বোনের অংশ নিয়ে পরিবারে যত প্রশ্ন ওঠে, তার বেশিরভাগের মূল একটি: বোনের অংশ কোনো একটি স্থির ভগ্নাংশ নয়। কুরআন বোনের জন্য ভগ্নাংশ ঠিক করেছে ঠিকই, কিন্তু মৃত ভাইয়ের পরিবারে আর কারা আছেন, তার উপর নির্ভর করে বোন কখনো সেই ভগ্নাংশ পান, কখনো তার চেয়ে বেশি, কখনো কিছুই না।

এই লেখায় “বোন” বলতে আপন (সহোদর) বোন বোঝানো হয়েছে — বাবা ও মা দুজনই এক। বৈমাত্রেয় বা বৈপিত্রেয় বোনের নিয়ম আলাদা; সেগুলো আছে সৎ ভাই বোন কি সম্পত্তি পাবে লেখায়।

প্রথম প্রশ্ন: বোন ভাগে আসেন কি না

হিসাব শুরুর আগে দেখুন, মৃত ভাইয়ের নিচের কেউ জীবিত আছেন কি না:

  • ছেলে বা ছেলের ছেলে — থাকলে বোন কিছুই পান না।
  • বাবা — জীবিত থাকলে বোন কিছুই পান না।
  • দাদা — হানাফি মাযহাবে (ইমাম আবু হানিফার মত অনুযায়ী) দাদাও বাবার মতো ভাই-বোনকে বঞ্চিত করেন।

বাবা জীবিত থাকলে কী হয়, তা নিচের উদাহরণে দেখুন — দুই বোন থাকলেও পুরোটা বাবার।

এ বিষয়ে বিস্তারিত আছে বাবা বেঁচে থাকলে ভাই বোন কি সম্পত্তি পাবে লেখায়। উপরের কেউ না থাকলে তবেই বোনের অংশের হিসাব শুরু হয়।

বোনের অংশ — এক নজরে

নিচের সব হিসাবে ধরে নেওয়া হয়েছে, মৃত ভাইয়ের ছেলে, ছেলের ছেলে, বাবা ও দাদা কেউ নেই, এবং ভাগযোগ্য সম্পত্তি ৬০ লাখ টাকা।

ওয়ারিশবোন(রা) মোট পানকী হিসেবে৬০ লাখ টাকায় বোনের ভাগ
শুধু এক বোনপুরো সম্পত্তি১/২ নির্দিষ্ট + বাকিটা রদ৬০,০০,০০০
শুধু দুই বোনপুরো সম্পত্তি২/৩ নির্দিষ্ট + বাকিটা রদপ্রত্যেকে ৩০,০০,০০০
এক ভাই ও এক বোন১/৩ভাইয়ের সঙ্গে অবশিষ্ট, ২ঃ১২০,০০,০০০
এক মেয়ে ও এক বোন১/২মেয়ের অংশের পর অবশিষ্ট৩০,০০,০০০
মা ও এক বোন৩/৫১/২ নির্দিষ্ট, রদে বেড়ে৩৬,০০,০০০
স্ত্রী ও দুই বোন৩/৪২/৩ নির্দিষ্ট, রদে বেড়েপ্রত্যেকে ২২,৫০,০০০

প্রতিটি সারির ভগ্নাংশ সাইটের ক্যালকুলেটরে মিলিয়ে দেখা। তৃতীয় কলামটিই আসল কথা — একই বোন কখনো নির্দিষ্ট অংশ, কখনো অবশিষ্টের ভাগ পান।

বোন একা বা কয়েকজন হলে

সূরা নিসার শেষ আয়াতে (৪:১৭৬) বলা হয়েছে, সন্তানহীন কোনো পুরুষ মারা গেলে তাঁর এক বোন থাকলে বোন পাবেন অর্ধেক; দুই বোন থাকলে দুজন মিলে দুই-তৃতীয়াংশ। তিন, চার বা আরও বেশি বোন হলেও মোট অংশ ২/৩-ই থাকে, শুধু বোনেরা সমান ভাগে ভাগ করে নেন।

