অনেক পরিবারে সম্পত্তি নিয়ে দুটি আলাদা ঘটনা ঘটে, আর সেগুলো গুলিয়ে ফেলা থেকেই বিরোধের সূত্রপাত হয়। হেবা ঘটে জীবিত অবস্থায় — মালিক নিজের ইচ্ছায় কাউকে সম্পত্তি দিয়ে দেন। উত্তরাধিকার ঘটে মৃত্যুর পর — আইন নির্ধারণ করে কে কত পাবেন। একটিতে মালিকের ইচ্ছা চলে, অন্যটিতে চলে না।
মূল পার্থক্য
| হেবা | উত্তরাধিকার | |
|---|---|---|
| কখন ঘটে | দাতা জীবিত থাকতে | মৃত্যুর পর |
| কে ঠিক করেন | মালিক নিজে — যাকে খুশি, যতটুকু খুশি | আইন — ফারায়েজের নির্দিষ্ট নিয়ম |
| পরিমাণের সীমা | সীমা নেই — পুরো সম্পত্তিও দেওয়া যায় | প্রত্যেকের অংশ নির্দিষ্ট |
| ফেরানো যায়? | দখল হস্তান্তরের পর সাধারণত যায় না | প্রশ্নই ওঠে না |
| ফল | সম্পত্তি তরিকা থেকে বেরিয়ে যায় | তরিকা ভাগ হয় |
একবার বৈধভাবে হেবা হয়ে গেলে সেই সম্পত্তি আর মৃতের তরিকার অংশ নয় — তাই ওয়ারিশরা সেখানে দাবি করতে পারেন না।
হেবা বৈধ হওয়ার তিনটি শর্ত
| শর্ত | কী প্রয়োজন |
|---|---|
| ১. ঘোষণা | দাতা স্পষ্টভাবে দিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করবেন |
| ২. গ্রহণ | গ্রহীতা তা গ্রহণ করবেন |
| ৩. দখল হস্তান্তর | সম্পত্তির দখল বাস্তবে গ্রহীতার হাতে যাবে |
তিনটির যেকোনো একটি না হলে হেবা অসম্পূর্ণ থাকে এবং সম্পত্তি দাতার তরিকাতেই থেকে যায়।
স্থাবর সম্পত্তির হেবা রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক
বাংলাদেশে রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮-এর ধারা ১৭ নির্ধারণ করে কোন কোন দস্তাবেজের রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক। আইনের মূল পাঠে সেই তালিকায় আছে — “instruments of gift of immoveable property” এবং আলাদা দফায় “declaration of heba under the Muslim Personal Law (Shariat)”।
মৃত্যুশয্যার দান আলাদা নিয়মে পড়ে
কেউ মৃত্যুশয্যায় — অর্থাৎ মরণব্যাধিতে আক্রান্ত অবস্থায়, যেখানে মৃত্যুর আশঙ্কা প্রবল — সম্পত্তি দান করলে ফিকহে সেটিকে মারাদুল মাউত বলা হয়। এমন দান সাধারণ হেবার মতো নয়; শাস্ত্রীয় ফিকহে এটিকে ওসিয়তের নিয়মে বিবেচনা করা হয়।
ওসিয়তের দুটি প্রধান সীমা প্রযোজ্য হয়ে যায় — দান সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে থাকতে হবে, এবং কোনো ওয়ারিশকে দিতে চাইলে অন্য ওয়ারিশদের সম্মতি লাগবে।
হেবা কি মেয়েকে বঞ্চিত করার উপায়
প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। বাস্তবে অনেক পরিবারে ছেলেদের নামে জীবিত অবস্থায় হেবা করে দেওয়া হয়, যাতে মৃত্যুর পর মেয়েদের ভাগ করার মতো কিছু না থাকে। আইনগতভাবে বৈধ হেবা বাতিল করা কঠিন — কিন্তু এর ফলটি অঙ্কেই দেখা যায়।
ধরুন মোট সম্পত্তি ৮০ লাখ টাকা। ওয়ারিশ — স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে। কোনো হেবা না হলে পুরো ৮০ লাখের উপর হিসাব হতো। এখন ধরুন পিতা জীবিত অবস্থায় এক ছেলেকে ৪০ লাখ টাকার সম্পত্তি হেবা করে দিয়েছেন। তখন ভাগ হবে বাকি ৪০ লাখের উপর:
| ওয়ারিশ | হেবা না হলে (৮০ লাখে) | হেবার পর (৪০ লাখে) |
|---|---|---|
| স্ত্রী | ১০,০০,০০০ | ৫,০০,০০০ |
| মেয়ে | ১৪,০০,০০০ | ৭,০০,০০০ |
| হেবা না পাওয়া ছেলে | ২৮,০০,০০০ | ১৪,০০,০০০ |
| হেবা পাওয়া ছেলে | ২৮,০০,০০০ | ৪০ + ১৪ = ৫৪,০০,০০০ |
ভগ্নাংশ একই থেকেছে — কেবল যে সম্পত্তির উপর হিসাব হচ্ছে, সেটি অর্ধেক হয়ে গেছে।
হেবা সঠিকভাবে করার উপায়
- উদ্দেশ্য পরিষ্কার রাখুন। প্রয়োজনের ভিত্তিতে দেওয়া এক জিনিস; কাউকে বঞ্চিত করার জন্য দেওয়া অন্য জিনিস।
- রেজিস্ট্রি করান। স্থাবর সম্পত্তির হেবা ঘোষণার রেজিস্ট্রেশন আইনত বাধ্যতামূলক।
- দখল বাস্তবে হস্তান্তর করুন এবং তার প্রমাণ রাখুন — খাজনার রসিদ, নামজারি, ভোগদখলের নথি।
- সব সন্তানকে জানান। গোপনে করা হেবা মৃত্যুর পর বিরোধের প্রধান কারণ হয়।
- ভারসাম্য রাখুন। এক সন্তানকে দিলে অন্যদের জন্যও সমপরিমাণ ব্যবস্থা রাখার কথা ভাবুন।
যেখানে সবচেয়ে বেশি ভুল হয়
- ভুল ১ — হেবাকে ওসিয়ত ভাবা। হেবা জীবিত অবস্থায় ও তাৎক্ষণিক; ওসিয়ত মৃত্যুর পর কার্যকর এবং এক-তৃতীয়াংশে সীমাবদ্ধ।
- ভুল ২ — দখল হস্তান্তর না করে শুধু কাগজ করে রাখা। হেবা তখন অসম্পূর্ণ থাকে এবং চ্যালেঞ্জযোগ্য।
- ভুল ৩ — স্থাবর সম্পত্তির হেবা রেজিস্ট্রি না করা।
- ভুল ৪ — মৃত্যুশয্যার দানকে সাধারণ হেবা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া। ফিকহে সেটি ওসিয়তের নিয়মে বিবেচিত।
- ভুল ৫ — হেবা করা সম্পত্তিকে তরিকার সঙ্গে যোগ করে ভাগ করা। বৈধ হেবার পর সেটি আর মৃতের সম্পত্তি নয়।
- ভুল ৬ — হেবা হয়েছে বলে দাবি করা কিন্তু কোনো প্রমাণ না থাকা। প্রমাণ ছাড়া সম্পত্তিটি তরিকার অংশ হিসেবেই গণ্য হতে পারে।
হেবা বাদ দেওয়ার পর কী থাকে হিসাব করুন
বৈধভাবে হেবা করা সম্পত্তি বাদ দিয়ে অবশিষ্ট পরিমাণটি বসান — তার উপরেই ফারায়েজের হিসাব হবে।
ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →