ইসলামী উত্তরাধিকারের নিয়মগুলো কোথা থেকে এসেছে — এই প্রশ্নের উত্তর মূলত সূরা আন-নিসার কয়েকটি আয়াতে। বিশেষ ব্যাপার হলো, ইবাদত ছাড়া আর কোনো বিষয়ে কোরআন এত বিস্তারিতভাবে সংখ্যা ও ভগ্নাংশ উল্লেখ করেনি। নামাজের রাকাত সংখ্যা কোরআনে নেই, কিন্তু কে কত ভাগ সম্পত্তি পাবেন তা আছে।
এই লেখায় প্রাসঙ্গিক আয়াতগুলো এক জায়গায় — কোন আয়াতে কী বিধান, সে কথাটি সহজ ভাষায়। মনে রাখবেন, আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যায় বিস্তারিত জানতে নির্ভরযোগ্য তাফসির ও আলেমের সাহায্য নেওয়াই নিরাপদ।
সূরা আন-নিসা, আয়াত ৭ — অধিকারের ঘোষণা
এটি কোনো ভগ্নাংশের আয়াত নয়, এটি নীতির আয়াত। এখানে বলা হয়েছে — পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়রা যা রেখে যান তাতে পুরুষদের অংশ আছে, এবং নারীদেরও অংশ আছে; সম্পত্তি কম হোক বা বেশি হোক, সেই অংশ নির্ধারিত।
আয়াতটির গুরুত্ব বুঝতে হলে প্রেক্ষাপট জানা দরকার। তৎকালীন আরবে নারী ও শিশুরা সাধারণত উত্তরাধিকার পেতেন না — সম্পত্তি যেত যুদ্ধ করতে সক্ষম পুরুষদের কাছে। এই আয়াত সেই প্রথাকে সরাসরি বাতিল করে দেয়।
আয়াত ১১ — সন্তান ও পিতা-মাতার অংশ
উত্তরাধিকারের সবচেয়ে বিস্তারিত আয়াত এটিই। এখানে যা নির্ধারিত হয়েছে:
| ওয়ারিশ | অবস্থা | অংশ |
|---|---|---|
| সন্তান | ছেলে ও মেয়ে উভয়ে আছেন | ছেলে মেয়ের দ্বিগুণ |
| মেয়ে | দুই বা তার বেশি, ছেলে নেই | সবাই মিলে দুই-তৃতীয়াংশ |
| মেয়ে | একজন, ছেলে নেই | অর্ধেক |
| পিতা ও মাতা | মৃত ব্যক্তির সন্তান আছে | প্রত্যেকে এক-ষষ্ঠাংশ |
| মাতা | সন্তান নেই, পিতা-মাতাই ওয়ারিশ | এক-তৃতীয়াংশ |
| মাতা | মৃত ব্যক্তির ভাই-বোন আছে | এক-ষষ্ঠাংশ |
আয়াতটি শেষ হয় একটি শর্ত দিয়ে — এই বণ্টন হবে ওসিয়ত কার্যকর ও ঋণ পরিশোধের পর।
আয়াতের একটি বাক্য বিশেষভাবে লক্ষণীয় — তোমাদের পিতা-মাতা ও সন্তানদের মধ্যে কে তোমাদের জন্য অধিক উপকারী, তা তোমরা জানো না। এই বাক্যটি বুঝিয়ে দেয় যে অংশগুলো মানুষের বিচার-বিবেচনার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি, নির্ধারিত করে দেওয়া হয়েছে।
আয়াত ১২ — স্বামী-স্ত্রী ও বৈপিত্রেয় ভাই-বোন
| ওয়ারিশ | অবস্থা | অংশ |
|---|---|---|
| স্বামী | মৃত স্ত্রীর সন্তান নেই | অর্ধেক |
| স্বামী | মৃত স্ত্রীর সন্তান আছে | এক-চতুর্থাংশ |
| স্ত্রী | মৃত স্বামীর সন্তান নেই | এক-চতুর্থাংশ |
| স্ত্রী | মৃত স্বামীর সন্তান আছে | এক-অষ্টমাংশ |
| বৈপিত্রেয় ভাই বা বোন | সন্তান ও পিতা কেউ নেই, একজন | এক-ষষ্ঠাংশ |
| বৈপিত্রেয় ভাই-বোন | একাধিক | সবাই মিলে এক-তৃতীয়াংশ |
স্ত্রী একাধিক হলেও তাঁদের মোট অংশ বাড়ে না — উপরের ভগ্নাংশটিই সবাই ভাগ করে নেন।
এই আয়াতের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, বৈপিত্রেয় ভাই ও বোনের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের পার্থক্য করা হয়নি — দুজনেই সমান পান। ২ঃ১ অনুপাত সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, এটি তার একটি স্পষ্ট প্রমাণ।
