“বাবার সম্পত্তিতে মেয়ে কত পায়” — এর উত্তর একটি ভগ্নাংশে দেওয়া যায়। ছেলের ক্ষেত্রে যায় না। কারণ কুরআন ছেলের জন্য আলাদা কোনো ভগ্নাংশ ঠিক করেনি; বরং তাঁকে রেখেছে সেই অবস্থানে, যেখানে অন্যদের দেওয়ার পর বাকিটা তাঁর। তাই ছেলের অংশ বুঝতে হলে দেখতে হয়, তাঁর সঙ্গে আর কারা আছেন।

ছেলে কেন “অবশিষ্টভোগী”

সূরা নিসার ১১ নম্বর আয়াতে সন্তানদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, এক ছেলে পাবে দুই মেয়ের সমান। এখানে ছেলের জন্য আলাদা কোনো সংখ্যা নেই — আছে মেয়ের সঙ্গে তুলনা। আর সহিহ বুখারির ৬৭৩২ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, নির্ধারিত অংশগুলো তাদের হকদারদের দিয়ে দাও; যা বাকি থাকে, তা নিকটতম পুরুষ আত্মীয়ের। মৃত ব্যক্তির সবচেয়ে নিকটতম পুরুষ আত্মীয় হলেন তাঁর ছেলে।

এই দুটি মিলিয়ে ছেলের অবস্থান দাঁড়ায় এমন: নির্দিষ্ট অংশধারীরা আগে নেবেন, তারপর বাকিটা ছেলে — আর মেয়ে থাকলে ছেলে-মেয়ে মিলে ২ঃ১ হারে। এই অবশিষ্টভোগী ওয়ারিশদের ক্রম কীভাবে সাজানো, তা আছে আসাবা কারা — অবশিষ্টভোগী ওয়ারিশ ও অগ্রাধিকারের ক্রম লেখায়। আর ২ঃ১ অনুপাতের যুক্তি আলাদা করে ব্যাখ্যা করা আছে ছেলে ও মেয়ের অংশ ২ঃ১ কেন লেখায় — এখানে তা আর পুনরাবৃত্তি করা হলো না।

পরিবার অনুযায়ী ছেলের অংশ — এক নজরে

নিচের সব হিসাব ধরে নিচ্ছে, দাফন-কাফন, ঋণ ও বৈধ ওসিয়ত বাদ দেওয়ার পর ৪৮ লাখ টাকা ভাগ হচ্ছে।

ওয়ারিশছেলে(রা) মোট পান৪৮ লাখ টাকায় ছেলের ভাগ
শুধু এক ছেলেপুরো সম্পত্তি৪৮,০০,০০০
শুধু তিন ছেলেপুরো সম্পত্তি, সমান তিন ভাগেপ্রত্যেকে ১৬,০০,০০০
দুই ছেলে ও এক মেয়ে৪/৫প্রত্যেকে ১৯,২০,০০০
স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে৭/১২২৮,০০,০০০
বাবা, মা ও এক ছেলে২/৩৩২,০০,০০০
স্বামী ও এক ছেলে (মায়ের সম্পত্তি)৩/৪৩৬,০০,০০০

প্রতিটি সারির ভগ্নাংশ সাইটের ক্যালকুলেটরে মিলিয়ে দেখা। লক্ষ করুন — ছেলের অংশ একটি সংখ্যা নয়, পরিবারভেদে বদলায়।

মেয়ে থাকলে: অবশিষ্ট ভাগ হয় ২ঃ১ হারে

দুই ছেলে ও এক মেয়ে থাকলে হিসাবটি সহজ: মোট পাঁচ ভাগ করুন — প্রত্যেক ছেলে দুই ভাগ, মেয়ে এক ভাগ। ফলে দুই ছেলে মিলে ৪/৫, মেয়ে ১/৫।

বড় ছেলে, ছোট ছেলে, বিবাহিত বা অবিবাহিত, প্রবাসী বা বাড়িতে থাকা — সব ছেলে সমান। বয়স বা বাবার সেবার কারণে কারও ফারায়েজের অংশ বাড়ে না।

স্ত্রী থাকলে: আগে স্ত্রীর ১/৮, তারপর সন্তানদের

মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে স্ত্রী পান ১/৮। বাকি ৭/৮ ছেলে-মেয়ের মধ্যে ২ঃ১ হারে যায়। এক ছেলে ও এক মেয়ে থাকলে ছেলে পান ৭/১২, মেয়ে ৭/২৪।

স্ত্রীর অংশ কেন ১/৮ এবং একাধিক স্ত্রী থাকলে কী হয়, তা আছে স্বামী মারা গেলে স্ত্রী কত সম্পত্তি পাবে লেখায়।

মৃত ব্যক্তির বাবা-মা জীবিত থাকলে

অনেক পরিবারে মৃত ব্যক্তির বাবা-মা তখনো জীবিত থাকেন। ছেলে থাকলে বাবা ও মা প্রত্যেকে ১/৬ করে পান; বাকি ২/৩ ছেলের।

এখানে ছেলে থাকায় বাবা আর অবশিষ্টভোগী হন না, শুধু নিজের ১/৬ পান — ছেলে না থাকলে তাঁর অবস্থান অন্যরকম হতো। মা-বাবার অংশের বিভিন্ন রূপ দেখুন মা-বাবা জীবিত থাকলে সম্পত্তি কীভাবে ভাগ হয় লেখায়।

ছেলে থাকলে কারা কিছুই পান না

ছেলের উপস্থিতি পরিবারের বড় একটি অংশকে উত্তরাধিকারের বাইরে রাখে। মৃত ব্যক্তির ভাই, বোন, ভাতিজা, চাচা ও চাচাতো ভাই — ছেলে জীবিত থাকলে এঁরা কেউই অংশ পান না।

উল্টো দিকে, ছেলেকে কেউ বঞ্চিত করতে পারেন না। স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, ছেলে ও মেয়ে — এই ছয়জন — হত্যা বা ধর্মের ভিন্নতার মতো বাধা না থাকলে — সব অবস্থায় কিছু না কিছু পান। কে কাকে কেন বাদ দেন, তার পূর্ণ তালিকা আছে হাজব — কে বঞ্চিত হন এবং কেন লেখায়।

ছেলে কি কখনো কম পান?

ছেলের অংশ কমে একটি কারণেই — নির্দিষ্ট অংশধারীর সংখ্যা বাড়লে। স্ত্রী, মা ও বাবা একসঙ্গে থাকলে তাঁরা আগে নেন, ছেলের অবশিষ্ট ছোট হয়। তবে ছেলে থাকলে সম্পত্তিতে কখনো আউল হয় না এবং রদের প্রশ্নও ওঠে না: অবশিষ্ট যত ছোটই হোক, তা ছেলের কাছেই যায়।

মায়ের সম্পত্তিতেও একই নিয়ম: মা মারা গেলে ছেলের অবস্থান একই — অবশিষ্টভোগী। পার্থক্য শুধু এই যে সেখানে স্বামী (ছেলের বাবা) সন্তান থাকায় ১/৪ পান। বিস্তারিত আছে মায়ের সম্পত্তি ছেলে মেয়ের মধ্যে কীভাবে ভাগ হবে লেখায়।

ছেলে বাবার আগে মারা গেলে

ফারায়েজের মূল নিয়মে ওয়ারিশ হতে মৃত্যুর সময় জীবিত থাকতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এ বিষয়ে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের একটি বিশেষ বিধান আছে, যা আলাদা আলোচনার বিষয় — দেখুন এতিম নাতি নাতনি কি দাদার সম্পত্তি পাবে।

যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়

  • ভুল ১ — ছেলে-মেয়ের ২ঃ১ অনুপাত পুরো সম্পত্তিতে লাগানো। স্ত্রী বা মা-বাবা থাকলে আগে তাঁদের অংশ দিতে হয়; ২ঃ১ খাটে শুধু অবশিষ্টের উপর।
  • ভুল ২ — বড় ছেলেকে বেশি দেওয়া বা “বাবার সঙ্গে থাকা” ছেলেকে বাড়তি ধরা। সব ছেলে সমান।
  • ভুল ৩ — ছেলে থাকা সত্ত্বেও চাচা বা ফুফুদের ভাগ চাওয়া। ছেলে থাকলে মৃতের ভাই-বোন কিছুই পান না।
  • ভুল ৪ — ছেলের জন্য একটি স্থির ভগ্নাংশ ধরে নেওয়া, যেমন “ছেলে সবসময় অর্ধেক পায়”। অংশটি পরিবার অনুযায়ী বদলায়।
  • ভুল ৫ — ভাগের আগে ঋণ ও ওসিয়ত বাদ না দেওয়া। ছেলের অংশ হিসাব হয় পরিশোধের পর যা থাকে, তার উপর।

নিজের পরিবারের তালিকা বসিয়ে দেখুন

স্ত্রী, মা-বাবা, কয়জন ছেলে-মেয়ে — তালিকা দিলেই ছেলের অংশ টাকায় দেখে নিতে পারবেন।

উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটরে হিসাব করুন →

প্রাথমিক সূত্র

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

না। ছেলে আসাবা — নির্দিষ্ট অংশধারীদের দেওয়ার পর যা থাকে, তা পান। মেয়ে থাকলে সেই অবশিষ্ট ছেলে-মেয়ের মধ্যে ২ঃ১ হারে ভাগ হয়।
অন্য কোনো ওয়ারিশ না থাকলে হ্যাঁ, পুরোটা পান। স্ত্রী, মা বা বাবা জীবিত থাকলে আগে তাঁদের নির্দিষ্ট অংশ দিতে হয়, তারপর বাকিটা ছেলের।
না। সব ছেলে সমান অংশ পান; বয়স, বিয়ে বা সেবার কারণে ফারায়েজের অংশ বদলায় না।
অন্য ওয়ারিশ না থাকলে মোট পাঁচ ভাগ হয় — প্রত্যেক ছেলে দুই ভাগ, মেয়ে এক ভাগ। অর্থাৎ দুই ছেলে মিলে ৪/৫ এবং মেয়ে ১/৫।
না। মৃত ব্যক্তির ছেলে জীবিত থাকলে তাঁর ভাই, বোন, ভাতিজা ও চাচা — কেউই উত্তরাধিকারে অংশ পান না।
না। ছেলে অবশিষ্টভোগী হওয়ায় সম্পত্তিতে কিছু বাড়তি থাকে না বা ঘাটতি পড়ে না; তাই আউল বা রদের প্রয়োজন হয় না।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখার হিসাব হানাফি ফারায়েজ নীতির সাধারণ ব্যাখ্যা। বাস্তব বণ্টনের আগে ওয়ারিশের পূর্ণ তালিকা, ঋণ ও ওসিয়ত যাচাই করে নিন।