স্বামী মারা যাওয়ার কয়েক বছর পর বিধবা নতুন করে বিয়ে করলেন — এরপরই শ্বশুরবাড়ি থেকে চাপ আসে: “তুমি তো এখন অন্যের ঘরে, আমাদের ছেলের জমি ছেড়ে দাও।” কেউ কেউ ওয়ারিশ সনদ থেকে তাঁর নামও বাদ দিতে চান। বিধবাও অনেক সময় ধরে নেন, আবার বিয়ে করলে হয়তো আগের অধিকার আর থাকে না।

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী: অধিকার ঠিক হয় মৃত্যুর দিনে

উত্তরাধিকার কোনো চলমান সম্পর্কের পুরস্কার নয় — এটি মৃত্যুর মুহূর্তের অবস্থানের ফল। স্বামী মারা যাওয়ার সময় যিনি তাঁর বৈধ স্ত্রী ছিলেন, সূরা নিসার ১২ নম্বর আয়াত তাঁকে অংশ দিয়েছে। সেই মুহূর্তেই অংশটি তাঁর মালিকানায় চলে আসে, সম্পত্তি ভাগ হোক বা না হোক।

তাই পরবর্তী কোনো ঘটনা — নতুন বিয়ে, শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে যাওয়া, বাবার বাড়িতে ফিরে যাওয়া — এই মালিকানা বাতিল করে না। হানাফি ফতোয়াতেও স্পষ্ট বলা হয়েছে, বিধবা পুনরায় বিয়ে করলেও মৃত স্বামীর মিরাস থেকে তাঁর অংশ পাবেন; পুনর্বিবাহ তাঁর প্রাপ্য অংশ বাতিল করবে না।

ঘটনাস্বামীর সম্পত্তিতে অংশ
ইদ্দত শেষে নতুন বিয়েবহাল — ১/৮ বা ১/৪, যা মৃত্যুর দিন প্রযোজ্য ছিল
সম্পত্তি ভাগের আগেই নতুন বিয়েবহাল — ভাগে দেরি হলেও অংশ বদলায় না
শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে বাবার বাড়ি চলে যাওয়াবহাল
সন্তানদের দাদার বাড়িতে রেখে যাওয়াবহাল — সন্তানের দায়িত্ব ও মিরাস আলাদা প্রশ্ন
পাওনা দেনমোহরএটিও পাওনা হিসেবে বহাল; ভাগের আগে তরিকা থেকে পরিশোধ হয়

দেনমোহর মিরাস নয়, ঋণ — তাই আগে পরিশোধ, তারপর বাকি সম্পত্তিতে স্ত্রীর অংশ। বিস্তারিত দেনমোহর পরিশোধ না হলে সম্পত্তি থেকে কীভাবে আদায় হয় লেখায়।

স্ত্রীর অংশ কীভাবে ১/৮ বা ১/৪ হয় এবং একাধিক স্ত্রী থাকলে কী হয়, তা আছে স্বামী মারা গেলে স্ত্রী কত সম্পত্তি পাবে লেখায় — এখানে সেই হিসাব পুনরাবৃত্তি করা হলো না।

ইদ্দতের প্রশ্নটি আলাদা

স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবার ইদ্দত চার মাস দশ দিন (সূরা বাকারা ২:২৩৪); গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত। ইদ্দতের মধ্যে নতুন বিয়ে করা শরিয়াহতে নিষিদ্ধ — সেটি বিয়ের বৈধতার প্রশ্ন। কিন্তু প্রথম স্বামীর মিরাস তাঁর মৃত্যুর মুহূর্তেই নির্ধারিত হয়ে গেছে, তাই পরের কাজের কারণে সেই অংশ ফিরিয়ে নেওয়ার বিধান নেই।

তালাক আর বিধবা হওয়া কিন্তু এক নয়। স্বামী জীবিত থাকতে তালাক হয়ে গেলে তারপর স্বামী মারা গেলে কখন স্ত্রী ওয়ারিশ থাকেন, কখন থাকেন না — সেই নিয়ম ভিন্ন; দেখুন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী কি সম্পত্তি পাবেন।

সন্তান মারা গেলে পুনর্বিবাহিতা মা কি ওয়ারিশ?

হ্যাঁ। মায়ের অধিকার আসে জন্মসূত্রে, বিয়ের অবস্থা থেকে নয়। প্রথম সংসারের কোনো সন্তান মারা গেলে মা আবার বিয়ে করে থাকলেও সেই সন্তানের সম্পত্তিতে মায়ের নির্ধারিত অংশ পান। মায়ের অংশ কখন ১/৬ আর কখন বেশি, তা দেখুন মা-বাবা জীবিত থাকলে সম্পত্তি কীভাবে ভাগ হয় লেখায়।

তবে তাঁর নতুন স্বামী প্রথম স্বামী বা সেই সন্তানের ওয়ারিশ নন — তাঁর সঙ্গে ওই পরিবারের রক্ত বা বিবাহের সরাসরি সম্পর্ক নেই।

বিধবার মৃত্যুর পর সেই সম্পত্তি কোথায় যায়

শ্বশুরবাড়ির আসল আশঙ্কা প্রায়ই এটাই: “আমাদের বংশের জমি অন্য সংসারে চলে যাবে।” ফারায়েজের হিসাবে সত্যিই তাই হতে পারে। প্রথম স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া অংশ বিধবার নিজের সম্পত্তি; তিনি মারা গেলে সেটি তাঁর ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ হবে — প্রথম সংসারের সন্তান, দ্বিতীয় সংসারের সন্তান এবং দ্বিতীয় স্বামী সবাই নিয়ম অনুযায়ী অংশ পাবেন।

দুই ধাপের হিসাব: আগে প্রথম স্বামীর তরিকা ভাগ হয়, তারপর বিধবার মৃত্যুতে তাঁর নিজের তরিকা আলাদা করে। দুটি এক করে ফেললে হিসাব ভুল হয়। ভাগের আগেই কোনো ওয়ারিশ মারা গেলে কীভাবে ধাপে ধাপে করতে হয়, তা আছে এক ওয়ারিশ ভাগ পাওয়ার আগেই মারা গেলে লেখায়।

বাংলাদেশের প্রক্রিয়ায়

  • ওয়ারিশ সনদ — ফারায়েজের দৃষ্টিতে ওয়ারিশ তালিকা হয় মৃত্যুর দিনের অবস্থান ধরে, তাই সনদেও বিধবার নাম থাকা উচিত। পুনর্বিবাহের কারণে বিধবার নাম বাদ দেওয়া হলে বা বাদ পড়লে সংশোধনের পথ দেখুন ওয়ারিশ সনদ বা নামজারিতে নাম বাদ পড়লে লেখায়।
  • আইনি ধারা — পুনর্বিবাহ ও বিধবার উত্তরাধিকার নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট আইনি ধারা আমরা সরকারি উৎসে যাচাই করিনি, তাই এখানে কোনো ধারা উল্লেখ করা হলো না। বিরোধ আদালতে গড়ালে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
  • চাপে সই — নতুন বিয়ের সময় “দাবি ছেড়ে দিলাম” ধরনের কাগজে তাড়াহুড়ো করে সই করবেন না। স্বেচ্ছায় অংশ ছাড়া আর চাপে ছাড়ানো এক জিনিস নয়।

যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়

  • ভুল ১ — ধরে নেওয়া যে পুনর্বিবাহে বিধবার অংশ বাতিল হয়ে যায়। অংশ নির্ধারিত হয় স্বামীর মৃত্যুর দিনে।
  • ভুল ২ — সম্পত্তি ভাগ হয়নি বলে বিধবার অংশ “এখনো ঝুলে আছে” ভাবা। মালিকানা মৃত্যুর মুহূর্তেই তৈরি হয়েছে।
  • ভুল ৩ — দেনমোহর আর মিরাস গুলিয়ে ফেলা, বা মিরাস দিলে দেনমোহর মাফ ধরে নেওয়া। দুটি আলাদা পাওনা।
  • ভুল ৪ — দ্বিতীয় স্বামীকে প্রথম স্বামীর ওয়ারিশ মনে করা। তিনি নন; তবে বিধবার নিজের মৃত্যুর পর তিনি তাঁর ওয়ারিশ।
  • ভুল ৫ — প্রথম সংসারের সন্তানদের মায়ের সম্পত্তি থেকে বাদ দেওয়া, কারণ তারা “দাদার বংশের”। মায়ের সব সন্তান মায়ের ওয়ারিশ।

স্বামীর মৃত্যুর দিনের তালিকা ধরে হিসাব করুন

স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবা — মৃত্যুর দিন যাঁরা জীবিত ছিলেন, তাঁদের বসিয়ে বিধবার অংশ দেখে নিন।

উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটরে হিসাব করুন →

প্রাথমিক সূত্র

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

হ্যাঁ। অংশ ঠিক হয় স্বামীর মৃত্যুর মুহূর্তে; পরে ইদ্দত শেষে বিয়ে করলে সেই অংশ বাতিল হয় না এবং ফেরতও দিতে হয় না।
না। ভাগ দেরিতে হলেও বিধবার অংশ মৃত্যুর দিনের ওয়ারিশ তালিকা অনুযায়ী ১/৮ বা ১/৪-ই থাকে।
প্রথম স্বামীর ওয়ারিশ হিসেবে নয়। তবে বিধবা নিজে মারা গেলে তাঁর নিজের সম্পত্তিতে — প্রথম স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া অংশসহ — দ্বিতীয় স্বামী তাঁর ওয়ারিশ হন।
হ্যাঁ। মায়ের অধিকার জন্মসূত্রে; পুনর্বিবাহের কারণে সন্তানের সম্পত্তিতে তাঁর নির্ধারিত অংশ বাতিল হয় না।
না। অপরিশোধিত দেনমোহর মৃত স্বামীর ঋণ; সম্পত্তি ভাগের আগে তা পরিশোধ করতে হয়, বিধবা কোথায় থাকেন বা আবার বিয়ে করেন কি না তাতে বদলায় না।
ইদ্দতের মধ্যে বিয়ে শরিয়াহতে নিষিদ্ধ এবং সেটি বিয়ের বৈধতার প্রশ্ন। কিন্তু প্রথম স্বামীর মিরাস মৃত্যুর মুহূর্তেই নির্ধারিত, তাই সেই অংশ ফিরিয়ে নেওয়ার বিধান নেই।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখায় ফারায়েজের নীতি ও বাংলাদেশে প্রযোজ্য আইন/প্রক্রিয়া আলাদা করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নিজের ক্ষেত্রে প্রয়োগের আগে পরিস্থিতি যাচাই করুন।