মফস্বলে এমন দৃশ্য খুব চেনা: নিঃসন্তান চাচা মারা গেছেন, ভাইয়ের ছেলেরা জমির ভাগ বুঝে নিচ্ছেন, আর একই ভাইয়ের মেয়েরা — যাঁরা হয়তো চাচার শেষ দিনগুলোতে সেবা করেছেন — কোনো ভাগই পাচ্ছেন না। অনেকের কাছে এটি অন্যায় মনে হয়, কেউ কেউ ধরে নেন এটি নিছক গ্রামের প্রথা।

আসলে এটি হানাফি ফারায়েজেরই হিসাব। তবে এর পেছনের যুক্তি এবং সীমা — দুটোই জানা দরকার, কারণ একই যুক্তিতে কখনো কখনো ভাতিজিও ওয়ারিশ হন।

ভাতিজা আর ভাতিজির পার্থক্য কোথায়

সহিহ বুখারির ৬৭৩২ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: নির্ধারিত অংশগুলো হকদারদের দাও, যা বাকি থাকে তা নিকটতম পুরুষ আত্মীয়ের। এই “অবশিষ্টভোগী” (আসাবা) শ্রেণিতে আছেন মৃত ব্যক্তির সঙ্গে শুধু পুরুষদের মাধ্যমে যুক্ত পুরুষ আত্মীয়রা — ছেলে, বাবা, দাদা, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, চাচা, চাচাতো ভাই — নিকটতার ক্রমে।

ভাতিজি ভাইয়ের মাধ্যমে যুক্ত, কিন্তু নিজে নারী; আর কুরআন যে নারীদের নির্দিষ্ট অংশ দিয়েছে — মেয়ে, ছেলের মেয়ে, বোন, মা, দাদি-নানি, স্ত্রী — ভাতিজি তাঁদের মধ্যে নেই। তাই তিনি নির্দিষ্ট অংশধারীও নন, অবশিষ্টভোগীও নন। ফারায়েজে এমন আত্মীয়দের বলা হয় জাবিল আরহাম।

আত্মীয়শ্রেণিকেন
ভাতিজা (ভাইয়ের ছেলে)অবশিষ্টভোগীপুরুষ, এবং সংযোগও পুরুষ (ভাই) দিয়ে
ভাতিজি (ভাইয়ের মেয়ে)জাবিল আরহামনিজে নারী, এবং নির্দিষ্ট অংশধারীর তালিকায় নেই
ভাগ্নে (বোনের ছেলে)জাবিল আরহামপুরুষ হলেও সংযোগ নারী (বোন) দিয়ে
ভাগ্নি (বোনের মেয়ে)জাবিল আরহামনারী, সংযোগও নারী দিয়ে
চাচাতো ভাইঅবশিষ্টভোগীপুরুষ, সংযোগ পুরুষ দিয়ে (চাচা, দাদা)
চাচাতো বোনজাবিল আরহামনিজে নারী

ভাগ্নের ব্যাপারটি লক্ষ করুন — পুরুষ হওয়াই যথেষ্ট নয়, সংযোগের পথও পুরুষ হতে হয়।

ভাই-বোন আর ভাতিজা-ভাতিজির পার্থক্য: মৃতের ভাই ও বোন একসঙ্গে থাকলে ভাই বোনকে সঙ্গে নিয়ে ২ঃ১ হারে অবশিষ্ট নেন। কিন্তু ভাতিজা তাঁর বোন অর্থাৎ ভাতিজিকে এভাবে সঙ্গে নেন না — এই সুবিধা শুধু মেয়ে, ছেলের মেয়ে ও বোনের জন্য। তাই একই পরিবারে ভাতিজা পুরোটা পান, তাঁর বোন কিছুই পান না।

হিসাবে কেমন দেখায়

ধরুন একজন নিঃসন্তান ব্যক্তি মারা গেছেন। তাঁর বাবা-মা, দাদা-দাদি, ভাই বা বোন কেউ জীবিত নেই; আছেন স্ত্রী, প্রয়াত ভাইয়ের দুই ছেলে এবং সেই ভাইয়ের দুই মেয়ে। সন্তান না থাকায় স্ত্রী পাবেন ১/৪; বাকি ৩/৪ দুই ভাতিজার মধ্যে সমান ভাগে। ভাতিজিরা ওয়ারিশ-তালিকায় আসেন না — তাই ক্যালকুলেটরেও তাঁদের বসানোর ঘর নেই।

৪০ লাখ টাকার সম্পত্তি হলে স্ত্রী ১০ লাখ এবং প্রত্যেক ভাতিজা ১৫ লাখ পাবেন।

এবার ধরুন মৃত ব্যক্তির এক মেয়ে আছে, আর আছে প্রয়াত ভাইয়ের এক ছেলে — এ ছাড়া কোনো ওয়ারিশ নেই। মেয়ে নির্দিষ্ট অংশ হিসেবে ১/২ পাবেন; বাকি ১/২ ভাতিজার।

এই দ্বিতীয় উদাহরণটি একটি সীমার উপর দাঁড়িয়ে: মৃত ব্যক্তির কোনো বোন থাকলে মেয়ের সঙ্গে থেকে তিনিই অবশিষ্ট নিতেন, ভাতিজা পেতেন না। মেয়ে ও বোনের এই হিসাব দেখুন এক কন্যা ও সহোদর বোন ওয়ারিশ হলে লেখায়।

ভাতিজা কখন নিজেও পান না

ভাতিজা অবশিষ্টভোগী হলেও তালিকার মাঝামাঝিতে আছেন। তাঁর আগে যাঁরা আসেন, তাঁদের কেউ থাকলে তিনি কিছু পান না:

  • মৃত ব্যক্তির ছেলে বা ছেলের ছেলে
  • বাবা বা দাদা
  • আপন ভাই — এবং বৈমাত্রেয় (বাবা একই, মা ভিন্ন) ভাই; অর্থাৎ আপন ভাতিজা থাকলেও জীবিত সৎ ভাই আগে পান
  • মেয়ের সঙ্গে থাকা বোন, যিনি তখন অবশিষ্টভোগী হন

আবার ভাতিজাদের মধ্যেও ক্রম আছে: আপন ভাইয়ের ছেলে বৈমাত্রেয় ভাইয়ের ছেলের আগে। পুরো অগ্রাধিকার-ক্রম আছে আসাবা কারা লেখায়, আর নিকটতর কারও কারণে বাদ পড়ার নিয়ম আছে হাজব — কে বঞ্চিত হন এবং কেন লেখায়।

চাচাতো ভাই পান, চাচাতো বোন পান না

একই যুক্তি চাচাতো ভাই-বোনের বেলায়ও। ধরুন মৃত ব্যক্তির ভাই বা ভাতিজা কেউ নেই, আছেন স্ত্রী ও আপন চাচার এক ছেলে; সেই চাচার এক মেয়েও জীবিত। স্ত্রী ১/৪, চাচাতো ভাই ৩/৪ — চাচাতো বোন কিছু পান না।

চাচা নিজে কখন পান, সেই উল্টো প্রশ্ন নিয়ে আছে চাচা ও চাচাতো ভাইয়ের অংশ লেখা।

নিঃসন্তান ফুফু বা মামা মারা গেলে

  • ফুফু মারা গেলে — তাঁর সন্তান ও বাবা না থাকলে, ভাই (আপনার বাবা) জীবিত থাকলে ভাই-ই অবশিষ্ট পান; ভাই না থাকলে ভাইয়ের ছেলে, অর্থাৎ আপনি। ফুফুর ভাতিজিরা এখানেও জাবিল আরহাম। স্বামী জীবিত থাকলে তিনি আগে নিজের অংশ পাবেন।
  • মামা মারা গেলে — আপনি তাঁর ভাগ্নে বা ভাগ্নি; সংযোগ আপনার মায়ের মাধ্যমে। তাই মামার কোনো অবশিষ্টভোগী, কিংবা স্বামী-স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো নির্দিষ্ট অংশধারী থাকলে আপনি পান না। মৃত বোনের সম্পত্তি কারা পান, তা আছে বোনের সম্পত্তি কে পাবে লেখায়।

ভাতিজি বা ভাগ্নে কখন ওয়ারিশ হন

জাবিল আরহাম মানে “কখনো পান না” নয়। হানাফি মাযহাবে মৃত ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রী ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট অংশধারী এবং কোনো অবশিষ্টভোগী না থাকলে সম্পত্তি সরকারি কোষাগারে যায় না — যায় এই দূরবর্তী আত্মীয়দের কাছে। তখন ভাতিজি, ভাগ্নে-ভাগ্নি বা চাচাতো বোনও ওয়ারিশ হতে পারেন। স্বামী বা স্ত্রী থাকলে আগে তাঁর নিজের অংশ দেওয়া হয়।

জাবিল আরহামের মধ্যে কে আগে, কে কত পাবেন — সেই হিসাবের নিয়ম আলাদা ও তুলনামূলক জটিল; সাইটের ক্যালকুলেটর এই শ্রেণির হিসাব করে না, তাই এখানে কোনো ভগ্নাংশ দেওয়া হলো না। শ্রেণিটির পরিচয় আছে জাবিল আরহাম — মামা, খালা ও ফুফু কি অংশ পান লেখায়; নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে একজন আলেমের কাছ থেকে হিসাব করিয়ে নিন।

যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়

  • ভুল ১ — ভাতিজার সঙ্গে ভাতিজিকে ২ঃ১ হারে অংশ দেওয়া, ছেলে-মেয়ের মতো। এটি শুধু সন্তান ও ভাই-বোনের ক্ষেত্রে খাটে।
  • ভুল ২ — ভাগ্নেকে ভাতিজার মতো অবশিষ্টভোগী ধরা। বোনের মাধ্যমে যুক্ত হওয়ায় তিনি জাবিল আরহাম।
  • ভুল ৩ — জীবিত বৈমাত্রেয় ভাইকে বাদ দিয়ে আপন ভাতিজাদের মধ্যে ভাগ করা। ভাই (বৈমাত্রেয় হলেও) ভাতিজার আগে।
  • ভুল ৪ — মেয়ে ও বোন দুজনই থাকলেও ভাতিজাকে অবশিষ্ট দেওয়া। সেখানে বোনই অবশিষ্ট নেন।
  • ভুল ৫ — ধরে নেওয়া যে ভাতিজি বা ভাগ্নে কোনো অবস্থাতেই পান না। নিকট ওয়ারিশ কেউ না থাকলে তাঁরাই ওয়ারিশ।
  • ভুল ৬ — সেবা বা দেখাশোনার কারণে ফারায়েজের অংশ বাড়ানো-কমানো। কাউকে বাড়তি দিতে চাইলে জীবদ্দশায় হেবা বা এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে ওসিয়তই বৈধ পথ।

চাচা বা ফুফুর ওয়ারিশ তালিকা মিলিয়ে নিন

স্ত্রী বা স্বামী, ভাই, সৎ ভাই, ভাতিজা — কে জীবিত আছেন, বসিয়ে দেখুন কে কত পান।

উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটরে হিসাব করুন →

প্রাথমিক সূত্র

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

সাধারণত না। ভাতিজি জাবিল আরহাম; ভাতিজা বা অন্য কোনো অবশিষ্টভোগী থাকলে তিনি কিছু পান না। স্বামী-স্ত্রী ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট অংশধারী ও অবশিষ্টভোগী না থাকলে তখন তিনি ওয়ারিশ হতে পারেন।
না। ২ঃ১ হারে ভাগ হয় ছেলে-মেয়ে, ছেলের ছেলে-মেয়ে ও ভাই-বোনের ক্ষেত্রে। ভাতিজা তাঁর বোনকে এভাবে সঙ্গে নেন না, তাই ভাতিজি কিছু পান না।
মামার ছেলে, বাবা, ভাই, ভাতিজা, চাচা বা অন্য কোনো অবশিষ্টভোগী, কিংবা স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো নির্দিষ্ট অংশধারী থাকলে ভাগ্নে পান না, কারণ তিনি মায়ের মাধ্যমে যুক্ত জাবিল আরহাম।
বৈমাত্রেয় (বাবা একই) ভাই জীবিত থাকলে তিনি আপন ভাতিজার আগে অবশিষ্ট পান, কারণ ভাই ভাতিজার চেয়ে নিকটতর। বৈপিত্রেয় (মা একই) ভাইয়ের নিয়ম আলাদা।
চাচাতো ভাই পুরুষ-সূত্রের পুরুষ আত্মীয়, তাই অবশিষ্টভোগী। চাচাতো বোন নারী এবং নির্দিষ্ট অংশধারীর তালিকায় নেই, তাই তিনি জাবিল আরহাম।
হ্যাঁ, পেতে পারেন। মেয়ে ১/২ (দুই বা বেশি হলে ২/৩) পাওয়ার পর অবশিষ্ট ভাতিজার — যদি মৃতের ছেলে, বাবা, দাদা, ভাই বা বোন জীবিত না থাকেন।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখার হিসাব হানাফি ফারায়েজ নীতির সাধারণ ব্যাখ্যা। বাস্তব বণ্টনের আগে ওয়ারিশের পূর্ণ তালিকা, ঋণ ও ওসিয়ত যাচাই করে নিন।