আয়াত ১৩ ও ১৪ — সীমা লঙ্ঘনের পরিণাম
উত্তরাধিকারের বিধানগুলো দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বলা হয়েছে, এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। যাঁরা এই সীমা মেনে চলবেন তাঁদের জন্য জান্নাতের প্রতিশ্রুতি, আর যাঁরা লঙ্ঘন করবেন তাঁদের জন্য কঠোর পরিণামের কথা।
ফিকহের দৃষ্টিতে এই দুটি আয়াত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো উত্তরাধিকারের বণ্টনকে নিছক পারিবারিক ব্যবস্থাপনার বিষয় থেকে তুলে এনে ধর্মীয় দায়িত্বে পরিণত করে। কাউকে তাঁর প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত করা এখানে কেবল অন্যায় নয়, সীমা লঙ্ঘন।
আয়াত ১৭৬ — কালালা ও বোনের অংশ
সূরা আন-নিসার একদম শেষ আয়াত এটি, আর এটি একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতির জন্য — যাকে বলা হয় কালালা, অর্থাৎ যে ব্যক্তি সন্তান ও পিতা-মাতা কাউকে রেখে যাননি।
| অবস্থা | অংশ |
|---|---|
| এক সহোদর বোন | অর্ধেক |
| দুই বা তার বেশি বোন | সবাই মিলে দুই-তৃতীয়াংশ |
| ভাই ও বোন একসাথে | ভাই বোনের দ্বিগুণ |
| শুধু ভাই (বোনের সম্পত্তিতে) | সম্পূর্ণ, যদি বোনের সন্তান না থাকে |
আয়াত ১২-তে বৈপিত্রেয় ভাই-বোনের কথা বলা হয়েছিল, আর এখানে সহোদর ও বৈমাত্রেয় ভাই-বোনের। দুটি আলাদা আয়াত, দুটি আলাদা বিধান — গুলিয়ে ফেললে হিসাব ভুল হয়।
আয়াতগুলো এক নজরে
| আয়াত | মূল বিষয় |
|---|---|
| ৪ঃ৭ | নারী-পুরুষ উভয়ের নির্ধারিত অংশের ঘোষণা |
| ৪ঃ১১ | সন্তান ও পিতা-মাতার অংশ |
| ৪ঃ১২ | স্বামী-স্ত্রী ও বৈপিত্রেয় ভাই-বোনের অংশ |
| ৪ঃ১৩–১৪ | এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা |
| ৪ঃ১৭৬ | কালালা — সহোদর ভাই-বোনের অংশ |
কোরআনে যা নেই, ফিকহ যেখানে এসেছে
কোরআনে মূল ভগ্নাংশগুলো আছে, কিন্তু সব পরিস্থিতির সমাধান আয়াতে সরাসরি নেই। যেমন — নির্দিষ্ট অংশগুলো যোগ করলে যদি ১-এর বেশি হয়ে যায়, তখন কী হবে? কিংবা যোগফল ১-এর কম হলে অবশিষ্টটুকু কে পাবেন?
এই প্রশ্নগুলোর সমাধান এসেছে সাহাবিদের ইজতিহাদ ও পরবর্তী ফিকহি আলোচনা থেকে — যেখান থেকে আউল ও রদ নীতি দুটি এসেছে। এগুলো কোরআনের বিধানের বিকল্প নয়, বরং সেই বিধান বাস্তবে প্রয়োগ করার পদ্ধতি।
বাংলাদেশের আইনে বিশেষ বিধান
কোরআনের বিধানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের একটি পার্থক্য মনে রাখা দরকার। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৪ ধারা অনুযায়ী, বাবা-মায়ের আগে মারা যাওয়া সন্তানের সন্তানরাও অংশ পান। এটি একটি আইনি সংযোজন, কোরআনের কোনো আয়াতের সরাসরি নির্দেশ নয় — এবং এ নিয়ে ফিকহি মতভেদও আছে।
তাই কোনো নির্দিষ্ট পরিবারের হিসাব করার সময় দুটি প্রশ্ন আলাদা করে করতে হয় — ক্লাসিক ফারায়েজে কী হতো, আর বাংলাদেশের আইনে কী হবে।
আপনার নিজের পরিবারের হিসাব করুন
ওয়ারিশদের নাম ও সম্পদের পরিমাণ দিন — মুহূর্তেই পাবেন বিস্তারিত বণ্টন তালিকা, হিসাবের ধাপ এবং প্রিন্টযোগ্য রিপোর্ট।
ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →