সম্পত্তি ভাগের হিসাব শুরু করার আগে সবচেয়ে জরুরি কাজটি হলো তালিকা তৈরি — কারা ওয়ারিশ, আর কারা নন। এই ধাপে ভুল হলে পরের সব হিসাব ভুল হবে, যত নিখুঁতভাবেই গুণ-ভাগ করা হোক না কেন। বাস্তবে বেশির ভাগ পারিবারিক বিরোধের শুরুও এখানেই।

ইসলামী উত্তরাধিকারে ওয়ারিশরা তিনটি শ্রেণীতে ভাগ হন, আর তাঁরা এই ক্রমেই ভাগ পান।

শ্রেণী ১ — জাবিল ফুরুজ (নির্দিষ্ট অংশের ওয়ারিশ)

এঁদের অংশ কোরআনে সরাসরি নির্দিষ্ট করা — অর্ধেক, এক-চতুর্থাংশ, এক-অষ্টমাংশ, দুই-তৃতীয়াংশ, এক-তৃতীয়াংশ বা এক-ষষ্ঠাংশ। বণ্টনে সবার আগে এঁরা নিজেদের ভাগ নেন।

ওয়ারিশঅংশ নির্ভর করে
স্বামীমৃত স্ত্রীর সন্তান আছে কি না
স্ত্রীমৃত স্বামীর সন্তান আছে কি না
মেয়েভাই আছে কি না, এবং মেয়ে কতজন
মাসন্তান বা একাধিক ভাই-বোন আছে কি না
বাবাসন্তান আছে কি না — না থাকলে তিনি অবশিষ্টও নেন
দাদি ও নানিমা জীবিত আছেন কি না
সহোদর ও বৈমাত্রেয় বোনসন্তান, বাবা ও ভাই আছেন কি না
বৈপিত্রেয় ভাই ও বোনসন্তান ও বাবা না থাকলে — নারী-পুরুষ সমান

তালিকাটি পরিস্থিতিনির্ভর। একই আত্মীয় এক পরিবারে জাবিল ফুরুজ, আরেক পরিবারে বঞ্চিত হতে পারেন।

শ্রেণী ২ — আসাবা (অবশিষ্টভোগী)

নির্দিষ্ট অংশের ওয়ারিশরা ভাগ নেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে, তা যায় আসাবাদের কাছে। এঁদের নিজস্ব কোনো নির্ধারিত ভগ্নাংশ নেই — যা বাকি থাকে সেটিই তাঁদের। তাই আসাবার অংশ পরিবারভেদে অনেক বেশিও হতে পারে, আবার শূন্যও হতে পারে।

  • ছেলে ও তাঁর মাধ্যমে নাতি — সবচেয়ে অগ্রাধিকারে
  • বাবা, তারপর দাদা
  • সহোদর ভাই, তারপর বৈমাত্রেয় ভাই
  • ভাইয়ের ছেলে, তারপর তাঁর ছেলে
  • চাচা, তারপর চাচাতো ভাই ও তাঁদের সন্তানরা

ছেলে ও মেয়ে একসাথে থাকলে মেয়েও আসাবা হয়ে যান — তখন তিনি আর নির্দিষ্ট অংশ পান না, বরং ভাইয়ের সঙ্গে ২ঃ১ অনুপাতে অবশিষ্ট ভাগ করে নেন। একইভাবে মেয়ের সঙ্গে থাকলে সহোদর বোনও অবশিষ্টভোগী হয়ে যেতে পারেন।

শ্রেণী ৩ — জাবিল আরহাম (অন্যান্য আত্মীয়)

উপরের দুই শ্রেণীর কেউ না থাকলে তখনই এই শ্রেণীর কথা আসে — মেয়ের সন্তান, বোনের সন্তান, মামা, খালা, নানা এবং তাঁদের সন্তানরা। বাস্তবে এঁদের ভাগ পাওয়ার সুযোগ কম, কারণ আগের দুই শ্রেণীর কেউ না কেউ সাধারণত থেকেই যান।

কে বাদ পড়েন এবং কেন

ওয়ারিশের তালিকায় নাম থাকা আর ভাগ পাওয়া এক কথা নয়। কাছের ওয়ারিশ উপস্থিত থাকলে দূরের ওয়ারিশ বাদ পড়েন — একে বলা হয় হাজব। কয়েকটি পরিচিত উদাহরণ:

  • মৃত ব্যক্তির ছেলে থাকলে তাঁর ভাই, বোন, চাচা — কেউই পান না
  • বাবা জীবিত থাকলে দাদা পান না, ভাই-বোনও পান না
  • মা জীবিত থাকলে দাদি-নানি পান না
  • ছেলে জীবিত থাকলে সাধারণ নিয়মে নাতি পান না

হাজব সবসময় পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়। কখনো কখনো কারো উপস্থিতি অন্যের অংশ কেবল কমিয়ে দেয়। যেমন সন্তান না থাকলে মা পান ১/৩, কিন্তু মৃত ব্যক্তির দুই বা তার বেশি ভাই-বোন থাকলে মায়ের অংশ কমে ১/৬ হয়ে যায় — অথচ ওই ভাই-বোনেরা নিজেরা এক পয়সাও না পেতে পারেন।

উপরের হিসাবে খেয়াল করুন — দুই সহোদর বোন একসাথে যে অংশ পাচ্ছেন সেটি দুজনের মোট, একজনের নয়। একাধিক ওয়ারিশ একই শ্রেণীতে থাকলে ফারায়েজ প্রথমে গোষ্ঠীর মোট অংশ বের করে, তারপর তা ভাগ হয়।

যাঁরা ওয়ারিশ নন

রক্ত বা সম্পর্কের নৈকট্য থাকলেই ওয়ারিশ হওয়া যায় না। নিচের সম্পর্কগুলো উত্তরাধিকারের অধিকার তৈরি করে না:

  • দত্তক বা পালক সন্তান — লালন-পালন যতই দীর্ঘ হোক, উত্তরাধিকার তৈরি হয় না
  • সৎ মা ও সৎ বাবা — নিজের মা-বাবার মতো নন
  • দুধ-সম্পর্কের আত্মীয় — দুধ-সম্পর্ক বিবাহ নিষিদ্ধ করে, কিন্তু উত্তরাধিকার দেয় না
  • পুত্রবধূ ও জামাতা — তাঁরা নিজেদের বাবা-মায়ের ওয়ারিশ

এঁদের কারো জন্য কিছু রাখতে চাইলে পথ দুটি — জীবদ্দশায় হেবা, অথবা মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে ওসিয়ত

বাংলাদেশের আইনে বিশেষ বিধান

উপরের শ্রেণীবিন্যাস ক্লাসিক হানাফি ফারায়েজের। বাংলাদেশে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৪ ধারা একটি সংযোজন এনেছে — মৃত ব্যক্তির আগেই যে ছেলে বা মেয়ে মারা গেছেন, তাঁর সন্তানরা এখন অংশ পান। প্রচলিত ফারায়েজে তাঁরা বাদ পড়তেন।

তাই বাংলাদেশে ওয়ারিশের তালিকা তৈরির সময় একটি বাড়তি প্রশ্ন করতে হয় — কোনো সন্তান কি মৃত ব্যক্তির আগেই মারা গেছেন? উত্তর হ্যাঁ হলে তালিকা বদলে যায়।

আপনার নিজের পরিবারের হিসাব করুন

ওয়ারিশদের নাম ও সম্পদের পরিমাণ দিন — মুহূর্তেই পাবেন বিস্তারিত বণ্টন তালিকা, হিসাবের ধাপ এবং প্রিন্টযোগ্য রিপোর্ট।

ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

শাস্ত্রে নির্দিষ্ট অংশের ওয়ারিশ হিসেবে সাধারণত বারো শ্রেণীর কথা বলা হয়, আর আসাবার তালিকা তার চেয়ে দীর্ঘ। তবে কোনো একটি পরিবারে সবাই একসঙ্গে থাকেন না — বেশির ভাগ পরিবারে প্রকৃত ওয়ারিশের সংখ্যা তিন থেকে ছয়জনের মধ্যে থাকে।
উত্তরাধিকার হিসেবে নয়, কিন্তু অন্য পথ আছে। জীবদ্দশায় হেবা করে দেওয়া যায়, অথবা মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে ওসিয়ত করা যায়। দুটিই বৈধ।
তিনটি শ্রেণীর কেউই না থাকলে সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যায়। বাস্তবে এমন ঘটনা বিরল, কারণ দূরসম্পর্কের কোনো আত্মীয় সাধারণত পাওয়া যায়।
হ্যাঁ, বাবার ক্ষেত্রে এটি ঘটে। মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে বাবা প্রথমে নির্দিষ্ট ১/৬ পান, আর সন্তান শুধু মেয়ে হলে অবশিষ্ট অংশও তিনি নেন।
না। নাবালক সন্তানও পূর্ণ ওয়ারিশ, তাঁর অংশ অক্ষত রাখতে হয়। গর্ভে থাকা সন্তানের জন্যও অংশ আলাদা করে রাখা হয়।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। প্রতিটি পরিবারের অবস্থা আলাদা এবং ছোট একটি তথ্য পুরো হিসাব বদলে দিতে পারে। দলিল, নামজারি বা বণ্টননামার আগে স্থানীয় আলেম ও আইনজীবীর সঙ্গে মিলিয়ে নিন।