ওয়ারিশান সনদ হাতে এসেছে, ফারায়েজের হিসাবও জানা হয়েছে। কিন্তু সরকারি খাতায় জমিটি এখনো মৃত ব্যক্তির নামেই আছে। সেই নাম বদলে ওয়ারিশদের নামে রেকর্ড খোলার কাজটির নাম নামজারি — ইংরেজিতে মিউটেশন। এটি না করলে খাজনা দেওয়া, জমি বিক্রি করা বা বন্ধক রাখা কোনোটাই স্বাভাবিকভাবে এগোয় না।
নামজারি আসলে কী করে
নামজারি জমির মালিকানা তৈরি করে না — মালিকানা আগেই এসে গেছে, উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে মৃত্যুর মুহূর্তেই। নামজারি যা করে তা হলো সরকারি রেকর্ড হালনাগাদ: পুরোনো খতিয়ান থেকে নাম কেটে নতুন নামে খতিয়ান খোলা হয়, যাতে খাজনা কার কাছ থেকে নেওয়া হবে সেটি সরকার জানতে পারে।
অনলাইন ব্যবস্থা
বর্তমানে নামজারির আবেদন অনলাইনে করার ব্যবস্থা আছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল সাইটে নামজারি বা মিউটেশন সেবার ঠিকানা হিসেবে mutation.land.gov.bd উল্লেখ করা আছে। ভূমিসেবা সংক্রান্ত সহায়তার জন্য সরকারি হটলাইন নম্বর ১৬১২২।
ওয়ারিশ সূত্রে নামজারির সাধারণ ধাপ
প্রক্রিয়ার বিস্তারিত ধাপ ও নাম এলাকা ও সময়ভেদে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। সাধারণভাবে যা ঘটে:
- ধাপ ১ — মৃত্যুসনদ ও ওয়ারিশান সনদ সংগ্রহ করা। এই দুটি ছাড়া ওয়ারিশ সূত্রে আবেদন এগোয় না।
- ধাপ ২ — জমির কাগজ গোছানো — সর্বশেষ খতিয়ান বা পর্চা, দাগ নম্বর, মৃত ব্যক্তি যে দলিলে জমিটি পেয়েছিলেন সেই দলিল, এবং হালনাগাদ খাজনার রসিদ।
- ধাপ ৩ — অনলাইনে বা ভূমি অফিসে আবেদন করা এবং নির্ধারিত ফি পরিশোধ করা।
- ধাপ ৪ — সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় থেকে যাচাই — কাগজ পরীক্ষা, অনেক ক্ষেত্রে সরেজমিনে তদন্ত এবং প্রতিবেদন।
- ধাপ ৫ — শুনানি হলে নির্ধারিত তারিখে হাজির হওয়া। অন্য ওয়ারিশ বা তৃতীয় পক্ষের আপত্তি থাকলে এই পর্যায়ে আসে।
- ধাপ ৬ — অনুমোদনের পর নতুন খতিয়ান ও ডিসিআর ইস্যু হওয়া। কপি সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করুন।
সব ওয়ারিশের নাম একসঙ্গে তোলা নিরাপদ
ওয়ারিশ সূত্রে নামজারি করার সময় দুটি পথ থাকে — সব ওয়ারিশের নাম যৌথভাবে তোলা, অথবা প্রত্যেকে আলাদা করে নিজের অংশের জন্য আবেদন করা। বাস্তবে প্রথম পথটিই কম ঝামেলার, কারণ সবার সম্মতি একবারেই কাগজে আসে।
নামজারির আগে ফারায়েজের হিসাব করে নিন
নামজারির আবেদনে প্রত্যেক ওয়ারিশের নামের পাশে তাঁর অংশের পরিমাণ লিখতে হয়। এই অঙ্কটি ভুল হলে রেকর্ডেও ভুল অংশ উঠে যায়, এবং পরে সংশোধন করানো সময়সাপেক্ষ। তাই আবেদন করার আগেই হিসাবটি মিলিয়ে নেওয়া ভালো। উদাহরণ হিসেবে স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ের একটি পরিবারের হিসাব:
এই শতকরা হারগুলোই আবেদনে বসবে। শতাংশ বা ডেসিমেলে জমির পরিমাণ কীভাবে বের করবেন, সেটি জমি ভাগের হিসাবের পাতায় বিস্তারিত আছে।
বণ্টননামা ছাড়া নামজারি করলে কী হয়
যৌথ নামজারিতে সবার নাম রেকর্ডে ওঠে, কিন্তু কে কোন অংশটুকু ভোগ করবেন সেটি নির্দিষ্ট হয় না — সবাই অনির্দিষ্ট অংশের সহ-মালিক থাকেন। জমির নির্দিষ্ট টুকরা নিজের করে নিতে চাইলে সব ওয়ারিশের সম্মতিতে বণ্টননামা দলিল করতে হয় এবং তারপর সেই অনুযায়ী আলাদা নামজারি করাতে হয়।
যেখানে সবচেয়ে বেশি ভুল হয়
- ভুল ১ — খাজনা বাকি রেখে আবেদন করা। হালনাগাদ খাজনার রসিদ প্রায় সবসময়ই লাগে।
- ভুল ২ — ওয়ারিশান সনদে কোনো ওয়ারিশের নাম বাদ দিয়ে আবেদন করা। পরে তা প্রকাশ পেলে নামজারিসহ পুরো প্রক্রিয়া বাতিল হতে পারে।
- ভুল ৩ — আবেদনে অংশের ভগ্নাংশ ভুল লেখা। রেকর্ডে ভুল উঠলে সংশোধন করানো দীর্ঘ প্রক্রিয়া।
- ভুল ৪ — নামজারি হয়ে গেলে সব শেষ ভাবা। এটি রেকর্ড হালনাগাদ — মালিকানার চূড়ান্ত রায় নয়।
- ভুল ৫ — নতুন খতিয়ান ও ডিসিআরের কপি সংগ্রহ না করা বা হারিয়ে ফেলা। পরের যেকোনো কাজে এগুলো লাগে।
- ভুল ৬ — দলিল-লেখক বা দালালের মুখের কথায় ভরসা করে কাগজে সই করা। যা সই করছেন, আগে পড়ে নিন।
নামজারির আগে অংশ মিলিয়ে নিন
ওয়ারিশদের নাম দিন — প্রত্যেকের প্রাপ্য অংশ ভগ্নাংশ ও শতাংশে পেয়ে যাবেন, আবেদনে বসানোর মতো করে।
ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →