ফারায়েজ অনুযায়ী কে কতটুকু পাবেন সেটি হিসাব করে জেনে নেওয়া এক কাজ। সেই অধিকার সরকারি কাগজে প্রতিষ্ঠিত করা আরেক কাজ। দ্বিতীয় কাজটি শুরু হয় ওয়ারিশান সনদ দিয়ে — যেটি ছাড়া নামজারি, ব্যাংকের টাকা তোলা বা জমি হস্তান্তর কিছুই এগোয় না।
ওয়ারিশান সনদ আসলে কী
এটি স্থানীয় সরকারের দেওয়া একটি প্রত্যয়নপত্র, যেখানে লেখা থাকে — অমুক ব্যক্তি মারা গেছেন, এবং তাঁর ওয়ারিশ হিসেবে এই এই ব্যক্তিরা জীবিত আছেন। সঙ্গে সম্পর্ক (স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, মা প্রভৃতি) উল্লেখ থাকে।
কে দেন
| আপনি যেখানে থাকেন | যিনি দেন |
|---|---|
| ইউনিয়ন এলাকা | ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান |
| পৌরসভা এলাকা | পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলর |
| সিটি কর্পোরেশন এলাকা | সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলর |
| পার্বত্য জেলা | কিছু জেলায় জেলা প্রশাসনের আলাদা ব্যবস্থা আছে |
সাধারণত মৃত ব্যক্তির স্থায়ী ঠিকানা যেখানে, সেখানকার কার্যালয়ে আবেদন করতে হয়।
বর্তমানে সরকারের জাতীয় অনলাইন সনদ পোর্টাল prottoyon.gov.bd-এর মাধ্যমেও ওয়ারিশ সনদ ও উত্তরাধিকার সনদের আবেদন করা যায়। আপনার এলাকা এই ব্যবস্থার আওতায় এসেছে কি না, সেটি পোর্টালে বা স্থানীয় পরিষদ কার্যালয়ে জেনে নিন।
ধাপে ধাপে প্রক্রিয়া
- ধাপ ১ — মৃত ব্যক্তির মৃত্যুসনদ সংগ্রহ করুন। এটি না থাকলে প্রক্রিয়া শুরুই হয় না।
- ধাপ ২ — সব জীবিত ওয়ারিশের তালিকা তৈরি করুন, সম্পর্কসহ। কাউকে বাদ দিলে পরে সনদ বাতিল হতে পারে এবং সেটি ফৌজদারি অভিযোগেও গড়াতে পারে।
- ধাপ ৩ — আবেদন ফরম সংগ্রহ করে পূরণ করুন — পরিষদ কার্যালয় থেকে অথবা অনলাইনে।
- ধাপ ৪ — ফরমের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যুক্ত করুন এবং নির্ধারিত ফি জমা দিন।
- ধাপ ৫ — কার্যালয় থেকে যাচাই হবে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নেওয়া হয় বা প্রতিবেশীদের সাক্ষ্য নেওয়া হয়।
- ধাপ ৬ — যাচাই শেষে সনদ ইস্যু হয়। একাধিক কপি নিয়ে রাখুন — নামজারি, ব্যাংক ও অন্যান্য কাজে আলাদা আলাদা কপি লাগে।
সাধারণত যে কাগজগুলো চাওয়া হয়
তালিকা জায়গাভেদে ভিন্ন, তবে নিচের কাগজগুলো প্রায় সব জায়গাতেই লাগে। আবেদন করার আগে ফোন করে বা কার্যালয়ে গিয়ে নির্দিষ্ট তালিকাটি জেনে নেওয়াই ভালো:
- মৃত ব্যক্তির মৃত্যুসনদ
- মৃত ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি
- সব ওয়ারিশের জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধনের কপি
- আবেদনকারীর ছবি
- সম্পর্ক প্রমাণের কাগজ, যদি চাওয়া হয়
ওয়ারিশান সনদ বনাম সাকসেশন সার্টিফিকেট
বাংলায় দুটোকেই অনেকে “ওয়ারিশ সনদ” বলেন, কিন্তু এ দুটি সম্পূর্ণ আলাদা কাগজ — আলাদা কর্তৃপক্ষ, আলাদা উদ্দেশ্য, আলাদা আইনি ওজন।
| ওয়ারিশান সনদ | সাকসেশন সার্টিফিকেট | |
|---|---|---|
| কে দেন | ইউনিয়ন পরিষদ / পৌরসভা / কাউন্সিলর | আদালত |
| কী প্রমাণ করে | কারা ওয়ারিশ | নির্দিষ্ট দাবি আদায়ের আইনি অধিকার |
| মূলত কোন কাজে | নামজারি, সাধারণ প্রশাসনিক কাজ | ব্যাংক, শেয়ার, বীমা, সিকিউরিটিজ |
| সময় ও খরচ | তুলনামূলক কম | বেশি — আদালতের প্রক্রিয়া |
| চ্যালেঞ্জ করা যায়? | হ্যাঁ, তুলনামূলক সহজে | আদালতের আদেশ, ওজন বেশি |
বিরোধপূর্ণ সম্পত্তি বা বড় অঙ্কের ব্যাংক দাবির ক্ষেত্রে অনেক প্রতিষ্ঠান ইউপি সনদ নেয় না, আদালতের সার্টিফিকেট চায়।
যে ভুলগুলো পরে বড় সমস্যা তৈরি করে
- কোনো ওয়ারিশের নাম বাদ দেওয়া। ইচ্ছাকৃত হোক বা ভুলে — সনদ বাতিল হতে পারে, আর ভুক্তভোগী মামলা করতে পারেন।
- মেয়েদের নাম না তোলা। বাংলাদেশে এটি বহুল প্রচলিত, কিন্তু আইনত ও শরিয়তে দুই দিক থেকেই অন্যায়। পরে নামজারিও আটকে যায়।
- আগে মারা যাওয়া সন্তানের সন্তানদের বাদ দেওয়া। বাংলাদেশে ধারা ৪ অনুযায়ী তাঁরাও অংশ পান — নিচে বিস্তারিত।
- সনদকেই বণ্টনের দলিল ভাবা। সনদ শুধু বলে কারা ওয়ারিশ; জমি ভাগ করতে নামজারি ও প্রয়োজনে বণ্টননামা দলিল লাগে।
বাংলাদেশের আইনে বিশেষ বিধান
ওয়ারিশের তালিকা তৈরির সময় একটি প্রশ্ন আলাদা করে করতে হয় — মৃত ব্যক্তির কোনো ছেলে বা মেয়ে কি তাঁর আগেই মারা গেছেন? উত্তর হ্যাঁ হলে তাঁদের সন্তানরাও তালিকায় আসবেন।
১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের (Ordinance No. VIII of 1961) ৪ ধারায় বলা হয়েছে — উত্তরাধিকার উন্মুক্ত হওয়ার আগে মৃত ব্যক্তির কোনো ছেলে বা মেয়ে মারা গেলে, তাঁদের সন্তানরা (যাঁরা উত্তরাধিকার উন্মুক্ত হওয়ার সময় জীবিত আছেন) per stirpes ভিত্তিতে ওই অংশ পাবেন, যা তাঁদের বাবা বা মা জীবিত থাকলে পেতেন।
অর্থাৎ ক্লাসিক ফারায়েজে তাঁরা বাদ পড়তেন, কিন্তু বাংলাদেশের আইনে পান। ধারাটির প্রয়োগ ও হিসাব নিয়ে বিস্তারিত আছে এতিম নাতি-নাতনির অংশ লেখায়।
আপনার নিজের পরিবারের হিসাব করুন
ওয়ারিশদের নাম ও সম্পদের পরিমাণ দিন — মুহূর্তেই পাবেন বিস্তারিত বণ্টন তালিকা, হিসাবের ধাপ এবং প্রিন্টযোগ্য রিপোর্ট।
ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →