বাংলাদেশে বয়স্ক বাবা-মায়েরা প্রায়ই একটি প্রশ্ন করেন — “মরার পর ছেলেমেয়েরা ঝগড়া করবে, তাই এখনই ভাগ করে দিই, এটা কি জায়েজ?” আবার উল্টো দিক থেকেও প্রশ্ন আসে — “বাবা জীবিত অবস্থায় এক ছেলেকে সব জমি লিখে দিয়েছেন, আমরা কি কিছু পাব না?”

দুটি প্রশ্নেরই উত্তর একই জায়গা থেকে আসে: ফারায়েজ আর হেবা দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। এই লেখায় হানাফি মাযহাব অনুযায়ী জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি বণ্টনের নিয়ম, শর্ত, সীমা ও বাস্তব উদাহরণ ধাপে ধাপে দেখানো হলো।

ফারায়েজ কখন শুরু হয়

ফারায়েজের প্রথম শর্তই হলো মৃত্যু। একজন মানুষ বেঁচে থাকতে তাঁর সম্পত্তি সম্পূর্ণভাবে তাঁর নিজের — ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী বা ভাই কারও সেখানে কোনো আইনগত দাবি নেই। কেউ “আমার ভাগ এখনই দিন” বলতে পারেন না, কারণ জীবিত ব্যক্তির কোনো ওয়ারিশ হয় না।

মৃত্যুর পর সম্পত্তি থেকে ধাপে ধাপে চারটি জিনিস বাদ যায় — দাফন-কাফনের খরচ, ঋণ, তারপর ওসিয়ত (সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত), এবং সবশেষে যা থাকে তা ফারায়েজ অনুযায়ী ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ হয়। এই ধাপগুলোর বিস্তারিত আছে মৃত ব্যক্তির ঋণ থাকলে সম্পত্তি কীভাবে ভাগ হবে লেখায়।

তাই জীবিত অবস্থায় যা বৈধভাবে হস্তান্তর হয়ে গেছে, তা মৃত্যুর সময় আর তাঁর সম্পত্তি নয় — সেটি ফারায়েজের হিসাবেই আসে না। এই কারণেই পালক সন্তানকে সুরক্ষা দিতে হেবা সবচেয়ে কার্যকর পথ — দেখুন দত্তক বা পালক সন্তান কি সম্পত্তি পাবে

হেবা কী এবং কখন তা সম্পূর্ণ হয়

হেবা মানে বিনিময় ছাড়া স্বেচ্ছায় মালিকানা হস্তান্তর। হানাফি মাযহাবে হেবা সম্পূর্ণ হতে তিনটি শর্ত লাগে:

  1. ইজাব — দাতা স্পষ্টভাবে দান করার কথা বলবেন।
  2. কবুল — গ্রহীতা তা গ্রহণ করবেন।
  3. কবজা বা দখল হস্তান্তর — দাতা সম্পত্তির দখল ও নিয়ন্ত্রণ গ্রহীতাকে বুঝিয়ে দেবেন।

তৃতীয় শর্তটিই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত হয়। মুখে বলে দেওয়া বা কাগজে লিখে রেখে দেওয়া, অথচ জমির দখল, খাজনা ও ভোগদখল আগের মতোই নিজের হাতে রেখে দেওয়া — এতে হেবা সম্পূর্ণ হয় না। এমন অবস্থায় দাতার মৃত্যুর পর সম্পত্তিটি সাধারণত আবার ফারায়েজের আওতায় চলে আসে, এবং পরিবারে বড় বিরোধ তৈরি হয়।

বাংলাদেশে স্থাবর সম্পত্তির (জমি, বাড়ি) হেবা লিখিত ও রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের মাধ্যমে করাই নিরাপদ। দলিলের ধরন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ফি সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়, তাই স্থানীয় সাব-রেজিস্ট্রি অফিস বা একজন আইনজীবীর কাছ থেকে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া দরকার।

আপনার নিজের পরিবারের হিসাব করুন

হেবার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে কীভাবে ভাগ হবে দেখতে চান?

উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটরে হিসাব করুন →

হেবা ও ওসিয়তের পার্থক্য

অনেকে দুটিকে এক করে ফেলেন, অথচ নিয়ম সম্পূর্ণ আলাদা:

বিষয়হেবা (জীবিত অবস্থায় দান)ওসিয়ত (মৃত্যুর পর কার্যকর)
কখন কার্যকরদখল হস্তান্তরের সঙ্গে সঙ্গেইদাতার মৃত্যুর পর
পরিমাণের সীমাসীমা নেই — সম্পূর্ণ সম্পত্তিও দেওয়া যায়সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ (১/৩)
ওয়ারিশকে দেওয়া যায়?হ্যাঁ, যায়অন্য ওয়ারিশদের সম্মতি ছাড়া নয়
ফেরত নেওয়াদখল দেওয়ার পর সাধারণত ফেরত নেওয়া যায় নাজীবদ্দশায় যেকোনো সময় বাতিল করা যায়

ওসিয়তের সীমা ও শর্ত নিয়ে বিস্তারিত আছে ওসিয়ত কতটুকু করা যায় লেখায়।

মৃত্যুশয্যায় করা দান — এখানেই সীমা ফিরে আসে

এখানে একটি বড় ব্যতিক্রম আছে। কেউ যদি মৃত্যুশয্যায় (ফিকহের পরিভাষায় মারযুল মউত — এমন রোগ যাতে মৃত্যুর প্রবল আশঙ্কা থাকে এবং যাতে শেষ পর্যন্ত মৃত্যু ঘটে) অবস্থায় দান করেন, তবে সেই দান আর সাধারণ হেবা হিসেবে গণ্য হয় না — তা ওসিয়তের নিয়মে পড়ে। ফলে:

  • ওয়ারিশ নন এমন কাউকে দিলে সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কার্যকর হবে;
  • কোনো ওয়ারিশকে দিলে অন্য ওয়ারিশদের সম্মতি ছাড়া তা কার্যকর হবে না।

এই নিয়মের উদ্দেশ্য স্পষ্ট — শেষ মুহূর্তে সম্পত্তি সরিয়ে ফেলে ওয়ারিশদের বঞ্চিত করার পথ বন্ধ করা। তাই “ভাগাভাগি ঠিক করে দেওয়ার” পরিকল্পনা থাকলে সুস্থ অবস্থাতেই তা সম্পন্ন করা উচিত।

উদাহরণ: হেবার পর ফারায়েজ কীভাবে চলে

রহিম সাহেবের মোট সম্পত্তি ১ কোটি ২০ লাখ টাকার। সুস্থ অবস্থায় তিনি ৬০ লাখ টাকার জমি দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে সমান ভাগে (প্রত্যেকে ২০ লাখ) হেবা করে দলিল রেজিস্ট্রি করে দখলও বুঝিয়ে দিলেন। এর কয়েক বছর পর তিনি মারা যান। তখন তাঁর হাতে ছিল বাকি ৬০ লাখ টাকার সম্পত্তি। ওয়ারিশ: স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে। ঋণ ও ওসিয়ত নেই।

হেবাকৃত ৬০ লাখ আর তাঁর সম্পত্তি নয়, তাই ফারায়েজের হিসাবে আসবে না। বাকি ৬০ লাখ ভাগ হবে এভাবে — স্ত্রী সন্তান থাকায় ১/৮, অবশিষ্ট অংশ ছেলে-মেয়ের মধ্যে ২:২:১ অনুপাতে:

ওয়ারিশভিত্তিঅংশটাকায়
স্ত্রীনির্দিষ্ট ১/৮১/৮৭,৫০,০০০
ছেলে (১ম)আসাবা, ২ ভাগ২/৫ × ৭/৮২১,০০,০০০
ছেলে (২য়)আসাবা, ২ ভাগ২/৫ × ৭/৮২১,০০,০০০
মেয়েআসাবা, ১ ভাগ১/৫ × ৭/৮১০,৫০,০০০
মোট৬০,০০,০০০

হেবা ও উত্তরাধিকার মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক ছেলে পেলেন ৪১ লাখ, মেয়ে পেলেন ৩০ লাখ ৫০ হাজার, স্ত্রী পেলেন ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। লক্ষণীয় — জীবিত অবস্থায় সমান ভাগে দেওয়ায় মেয়ের মোট প্রাপ্তি বেড়ে গেছে। ছেলে-মেয়ের ফারায়েজি অনুপাত নিয়ে বিস্তারিত আছে মেয়ে বাবার সম্পত্তিতে কতটুকু পাবে লেখায়, আর ছেলে না থাকলে কী হয় তা দেখুন এক মেয়ে থাকলে বাবার সম্পত্তি কে কত পাবে লেখায়।

সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ — মতভেদ কোথায়

হাদিসে নুমান ইবনে বাশীর (রা.)-এর ঘটনাটি এখানে মূল ভিত্তি। তাঁর বাবা তাঁকে একটি বিশেষ দান করে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে সাক্ষী রাখতে চাইলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, অন্য সন্তানদেরও কি একই রকম দিয়েছেন? “না” শুনে তিনি সাক্ষী হতে অস্বীকার করেন এবং সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ করতে বলেন।

এখান থেকে দুটি মত এসেছে:

  • প্রথম মত (অধিকাংশ হানাফি ফকীহ): জীবিত অবস্থায় দানে ছেলে-মেয়েকে সমান দেওয়াই উত্তম, কারণ এটি উত্তরাধিকার নয়, দান — আর দানে সন্তানদের মধ্যে সমতা রাখাই হাদিসের নির্দেশ।
  • দ্বিতীয় মত: দানেও ফারায়েজের মতো ছেলেকে মেয়ের দ্বিগুণ দেওয়া উচিত, কারণ আল্লাহ নিজেই এই অনুপাত নির্ধারণ করেছেন।

