ফারায়েজের হিসাব বলে দেয় কে কত অংশ পাবেন — ভগ্নাংশে, শতাংশে। কিন্তু জমির ক্ষেত্রে সেটি যথেষ্ট নয়। “আমি ৭/৪০ অংশের মালিক” জানা এক জিনিস, “পুকুরপাড়ের এই ১২ শতাংশ আমার” জানা আরেক জিনিস। দ্বিতীয় কাজটি করে বণ্টননামা দলিল।
বণ্টননামা কী করে, কী করে না
| করে | করে না | |
|---|---|---|
| কাজ | কে কোন নির্দিষ্ট টুকরা পাবেন তা চূড়ান্ত করে | ফারায়েজের অংশের পরিমাণ বদলায় না |
| ফল | অনির্দিষ্ট সহ-মালিকানা শেষ হয়ে নির্দিষ্ট মালিকানা তৈরি হয় | কাউকে নতুন অধিকার দেয় না |
| পরে | নিজের টুকরায় নামজারি ও হস্তান্তর সহজ হয় | আগের নামজারি বাতিল করে না — আলাদা করাতে হয় |
বণ্টননামা হস্তান্তর নয়, বরং ইতিমধ্যে থাকা অধিকারকে নির্দিষ্ট করা।
রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক
বাংলাদেশে রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮-এর ধারা ১৭ যে দস্তাবেজগুলোর রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করেছে, তার তালিকায় আলাদা দফা হিসেবে আছে — “instruments of partition by inheritance according to personal laws”, অর্থাৎ ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী উত্তরাধিকারসূত্রে বণ্টনের দস্তাবেজ।
আগে হিসাব, তারপর দলিল
বণ্টননামায় প্রত্যেকের অংশ লিখতে হয়, তাই আগে ফারায়েজের হিসাবটি নিশ্চিত করতে হবে। স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ের একটি পরিবারের হিসাব:
এই ভগ্নাংশগুলোই দলিলে বসবে। জমির পরিমাণ শতাংশ বা ডেসিমেলে বের করার পদ্ধতি জমি ভাগের হিসাবের পাতায় আছে।
কে কোন টুকরা পাবেন — মূল্য বনাম পরিমাণ
সব জমি সমান দামের নয়। রাস্তার পাশের ১০ শতাংশ আর পিছনের ১০ শতাংশের দাম আলাদা। তাই শুধু পরিমাণ মিলিয়ে ভাগ করলে ভাগটি অন্যায় হয়ে যায়।
- জমিকে শ্রেণিভাগ করুন — রাস্তার পাশ, ভিটি, ধানি, পুকুর, নাল। প্রত্যেক শ্রেণির আলাদা মূল্য ধরুন।
- মোট মূল্য বের করুন এবং প্রত্যেকের অংশ মূল্যের হিসাবে নির্ধারণ করুন।
- তারপর টুকরা বরাদ্দ করুন — যাতে প্রত্যেকের পাওয়া টুকরার মূল্য তাঁর প্রাপ্য মূল্যের সমান হয়।
- পার্থক্য থেকে গেলে নগদে সমন্বয় করুন এবং সেটি দলিলে লিখুন।
- চলাচলের পথ নিশ্চিত করুন — প্রত্যেক টুকরায় ঢোকার রাস্তা আছে কি না দেখুন। পথহীন টুকরা কার্যত মূল্যহীন হয়ে যায়।
দলিলে কী কী থাকা উচিত
- মৃত ব্যক্তির নাম, মৃত্যুর তারিখ এবং ওয়ারিশান সনদের উল্লেখ।
- সব ওয়ারিশের নাম, সম্পর্ক ও ফারায়েজ অনুযায়ী প্রাপ্য ভগ্নাংশ।
- সম্পত্তির পূর্ণ বিবরণ — মৌজা, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর, পরিমাণ।
- কে কোন দাগের কতটুকু, কোন চৌহদ্দির মধ্যে পাচ্ছেন — নির্দিষ্ট করে।
- চলাচলের পথ, পানির ব্যবস্থা ও যৌথভাবে ব্যবহৃত কিছু থাকলে তার শর্ত।
- নগদ সমন্বয় হলে কে কাকে কত দিলেন।
- কেউ নিজের প্রাপ্য অংশের চেয়ে কম নিলে সেটি দান হিসেবে স্পষ্ট উল্লেখ।
- সব ওয়ারিশের সই — কেউ বাদ থাকলে দলিলটি দুর্বল হয়ে যায়।
অনুপস্থিত বা অপ্রাপ্তবয়স্ক ওয়ারিশ
একজন ওয়ারিশ বিদেশে থাকলে সাধারণত পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে প্রতিনিধি সই করেন। অপ্রাপ্তবয়স্ক ওয়ারিশ থাকলে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল — তাঁর অধিকার রক্ষার জন্য আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
সবাই সম্মত না হলে
বণ্টননামা সব ওয়ারিশের সম্মতিতেই হয়। কেউ সম্মত না হলে দলিল করা যায় না, এবং তখন আদালতের মাধ্যমে বণ্টনের পথ থাকে। সেটি সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল, তাই আপসে মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা সবসময়ই আগে করা উচিত।
যেখানে সবচেয়ে বেশি ভুল হয়
- ভুল ১ — মুখের কথায় ভাগ করে দলিল না করা। পরের প্রজন্মে প্রমাণ থাকে না।
- ভুল ২ — সাদা কাগজে বা নোটারিতে লিখে নিশ্চিন্ত থাকা। উত্তরাধিকারসূত্রে বণ্টনের দস্তাবেজের রেজিস্ট্রেশন আইনত বাধ্যতামূলক।
- ভুল ৩ — কোনো ওয়ারিশকে বাদ দিয়ে দলিল করা। দলিলটি তখন চ্যালেঞ্জযোগ্য হয়ে যায়।
- ভুল ৪ — শুধু পরিমাণ মিলিয়ে ভাগ করা, মূল্য না ধরে। সমান শতাংশ মানেই সমান মূল্য নয়।
- ভুল ৫ — চলাচলের পথের কথা দলিলে না লেখা।
- ভুল ৬ — দলিল করে নামজারি না করানো। রেকর্ড হালনাগাদ না হলে পরবর্তী কাজ আটকে যায়।
- ভুল ৭ — কেউ কম নিলে সেটি দান হিসেবে উল্লেখ না করা। পরে সেই ওয়ারিশ বা তাঁর সন্তানরা দাবি তুলতে পারেন।
দলিলের জন্য অংশ হিসাব করে নিন
ওয়ারিশদের নাম দিন — প্রত্যেকের ভগ্নাংশ ও শতাংশ পেয়ে যাবেন, দলিলে বসানোর মতো করে।
ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →