বাংলাদেশে এমন পরিবার কম নয়, যেখানে স্বামী-স্ত্রী বছরের পর বছর আলাদা। কেউ ঝগড়া করে বাবার বাড়ি চলে গেছেন, কারও স্বামী বিদেশে গিয়ে আর যোগাযোগ রাখেননি, কেউ আবার একই শহরে আলাদা সংসার পেতেছেন। তারপর একজন মারা গেলে প্রশ্ন ওঠে — অন্যজন কি এখনো স্ত্রী বা স্বামী? শ্বশুরবাড়ি প্রায়ই বলে, “ও তো কবেই চলে গেছে, ওর কোনো দাবি নেই।”
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী: বিয়ে ভাঙে নির্দিষ্ট পথে, দূরত্বে নয়
ইসলামে বিবাহ একটি চুক্তি, আর চুক্তি শেষ হয় নির্দিষ্ট উপায়ে — স্বামীর তালাক, স্বামী-স্ত্রীর সম্মতিতে খোলা, অথবা বিচারকের মাধ্যমে বিচ্ছেদ। দূরে থাকা, রাগ করে চলে যাওয়া, খরচ না দেওয়া বা কথা বন্ধ রাখা — এর কোনোটি নিজে থেকে বিয়ে শেষ করে না।
তাই মৃত্যুর দিন যদি বিয়ে বহাল থাকে, সূরা নিসার ১২ নম্বর আয়াত অনুযায়ী অন্যজন পূর্ণ ওয়ারিশ। আলাদা থাকার কারণে অংশ কমেও না।
| অবস্থা | বিয়ে বহাল? | পরস্পরের ওয়ারিশ? |
|---|---|---|
| বছরের পর বছর আলাদা, কোনো তালাক নেই | হ্যাঁ | হ্যাঁ |
| স্ত্রী রাগ করে বাবার বাড়িতে, স্বামী খরচ দেন না | হ্যাঁ | হ্যাঁ |
| স্বামী বিদেশে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন | হ্যাঁ | হ্যাঁ |
| প্রত্যাহারযোগ্য (রজঈ) তালাকের পর ইদ্দত চলছে | ইদ্দত পর্যন্ত বিয়ের কিছু বিধান বহাল | ইদ্দতের মধ্যে মৃত্যু হলে সাধারণত হ্যাঁ |
| তালাকের ইদ্দত শেষ, বা খোলা বা আদালতের বিচ্ছেদ সম্পন্ন | না | না |
শেষ দুই সারি তালাক-সংক্রান্ত; তালাকের পরে কখন ওয়ারিশ থাকে আর কখন থাকে না, তার বিস্তারিত আছে তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী কি সম্পত্তি পাবেন লেখায়।
“চার মাস আলাদা থাকলেই তালাক” — কথাটি কোথা থেকে এল
এই ধারণার উৎস সম্ভবত ইলা নামের একটি বিধান (সূরা বাকারা ২:২২৬–২২৭)। ইলা হলো স্বামী আল্লাহর নামে শপথ করে বলা যে তিনি চার মাস বা তার বেশি সময় স্ত্রীর কাছে যাবেন না। হানাফি মাযহাবে এমন শপথের পর চার মাসের মধ্যে ফিরে না এলে একটি বায়েন তালাক হয়ে যায়।
কিন্তু এর জন্য শপথ শর্ত। শপথ ছাড়া শুধু আলাদা থাকা — চার মাস, চার বছর বা চল্লিশ বছর — ইলা নয়, তালাকও নয়। কারও ক্ষেত্রে সত্যিই এমন শপথ হয়েছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থাকলে ঘটনার বিবরণ দিয়ে একজন মুফতির কাছ থেকে ফয়সালা নিন।
স্ত্রী “অবাধ্য” হয়ে চলে গেলে?
স্বামীর অনুমতি ছাড়া শরয়ি কারণ ছাড়াই স্ত্রী ঘর ছেড়ে গেলে জীবদ্দশায় তাঁর ভরণপোষণের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু সেটি ভরণপোষণের বিষয়; উত্তরাধিকার আসে বিবাহ বহাল থাকা থেকে। বিয়ে না ভাঙলে স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি স্ত্রী হিসেবেই অংশ পান। একইভাবে স্বামী স্ত্রীকে ছেড়ে গেলে বা খোঁজ না নিলেও স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি স্বামী হিসেবে ওয়ারিশ।
হিসাবটি কেমন দাঁড়ায়
ধরুন স্বামী বারো বছর আলাদা থেকে মারা গেলেন; তালাক হয়নি। রেখে গেলেন স্ত্রী ও এক ছেলে। স্ত্রী পাবেন ১/৮, ছেলে ৭/৮ — ঠিক যেমন একসঙ্গে থাকলে পেতেন।
আলাদা থাকার সময় স্বামী আরেকটি বিয়ে করে থাকলে দুই স্ত্রী মিলে ওই ১/৮ সমানভাবে ভাগ করবেন — কারও অংশ বেশি হবে না। দেখুন একাধিক স্ত্রী থাকলে সম্পত্তি ভাগ। আর অপরিশোধিত দেনমোহর থাকলে তা মিরাসের আগে ঋণ হিসেবে পরিশোধ হবে; দেখুন দেনমোহর পরিশোধ না হলে।
বাংলাদেশের আইন ও প্রক্রিয়ায়
- তালাকের আইনি প্রক্রিয়া — বাংলাদেশে তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য লিখিত নোটিশসহ একটি আইনি প্রক্রিয়া আছে। এই লেখায় সেই প্রক্রিয়ার ধারা বা সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি; তালাক আইনত সম্পন্ন হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্ন থাকলে কাগজপত্রসহ আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
- ওয়ারিশ সনদ — আলাদা থাকা স্ত্রী বা স্বামীর নাম ওয়ারিশ সনদ থেকে বাদ পড়লে সংশোধনের পথ দেখুন ওয়ারিশ সনদ বা নামজারিতে নাম বাদ পড়লে লেখায়।
- প্রমাণের প্রশ্ন — “তালাক হয়েছিল” — এমন দাবি উঠলে তা প্রমাণ করার দায় দাবিকারীর। প্রমাণ না থাকলে বিয়ে বহাল ধরে হিসাব করাই শরিয়াহর মূল অবস্থান।
যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়
- ভুল ১ — দীর্ঘদিন আলাদা থাকাকে তালাক ধরে স্ত্রী বা স্বামীকে ওয়ারিশ-তালিকা থেকে বাদ দেওয়া।
- ভুল ২ — “চার মাস আলাদা থাকলেই তালাক” বিশ্বাস করা। ইলার জন্য শপথ লাগে।
- ভুল ৩ — স্ত্রী “নিজে চলে গেছে” বলে তাঁর মিরাস বাতিল ধরা। ভরণপোষণ আর মিরাস আলাদা প্রশ্ন।
- ভুল ৪ — আলাদা থাকা স্ত্রীর অংশ কমিয়ে দ্বিতীয় স্ত্রীকে বেশি দেওয়া। একাধিক স্ত্রী থাকলে নির্ধারিত অংশ সমান ভাগে।
- ভুল ৫ — উল্টো ভুল: তালাকের ইদ্দত শেষ হওয়ার পরও সাবেক স্ত্রীকে ওয়ারিশ ধরা।
বিয়ে বহাল ধরে হিসাব করুন
আলাদা থাকা স্ত্রী বা স্বামীকে তালিকায় রেখে দেখুন সবার অংশ কত দাঁড়ায়।
উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটরে হিসাব করুন →প্রাথমিক সূত্র
- কুরআন ৪:১২ — স্বামী ও স্ত্রীর অংশ
- কুরআন ২:২২৬–২২৭ — ইলা
প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
সম্পর্কিত লেখা
বি.দ্র. এই লেখায় ফারায়েজের নীতি ও বাংলাদেশে প্রযোজ্য আইন/প্রক্রিয়া আলাদা করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নিজের ক্ষেত্রে প্রয়োগের আগে পরিস্থিতি যাচাই করুন।