দুই মতেই যে বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই তা হলো — কোনো সন্তানকে বঞ্চিত করার নিয়তে দান করা হারামের কাছাকাছি অপছন্দনীয়, এবং বিশেষভাবে মেয়েদের বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে সম্পত্তি ছেলেদের নামে লিখে দেওয়া গুনাহের কাজ।

আপনার নিজের পরিবারের হিসাব করুন

ওয়ারিশদের নাম বসিয়ে সঠিক অনুপাত দেখে নিন — হিসাব সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।

এখনই হিসাব করুন →

যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়

  1. দখল না দিয়ে শুধু কাগজ করা। দলিল হলো অথচ জমির দখল, ভোগ ও খাজনা আগের মতোই দাতার হাতে — হেবা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
  2. মৃত্যুশয্যার দানকে সাধারণ হেবা ভাবা। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় করা দান ওসিয়তের সীমায় পড়ে।
  3. এক ছেলেকে সব লিখে দিয়ে ভাবা যে বিষয়টি মিটে গেল। আইনত টিকে গেলেও শরীয়তে এটি জুলুম হিসেবে গণ্য হয়।
  4. স্ত্রীর অংশ ভুলে যাওয়া। জীবিত অবস্থায় সব সম্পত্তি সন্তানদের দিয়ে দিলে স্ত্রী মৃত্যুর পর কার্যত কিছুই পান না — স্ত্রীর প্রাপ্য অংশ মাথায় রেখে পরিকল্পনা করা দরকার।
  5. “বাবার সম্পত্তি এখনই ভাগ চাই” দাবি করা। জীবিত ব্যক্তির সম্পত্তিতে সন্তানের কোনো দাবি নেই; দেওয়া না দেওয়া সম্পূর্ণ তাঁর ইচ্ছা।
  6. ঋণ থাকা অবস্থায় সব সম্পত্তি দান করে দেওয়া। পাওনাদারের হক আগে; ঋণ ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা দান শরীয়তে ও আইনে চ্যালেঞ্জযোগ্য।
  7. মৌখিক হেবার ওপর ভরসা করা। সাক্ষী ও দলিল না থাকলে মৃত্যুর পর তা প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

সুস্থ অবস্থায় নিজের সম্পত্তির পুরোটাই দান করা আইনত ও শরীয়তগতভাবে সম্ভব। তবে নিজের ও পরিবারের ভরণপোষণের কথা না ভেবে সব দিয়ে দেওয়া অনুৎসাহিত করা হয়েছে।
হেবা যদি তিনটি শর্ত পূরণ করে সম্পূর্ণ হয়ে থাকে, তবে সেটি আর মৃতের সম্পত্তি নয় এবং ফারায়েজের হিসাবে আসে না। দখল হস্তান্তর না হয়ে থাকলে বিষয়টি ভিন্ন।
দলিলটি সুস্থ অবস্থায় হয়েছে না মৃত্যুশয্যায়, দখল সত্যিই হস্তান্তর হয়েছে কি না, এবং দলিলে কোনো প্রতারণা ছিল কি না — এসব প্রশ্নের উপর ফলাফল নির্ভর করে। কাগজপত্রসহ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া দরকার।
না। দেনমোহর স্ত্রীর প্রাপ্য ঋণ। তার বদলে জমি দেওয়া হলে সেটি বিনিময়মূলক হস্তান্তর, বিনা বিনিময়ে দান নয়।
যাবে। মৃত্যুর সময় যে সম্পত্তি তাঁর হাতে থাকবে, তার সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত ওসিয়ত কার্যকর হবে।
নাবালক সন্তানের ক্ষেত্রে বাবা বা আইনগত অভিভাবকের হেফাজতেই দখল গণ্য হয়, তাই আলাদা করে দখল হস্তান্তরের প্রয়োজন হয় না — তবে দলিলে বিষয়টি স্পষ্ট থাকা উচিত।
নিকট আত্মীয়কে করা সম্পূর্ণ হেবা সাধারণত ফেরত নেওয়া যায় না। এ বিষয়ে বিস্তারিত অবস্থাভেদে ভিন্ন হয়, তাই আলেম ও আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া ভালো।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখাটি হানাফি মাযহাব ও বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম আইনের ভিত্তিতে সাধারণ তথ্য হিসেবে দেওয়া হয়েছে। হেবা দলিল, রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া ও ফি সংক্রান্ত সর্বশেষ নিয়ম স্থানীয় সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে যাচাই করে নিন এবং প্রয়োজনে একজন যোগ্য আলেম ও আইনজীবীর পরামর্শ নিন।