আত্মীয়ের তালিকা আর ওয়ারিশের তালিকা এক নয়। রক্তের সম্পর্ক থাকলেও অনেকে সম্পত্তির এক টাকাও পান না — কারণ তাঁদের চেয়ে নিকটতর কেউ জীবিত আছেন। এই বাদ পড়ার নিয়মটির নাম হাজব। ভাগ শুরু করার আগেই এটি ঠিক হয়ে যায়, তাই কে বঞ্চিত হচ্ছেন সেটি না বুঝলে পুরো হিসাবই ভুল দিকে যায়।
হাজব দুই ধরনের
| ধরন | যা ঘটে | উদাহরণ |
|---|---|---|
| হাজব হিরমান | ওয়ারিশ সম্পূর্ণ বাদ পড়েন — কিছুই পান না | পুত্র জীবিত থাকলে মৃতের ভাই কিছুই পান না |
| হাজব নুকসান | ওয়ারিশ পান, কিন্তু অংশ কমে যায় | সন্তান থাকলে স্ত্রীর ১/৪ কমে ১/৮ হয়ে যায় |
দুটি আলাদা জিনিস। নুকসান মানে বঞ্চিত হওয়া নয় — শুধু কম পাওয়া।
কাদের অংশ কমে যায় (হাজব নুকসান)
| ওয়ারিশ | সাধারণ অংশ | কমে যায় | কারণ |
|---|---|---|---|
| স্বামী | ১/২ | ১/৪ | মৃতের সন্তান বা পৌত্র-পৌত্রী থাকলে |
| স্ত্রী | ১/৪ | ১/৮ | মৃতের সন্তান বা পৌত্র-পৌত্রী থাকলে |
| মাতা | ১/৩ | ১/৬ | সন্তান বা পৌত্র-পৌত্রী থাকলে, অথবা দুই বা তার বেশি ভাই-বোন থাকলে |
| পিতা | পুরো অবশিষ্ট | ১/৬ (+ প্রযোজ্য হলে অবশিষ্ট) | পুত্র বা পৌত্র থাকলে |
এই চারজন কখনো সম্পূর্ণ বঞ্চিত হন না — শুধু অংশ কমে।
কাদের সম্পূর্ণ বাদ পড়ার সম্ভাবনা আছে (হাজব হিরমান)
| যিনি বঞ্চিত হন | যাঁর উপস্থিতিতে |
|---|---|
| দাদা | পিতা জীবিত থাকলে |
| দাদি | পিতা বা মাতা জীবিত থাকলে |
| নানি | মাতা জীবিত থাকলে |
| সহোদর ভাই ও বোন | পুত্র, পৌত্র, পিতা বা দাদা জীবিত থাকলে |
| বৈমাত্রেয় (সৎ) ভাই ও বোন | উপরের যে-কেউ, অথবা সহোদর ভাই জীবিত থাকলে |
| বৈপিত্রেয় ভাই ও বোন | মৃতের যে-কোনো সন্তান, পিতা বা দাদা জীবিত থাকলে |
| সহোদর ভাইয়ের পুত্র | সহোদর ভাই বা তাঁর উপরের স্তরের কোনো আসাবা থাকলে |
| আপন চাচা | পিতা, পুত্র বা ভাইদের বংশধর জীবিত থাকলে |
| চাচাতো ভাই | চাচা জীবিত থাকলে |
তালিকাটি উপর থেকে নিচে — যত উপরে, তত সহজে বঞ্চিত হন।
পুত্র থাকলে ভাই-বোন কিছুই পান না
সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি হয় এই জায়গায়। মৃত ব্যক্তির ভাই-বোন সারাজীবন পাশে থাকলেও, একটি পুত্র জীবিত থাকলে তাঁরা ওয়ারিশের তালিকা থেকে সম্পূর্ণ বাদ পড়েন। স্ত্রী, দুই ভাই, এক বোন ও এক ছেলে — এই পরিবারের হিসাব দেখুন:
ভাই-বোনের সারিতে শূন্য দেখাচ্ছে, আর পাশে কারণটিও লেখা আছে। পুত্র আসাবা বিন নাফস হিসেবে অবশিষ্ট পুরোটা নিয়ে নেন, ভাইদের জন্য কিছু থাকে না।
