বিষয়টি সংবেদনশীল, আর এর কেন্দ্রে থাকে এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের জন্মের পরিস্থিতির জন্য কোনোভাবেই দায়ী নন। কুরআন স্পষ্ট বলেছে, কেউ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না (সূরা আনআম ৬:১৬৪)। তাই এই লেখার উদ্দেশ্য কাউকে ছোট করা নয় — উত্তরাধিকারের হিসাব কোন সম্পর্কের উপর দাঁড়ায়, তা পরিষ্কার করা।

ফারায়েজে উত্তরাধিকারের ভিত্তি বংশ-পরিচয়

রক্তের সম্পর্কে ওয়ারিশ হতে হলে শরিয়াহর দৃষ্টিতে বংশ-পরিচয় (নসব) সাব্যস্ত হতে হয়। মায়ের সঙ্গে সন্তানের নসব সাব্যস্ত হয় জন্মের মাধ্যমেই — বিয়ে থাকুক বা না থাকুক। কিন্তু বাবার সঙ্গে নসব সাব্যস্ত হয় বৈধ বিবাহের মাধ্যমে। এখান থেকেই দুই দিকের হিসাব আলাদা হয়ে যায়।

সম্পর্কপারস্পরিক উত্তরাধিকার
সন্তান ও মাআছে — সে মায়ের ওয়ারিশ, মা-ও তার ওয়ারিশ
সন্তান ও মায়ের দিকের আত্মীয়মায়ের সূত্র ধরে সম্পর্ক বিবেচিত হয়
সন্তান ও জন্মদাতা পুরুষনেই — কোনো দিক থেকেই
সন্তান ও জন্মদাতার আত্মীয় (তাঁর বাবা-মা, অন্য সন্তান)নেই
সন্তান ও তার নিজের স্ত্রী/স্বামী, সন্তানআছে — সাধারণ নিয়মে

শেষ সারিটি মনে রাখুন: নিজের বৈধ বিয়ে ও নিজের সন্তানদের ক্ষেত্রে তিনি অন্য যেকোনো মানুষের মতোই পূর্ণ ওয়ারিশ ও মুওয়াররিস।

হাদিস ও হানাফি ফতোয়া কী বলে

  • জামে তিরমিজি ২১১৩ — অধ্যায়ের শিরোনামই হলো ব্যভিচার থেকে জন্ম নেওয়া সন্তানের উত্তরাধিকার না থাকা। হাদিসে বলা হয়েছে, এমন সন্তান (জন্মদাতার) ওয়ারিশ হয় না, আর তার থেকেও (জন্মদাতা) ওয়ারিশ হন না।
  • সহিহ বুখারি ৬৭৪৯ — সন্তান বিছানার (অর্থাৎ বৈধ দাম্পত্যের) মালিকের; আর ব্যভিচারীর জন্য কিছু নেই।
  • সহিহ বুখারি ৬৭৪৮ — লিয়ানের ঘটনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) সন্তানকে মায়ের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। লিয়ানের মাধ্যমে বাবার সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকৃত সন্তানের উত্তরাধিকারও তাই মায়ের দিক থেকে।
  • হানাফি ফতোয়া — মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়ার মাসিক আলকাউসারের প্রশ্নোত্তরে বলা হয়েছে, এমন সন্তান জন্মদাতা পুরুষের ওয়ারিশ নয়, তিনিও তার ওয়ারিশ নন; নসব মায়ের থেকে সাব্যস্ত হয় এবং সে মায়ের ওয়ারিশ। সেখানে আলবাহরুর রায়েকসহ হানাফি কিতাবের উদ্ধৃতি আছে।

জন্মদাতার স্বীকৃতি বা পরে বিয়ে হলে

অনেক ক্ষেত্রে জন্মদাতা পুরুষ পরে সন্তানকে নিজের বলে মেনে নেন, দায়িত্বও নেন; কখনো দুজন পরে বিয়েও করেন। এমন স্বীকৃতি বা পরবর্তী বিয়ে শরিয়াহর বংশ-পরিচয়ে কোনো প্রভাব ফেলে কি না, তা নির্ভর করে নির্দিষ্ট ঘটনার উপর — যেমন সন্তান বিয়ের কত দিন পর জন্মেছে, আর স্বীকৃতি কোন অবস্থায় দেওয়া হয়েছে। এই লেখায় এ বিষয়ে কোনো সাধারণ বিধান দেওয়া হলো না; পুরো ঘটনা জানিয়ে একজন মুফতির কাছ থেকে ফয়সালা নিন।

সবচেয়ে জরুরি সতর্কতা: বৈধ বিয়ের সন্তান স্বামীরই

গুজবে কাউকে বঞ্চিত করা যায় না। বৈধ বিয়ের মধ্যে জন্ম নেওয়া সন্তান স্বামীর সন্তান হিসেবেই গণ্য — সহিহ বুখারির ৬৭৪৯ নম্বর হাদিসের মূল কথাই এটি। সম্পত্তির বিরোধে কখনো কখনো ভাই-বোনেরা বা আত্মীয়রা কোনো সন্তানের জন্ম নিয়ে সন্দেহ তুলে তাকে বাদ দিতে চান। শরিয়াহতে এর কোনো সুযোগ নেই। স্বামী জীবদ্দশায় শরিয়াহসম্মত প্রক্রিয়ায় (লিয়ান) সন্তান অস্বীকার না করলে সেই সন্তান তাঁর পূর্ণ ওয়ারিশ; অন্য কারও সন্দেহে তা বদলায় না।

জন্মদাতার দিক থেকে কিছু দেওয়ার বৈধ পথ

মিরাস না থাকলেও জন্মদাতা পুরুষ চাইলে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারেন:

  • ওসিয়ত — সন্তানটি তাঁর ওয়ারিশ নয় বলে তার জন্য মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে ওসিয়ত করা যায়। দেখুন ওসিয়ত কতটুকু করা যায়।
  • হেবা — জীবদ্দশায় দান করে দখল বুঝিয়ে দিলে তা সন্তানের মালিকানা হয়ে যায়। দেখুন হেবা ও উত্তরাধিকার।

দত্তক বা পালক সন্তানের ক্ষেত্রেও একই পথগুলো প্রাসঙ্গিক, যদিও সেটি ভিন্ন পরিস্থিতি — দেখুন দত্তক বা পালক সন্তান কি সম্পত্তি পাবে।

মায়ের সম্পত্তিতে সে কত পায়?

মায়ের সম্পত্তিতে সে মায়ের অন্য যেকোনো সন্তানের মতোই — ছেলে হলে ছেলের হারে, মেয়ে হলে মেয়ের হারে। মায়ের অন্য সংসারের সন্তান থাকলেও কোনো পার্থক্য হয় না। মায়ের সম্পত্তি ভাগের সাধারণ নিয়ম আছে মায়ের সম্পত্তি ছেলে মেয়ের মধ্যে কীভাবে ভাগ হবে লেখায়।

বাংলাদেশের আইন ও প্রক্রিয়া

জন্মনিবন্ধন, অভিভাবকত্ব, ভরণপোষণ বা বংশ-পরিচয় নিয়ে বাংলাদেশের আদালতের অবস্থান এই লেখায় আলোচনা করা হয়নি; আমরা সে বিষয়ে কোনো সরকারি উৎস যাচাই করিনি। নির্দিষ্ট কোনো মামলা বা কাগজপত্রের প্রশ্নে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়

  • ভুল ১ — সন্দেহ বা গুজবের ভিত্তিতে বৈধ বিয়ের কোনো সন্তানকে “অবৈধ” বলে মিরাস থেকে বাদ দেওয়া।
  • ভুল ২ — ধরে নেওয়া যে এমন সন্তান কারও ওয়ারিশ নয়। মায়ের দিক থেকে সে পূর্ণ ওয়ারিশ।
  • ভুল ৩ — জন্মদাতার খরচ বহন বা লালন-পালনকে উত্তরাধিকারের ভিত্তি ধরা। মিরাস আসে শরিয়াহসম্মত বংশ-পরিচয় থেকে।
  • ভুল ৪ — সন্তানকে তার নিজের স্ত্রী/স্বামী ও সন্তানদের ব্যাপারেও “ওয়ারিশহীন” ভাবা। নিজের পরিবারে সে সাধারণ নিয়মেই ওয়ারিশ ও মুওয়াররিস।
  • ভুল ৫ — অপমানজনক শব্দে সন্তানকে চিহ্নিত করা। বিধান বোঝাতে তার মর্যাদাহানির প্রয়োজন নেই।

মায়ের সম্পত্তির হিসাব করুন

মায়ের সব সন্তানকে সমানভাবে তালিকায় রেখে দেখুন কে কত পান।

উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটরে হিসাব করুন →

প্রাথমিক সূত্র

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

হ্যাঁ। মায়ের সঙ্গে তার বংশ-পরিচয় সাব্যস্ত, তাই সে মায়ের ওয়ারিশ — মায়ের অন্য সন্তানদের মতোই, ছেলে হলে ছেলের হারে, মেয়ে হলে মেয়ের হারে।
মিরাস হিসেবে নয়। হানাফি ফিকহ ও জামে তিরমিজির ২১১৩ নম্বর হাদিস অনুযায়ী তাদের মধ্যে পারস্পরিক উত্তরাধিকার নেই। তবে জন্মদাতা ওসিয়ত বা হেবার মাধ্যমে তাকে দিতে পারেন।
না। বৈধ বিয়ের মধ্যে জন্ম নেওয়া সন্তান স্বামীর সন্তান হিসেবেই গণ্য (সহিহ বুখারি ৬৭৪৯)। স্বামী শরিয়াহসম্মত প্রক্রিয়ায় অস্বীকার না করলে অন্য কারও সন্দেহে তার উত্তরাধিকার বাতিল হয় না।
লিয়ানের মাধ্যমে বাবার সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকৃত হলে সন্তান মায়ের সঙ্গে যুক্ত হয় (সহিহ বুখারি ৬৭৪৮), তাই তার উত্তরাধিকারও মায়ের দিক থেকে।
তার নিজের স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান, মা এবং মায়ের সূত্রে সম্পর্কিত আত্মীয়রা — ফারায়েজের সাধারণ নিয়মে। জন্মদাতা পুরুষ বা তাঁর আত্মীয়রা নন।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখার হিসাব হানাফি ফারায়েজ নীতির সাধারণ ব্যাখ্যা। বাস্তব বণ্টনের আগে ওয়ারিশের পূর্ণ তালিকা, ঋণ ও ওসিয়ত যাচাই করে নিন।