ফারায়েজ শব্দটি বাংলাদেশে খুব পরিচিত, কিন্তু শব্দটির অর্থ জিজ্ঞেস করলে অনেকেই থেমে যান। কেউ ভাবেন এটি সম্পত্তি ভাগের একটি পদ্ধতির নাম, কেউ ভাবেন এটি কোনো আইনের নাম। আসলে ফারায়েজ একটি পুরো শাস্ত্র — কে ওয়ারিশ হবেন, কে হবেন না, আর যাঁরা হবেন তাঁরা কে কতটুকু পাবেন, তার সম্পূর্ণ কাঠামো।

শব্দ দুটির অর্থ

শব্দআক্ষরিক অর্থপ্রচলিত ব্যবহার
ফারায়েজ‘ফারিদা’-র বহুবচন — নির্ধারিত অংশউত্তরাধিকার বণ্টনের নিয়ম ও হিসাবের শাস্ত্র
মীরাসযা রেখে যাওয়া হয়, উত্তরাধিকারমৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তি এবং তার হস্তান্তর

দুটি শব্দ একই বিষয়ের দুই দিক — মীরাস হলো সম্পত্তি, ফারায়েজ হলো সেই সম্পত্তি ভাগের নিয়ম।

‘ফারিদা’ শব্দের মূলে আছে নির্দিষ্ট করে দেওয়া। ফারায়েজের কেন্দ্রীয় ধারণাটিও তাই — উত্তরাধিকারের অংশ মানুষের ইচ্ছামতো ঠিক হয় না, অনেকের ক্ষেত্রে তা আগে থেকেই নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। স্ত্রী কত পাবেন, মা কত পাবেন, মেয়ে কত পাবেন — এগুলো আলোচনার বিষয় নয়, নির্ধারিত।

ফারায়েজের মূল বৈশিষ্ট্য

  • মালিকানা মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই বদলায়। কাগজপত্র বা নামজারির অপেক্ষায় থাকে না। দলিল পরে হয়, অধিকার আগেই জন্মায়।
  • অংশ নির্দিষ্ট, ইচ্ছাধীন নয়। বাবা চাইলেই এক সন্তানকে বেশি আর আরেকজনকে কম দিয়ে যেতে পারেন না।
  • ভাগ হয় নিট সম্পত্তির। দাফনের খরচ, ঋণ ও ওসিয়ত বাদ দেওয়ার পর যা থাকে, তার।
  • নিকট আত্মীয় দূরবর্তীকে আড়াল করেন। ছেলে থাকলে ভাই পান না, বাবা থাকলে দাদা পান না।
  • সবাই ওয়ারিশ নন। রক্তের বা বৈবাহিক সম্পর্ক থাকলেই ওয়ারিশ হওয়া যায় না — একটি নির্দিষ্ট তালিকা আছে।

ফারায়েজ কেন আলাদা একটি শাস্ত্র

বেশির ভাগ উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় মূল প্রশ্ন একটাই — সম্পত্তি কার। ফারায়েজে প্রশ্ন তিনটি, আর তিনটিই আলাদা করে সমাধান করতে হয়:

  • কারা ওয়ারিশ? সম্পর্কের তালিকা থেকে বাছাই।
  • কে কাকে আড়াল করেন? কাছের ওয়ারিশের উপস্থিতিতে কে বাদ পড়েন।
  • অবশিষ্ট নিয়ে কী হবে? নির্দিষ্ট অংশ যোগ করে ১০০% না হলে, বা ১০০%-এর বেশি হলে, কী করা হবে।

শেষ প্রশ্নটির জন্যই ফারায়েজে দুটি বিশেষ নীতি আছে। নির্দিষ্ট অংশের যোগফল ১-এর বেশি হয়ে গেলে সবার অংশ আনুপাতিক হারে কমিয়ে দেওয়া হয় — একে বলে আউল। আর যোগফল ১-এর কম হলে এবং অবশিষ্ট নেওয়ার মতো কেউ না থাকলে, অবশিষ্টটুকু একই অনুপাতে ওয়ারিশদের কাছেই ফিরিয়ে দেওয়া হয় — একে বলে রদ। এই দুটি নীতি না থাকলে হিসাব কখনোই মিলত না।

নিচের উদাহরণে আউল কাজ করতে দেখা যায়। স্বামী, মা ও এক সহোদর বোন — তিনজনের নির্দিষ্ট অংশ যোগ করলে ১-এর বেশি হয়ে যায়, তাই সবার অংশ আনুপাতিক হারে কমে:

এখানে স্বামীর প্রাপ্য ছিল ১/২, বোনের ১/২, মায়ের ১/৬ — যোগফল ৭/৬, অর্থাৎ ১১৬ শতাংশ। যা নেই তা ভাগ করা যায় না, তাই হরটি ৬ থেকে বাড়িয়ে ৭ করা হয়েছে এবং প্রত্যেকের অংশ একই অনুপাতে কমেছে।

ফারায়েজ, ওসিয়ত ও হেবা — তিনটি আলাদা জিনিস

ফারায়েজওসিয়তহেবা
কখন কার্যকরমৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেমৃত্যুর পরজীবদ্দশাতেই
কে পাননির্দিষ্ট ওয়ারিশরাযাঁরা ওয়ারিশ ননযে কেউ
পরিমাণনির্ধারিত ভগ্নাংশসর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশসীমা নেই
বদলানো যায়?নাজীবদ্দশায় বাতিল করা যায়দখল দেওয়ার পর সাধারণত না

এই তিনটিকে গুলিয়ে ফেললেই বিরোধ শুরু হয়। কেউ বলেন “বাবা আমাকে দিয়ে গেছেন” — কিন্তু সেটি ওসিয়ত ছিল না হেবা ছিল, আর দখল হস্তান্তর হয়েছিল কি না, তার উপরই সবকিছু নির্ভর করে। বিস্তারিত আছে জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি বণ্টন লেখায়।

বাংলাদেশের আইনে বিশেষ বিধান

বাংলাদেশে মুসলিমদের উত্তরাধিকার মূলত হানাফি ফারায়েজ অনুযায়ীই চলে। তবে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৪ ধারা একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম তৈরি করেছে — বাবা-মায়ের আগে মারা যাওয়া সন্তানের সন্তানরাও অংশ পান, যা প্রচলিত ফারায়েজে ছিল না।

এই দুটিকে আলাদা করে বোঝা জরুরি। ক্লাসিক ফারায়েজের নিয়ম আর বাংলাদেশের আইনি অবস্থান সব ক্ষেত্রে এক নয়, আর যেখানে আলাদা সেখানে কোনটি প্রযোজ্য তা পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে।

কোথা থেকে শুরু করবেন

ফারায়েজ শেখার একটি স্বাভাবিক ক্রম আছে। প্রথমে জানুন কারা ওয়ারিশ হতে পারেন, তারপর কে কাকে আড়াল করেন, তারপর অংশের হিসাব। সরাসরি হিসাব দিয়ে শুরু করলে বেশির ভাগ সময় ভুল হয়, কারণ কে তালিকায় আছেন সেটিই তখনো ঠিক হয়নি।

আপনার নিজের পরিবারের হিসাব করুন

ওয়ারিশদের নাম ও সম্পদের পরিমাণ দিন — মুহূর্তেই পাবেন বিস্তারিত বণ্টন তালিকা, হিসাবের ধাপ এবং প্রিন্টযোগ্য রিপোর্ট।

ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

কাছাকাছি, কিন্তু এক নয়। মীরাস হলো মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তি, আর ফারায়েজ হলো সেই সম্পত্তি কীভাবে ও কার মধ্যে ভাগ হবে তার নিয়ম। দৈনন্দিন কথায় দুটি প্রায়ই একসাথে ব্যবহৃত হয়।
না। মৃত ব্যক্তির মালিকানাধীন সবকিছু — জমি, বাড়ি, নগদ টাকা, ব্যাংকে জমা, স্বর্ণ, দোকানের মালামাল, যানবাহন — সবই মীরাসের অন্তর্ভুক্ত এবং একই নিয়মে ভাগ হয়।
ফারায়েজ অনুযায়ী কে কত পাবেন তা আগে নির্ধারণ করতে হয়। এরপর কোনো ওয়ারিশ প্রাপ্তবয়স্ক ও সজ্ঞানে নিজের অংশ থেকে অন্যকে দিতে চাইলে সেটি তাঁর নিজের দান — বণ্টনের নিয়ম বদল নয়। নাবালকের অংশ নিয়ে এমন সমঝোতা করা যায় না।
ফারায়েজে নৈকট্যের একটি ক্রম আছে। কাছের ওয়ারিশ উপস্থিত থাকলে দূরের ওয়ারিশ বাদ পড়েন — একে বলে হাজব। যেমন ছেলে থাকলে মৃত ব্যক্তির ভাই কিছুই পান না।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। প্রতিটি পরিবারের অবস্থা আলাদা এবং ছোট একটি তথ্য পুরো হিসাব বদলে দিতে পারে। দলিল, নামজারি বা বণ্টননামার আগে স্থানীয় আলেম ও আইনজীবীর সঙ্গে মিলিয়ে নিন।