কিন্তু ভাগ্যক্রমে অবশিষ্ট নেওয়ার মতো আর কেউ না থাকলে বাকি অংশ কোথায় যাবে? হানাফি মাযহাবে সেটি নির্দিষ্ট অংশধারীদের কাছেই ফিরে আসে — এর নাম রদ। ফলে একমাত্র বোন শেষ পর্যন্ত পুরো সম্পত্তিই পান।

রদ কীভাবে কাজ করে, তা বিস্তারিত আছে রদ কী — অবশিষ্ট সম্পত্তি কোথায় যায় লেখায়।

ভাই থাকলে: বোন আর নির্দিষ্ট অংশ পান না

মৃত ব্যক্তির ভাই ও বোন দুজনই জীবিত থাকলে বোন তাঁর ১/২ বা ২/৩ পান না। তখন ভাই-বোন মিলে অবশিষ্টভোগী হন, আর ভাগ হয় ভাই দুই ভাগ, বোন এক ভাগ হারে — একই আয়াতের নির্দেশনা অনুযায়ী।

এর ফলে একটি বিষয় অনেককে অবাক করে: একা থাকলে যে বোন পুরোটা পেতেন, একজন ভাই যোগ হওয়ায় তিনি পান এক-তৃতীয়াংশ। ভাই তাঁকে বঞ্চিত করেননি, কিন্তু তাঁর অবস্থান বদলে দিয়েছেন।

মৃত ভাইয়ের মেয়ে থাকলে

ভাইয়ের ছেলে না থাকলেও মেয়ে থাকতে পারেন। তখন বোন নিজের নির্দিষ্ট অংশ পান না, আবার বঞ্চিতও হন না — মেয়ের অংশ দেওয়ার পর যা থাকে, তা বোনের। সহিহ বুখারির ৬৭৩৬ নম্বর হাদিসে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এক মেয়ে, ছেলের মেয়ে ও বোনের মধ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ফয়সালা বর্ণনা করেছেন — বোন পেয়েছিলেন অবশিষ্ট।

এই অবস্থায় বোন এতটা শক্ত অবস্থানে থাকেন যে মৃতের ভাতিজা বা চাচাও তখন কিছু পান না। এক মেয়ে ও বোনের হিসাবের খুঁটিনাটি আছে এক কন্যা ও সহোদর বোন ওয়ারিশ হলে লেখায়, আর দুই মেয়ের ক্ষেত্রে দুই কন্যা ও সহোদর বোন থাকলে লেখায়।

ভাইয়ের স্ত্রী বা মা জীবিত থাকলে

মৃত ভাইয়ের স্ত্রী ও মা বোনকে বঞ্চিত করেন না; তাঁরা নিজেদের অংশ নেন, বোনও নেন। ধরুন মৃত ভাইয়ের স্ত্রী ও দুই বোন আছেন। সন্তান না থাকায় স্ত্রী ১/৪, দুই বোন ২/৩ — যোগফল এক থেকে সামান্য কম। বাকি অংশ স্ত্রীর কাছে ফেরে না (স্বামী-স্ত্রী রদ পান না), যায় বোনদের কাছে। ফলে বোনেরা মিলে ৩/৪।

মা থাকলে একইভাবে মা ও বোন দুজনের মধ্যে রদ হয়; এক বোন ও মায়ের ক্ষেত্রে বোন পান ৩/৫, মা ২/৫। তবে দুই বা তার বেশি ভাই-বোন থাকলে মায়ের নিজের অংশ ১/৩ থেকে কমে ১/৬ হয় — এটি মনে রাখবেন।

বোনের অংশ কি ভাই দিয়ে দিতে পারেন না?

বাংলাদেশে অনেক পরিবারে মৃত ভাইয়ের সম্পত্তি জীবিত ভাইয়েরাই ভোগ করেন, বোনদের “ভাগ চাইতে নেই” বলে ধরে নেওয়া হয়। ফারায়েজে এর কোনো ভিত্তি নেই — উপরের যেকোনো অবস্থায় বোনের অংশ তাঁর মালিকানা। তিনি নিজে স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিতে পারেন, কিন্তু না জানিয়ে বা চাপে রেখে নেওয়া যায় না। ওয়ারিশদের মধ্যে এ নিয়ে বিরোধ হলে দেখুন ওয়ারিশদের মধ্যে বিরোধ হলে কী করবেন।

যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়

  • ভুল ১ — বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় মৃত ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনদের ভাগ দেওয়া। বাবা থাকলে ভাই-বোন কেউ পান না।
  • ভুল ২ — ভাই থাকা সত্ত্বেও বোনকে ১/২ দেওয়া। ভাই থাকলে বোন ২ঃ১ হারে অবশিষ্ট পান।
  • ভুল ৩ — মৃতের মেয়ে থাকলে বোনকে বাদ দিয়ে ভাতিজা বা চাচাকে অবশিষ্ট দেওয়া। মেয়ের সঙ্গে বোনই অবশিষ্ট নেন।
  • ভুল ৪ — বাড়তি অংশ স্ত্রীকে ফেরত দেওয়া। রদ হয় স্বামী-স্ত্রী ছাড়া অন্য নির্দিষ্ট অংশধারীদের মধ্যে।
  • ভুল ৫ — আপন বোন আর সৎ বোনকে একই হারে ধরা। বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় বোনের নিয়ম আলাদা।
  • ভুল ৬ — চার বোন হলে প্রত্যেকে ১/২ বা মোট দ্বিগুণ ধরা। দুই বা তার বেশি বোনের মোট নির্দিষ্ট অংশ ২/৩-ই।

মৃত ভাইয়ের ওয়ারিশ তালিকা বসিয়ে দেখুন

স্ত্রী, মা, মেয়ে, ভাই-বোন — কে জীবিত আছেন তা দিলেই বোনের অংশ টাকায় দেখে নিতে পারবেন।

উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটরে হিসাব করুন →

প্রাথমিক সূত্র

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

ভাইয়ের বাবা, দাদা, স্ত্রী বা অন্য কোনো ওয়ারিশ না থাকলে বোন নির্দিষ্ট অংশ ১/২ পান, আর বাকিটা রদের নিয়মে তাঁর কাছেই ফেরে — ফলে পুরো সম্পত্তি তাঁর।
না। মৃত ব্যক্তির বাবা জীবিত থাকলে তাঁর ভাই-বোন কেউই অংশ পান না। হানাফি মাযহাবে দাদাও একইভাবে ভাই-বোনকে বঞ্চিত করেন।
তখন বোন নির্দিষ্ট অংশ পান না; ভাই-বোন মিলে অবশিষ্ট নেন, প্রত্যেক ভাই দুই ভাগ ও প্রত্যেক বোন এক ভাগ হারে।
না। দুই বা তার বেশি বোনের মোট নির্দিষ্ট অংশ ২/৩; সেটি তাঁরা সমান ভাগে ভাগ করেন। অবশিষ্ট নেওয়ার কেউ না থাকলে রদে বোনদের মোট অংশ বাড়তে পারে।
না। মেয়ে থাকলে বোন নির্দিষ্ট অংশ পান না, কিন্তু মেয়ের অংশ দেওয়ার পর অবশিষ্ট পান। এক মেয়ে থাকলে সাধারণত বোনের ভাগ ১/২ দাঁড়ায়।
স্ত্রী আগে নিজের অংশ নেন — সন্তান না থাকলে ১/৪। বাকিটা থেকে বোন পান। বাড়তি কিছু থাকলে তা স্ত্রী নয়, বোন রদ হিসেবে পান।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখার হিসাব হানাফি ফারায়েজ নীতির সাধারণ ব্যাখ্যা। বাস্তব বণ্টনের আগে ওয়ারিশের পূর্ণ তালিকা, ঋণ ও ওসিয়ত যাচাই করে নিন।