পিতা থাকলেও ভাই-বোন বাদ পড়েন
অনেকে মনে করেন পিতা কেবল ১/৬ নেন। সেটি সত্যি শুধু যখন মৃতের পুত্র বা পৌত্র থাকে। সন্তান না থাকলে পিতা আসাবা হয়ে যান এবং ভাই-বোনদের সরিয়ে দেন:
দাদা-দাদি ও নানির অবস্থান
পিতা জীবিত থাকলে দাদা বাদ পড়েন — পিতা দাদার চেয়ে নিকটতর। একইভাবে মাতা জীবিত থাকলে দাদি ও নানি দুজনেই বাদ পড়েন, কারণ মাতা তাঁদের চেয়ে নিকটতর:
তবে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। পিতা শুধু দাদির পথ আটকান, নানির পথ নয় — কারণ নানি মাতার দিক থেকে আসেন। নিচের হিসাবে পিতা আছেন কিন্তু মাতা নেই, তাই দাদি বঞ্চিত হলেও নানি ১/৬ পাচ্ছেন:
ভাই থাকলে ভাইয়ের ছেলে পান না
আসাবাদের মধ্যে একটি কঠোর ক্রম আছে — নিকটতর স্তর উপস্থিত থাকলে দূরের স্তর কিছুই পান না। সহোদর ভাই ও সেই ভাইয়ের ছেলে একসঙ্গে থাকলে শুধু ভাই পান:
বাংলাদেশের আইনে বিশেষ বিধান
শাস্ত্রীয় হানাফি নিয়মে মৃতের পুত্র জীবিত থাকলে আগে মারা যাওয়া অন্য পুত্রের সন্তানরা — অর্থাৎ এতিম নাতি-নাতনিরা — হাজবের কারণে বাদ পড়তেন। বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ধারা ৪ এই জায়গাটি বদলে দিয়েছে। আইনের মূল পাঠ অনুযায়ী, উত্তরাধিকার খোলার আগে মৃত ব্যক্তির কোনো ছেলে বা মেয়ে মারা গিয়ে থাকলে তাঁর জীবিত সন্তানরা per stirpes (শাখা অনুযায়ী) সেই অংশটি পাবেন, যা তাঁদের পিতা বা মাতা জীবিত থাকলে পেতেন।
যেখানে সবচেয়ে বেশি ভুল হয়
- ভুল ১ — মেয়ে থাকলে ভাই-বোন বাদ পড়েন ভেবে নেওয়া। কন্যা কখনো ভাই-বোনদের সম্পূর্ণ বাদ দেন না — পুত্র দেন। কন্যা থাকলে সহোদর বোন আসাবা মা'আল গাইর হিসেবে অবশিষ্ট পান।
- ভুল ২ — নুকসানকে বঞ্চনা ভাবা। স্ত্রীর ১/৮ হওয়া মানে তিনি বাদ পড়েছেন নয়।
- ভুল ৩ — দাদি ও নানিকে একই নিয়মে ফেলা। পিতা দাদিকে বাদ দেন, নানিকে দেন না।
- ভুল ৪ — বঞ্চিত ওয়ারিশকে ওয়ারিশান সনদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া। সনদে সব জীবিত নিকটাত্মীয়ের নাম থাকা উচিত; কে অংশ পাবেন সেটি আলাদা হিসাব।
- ভুল ৫ — বঞ্চিত ব্যক্তিকে জোর করে ভাগ দেওয়া এবং সেটিকে ফারায়েজ বলা। স্বেচ্ছায় কিছু দেওয়া যায়, কিন্তু সেটি হেবা বা দান — ফারায়েজের অংশ নয়।
আপনার নিজের পরিবারের হিসাব করুন
ওয়ারিশদের নাম ও সম্পদের পরিমাণ দিন — মুহূর্তেই পাবেন বিস্তারিত বণ্টন তালিকা, হিসাবের ধাপ এবং প্রিন্টযোগ্য রিপোর্ট।
ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →