফিকহে জীবিত ছেলে থাকলে পৌত্র বঞ্চিত হন, তাই ৪ ধারাটি ফিকহের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। তাঁদের পরামর্শ — দাদা জীবিত থাকতেই এতিম নাতি-নাতনির জন্য ওসিয়ত করে যাওয়া, অথবা অন্য ওয়ারিশরা স্বেচ্ছায় তাঁদের অংশ দিয়ে দেওয়া।
ব্যবহারিক দিক থেকে সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো দাদার জীবদ্দশাতেই বিষয়টি স্পষ্ট করে রাখা — হেবা বা ওসিয়তের মাধ্যমে। হেবার শর্ত ও দখল হস্তান্তরের গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আছে জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি বণ্টন করা যায় কি লেখায়।
যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়
- “নাতি” বলতে সব নাতিকে এক করে ফেলা। পুত্রের ছেলে ও মেয়ের ছেলের অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা — হিসাব শুরুর আগেই এটি ঠিক করতে হবে।
- ছেলে জীবিত থাকা সত্ত্বেও নাতিকে ভাগ দেওয়া। সাধারণ নিয়মে এটি হয় না; কেবল ৪ ধারার অবস্থায় ব্যতিক্রম।
- ৪ ধারাকে সব নাতির জন্য প্রযোজ্য ভাবা। এটি কেবল দাদার আগে মারা যাওয়া সন্তানের সন্তানদের জন্য।
- দাদার পরে বাবা মারা গেলেও ৪ ধারা খোঁজা। সে ক্ষেত্রে বাবা দাদার ওয়ারিশ হয়ে গেছেন; এরপর বাবার সম্পত্তি তাঁর নিজের ওয়ারিশদের মধ্যে আলাদাভাবে ভাগ হবে।
- পৌত্রীর অংশ ভুলে যাওয়া। পুত্রের মেয়েরও নির্দিষ্ট অবস্থায় অংশ আছে — কেবল ছেলেদের হিসাব করলে বণ্টন ভুল হবে।
- মৌখিক বণ্টনে সন্তুষ্ট থাকা। ওয়ারিশান সনদ ও নামজারি না করালে পরবর্তীতে নাতিদের অংশ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
সম্পর্কিত লেখা
বি.দ্র. এই লেখাটি হানাফি মাযহাব ও বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের ভিত্তিতে সাধারণ তথ্য হিসেবে দেওয়া হয়েছে। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৪ ধারার প্রয়োগ ঘটনাভেদে ভিন্ন হতে পারে, তাই প্রকৃত বণ্টনের আগে একজন যোগ্য আলেম ও আইনজীবীর পরামর্শ নিন।