ওয়াক্‌ফ করা সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ হয় না — এই একটি বাক্যেই বিষয়টির মূল কথা। কারণ বৈধ ওয়াক্‌ফের পর সম্পত্তিটি আর কারো ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকে না। কিন্তু “কখন ওয়াক্‌ফ করা হলো” — এই প্রশ্নটির উত্তরই নির্ধারণ করে কতটুকু ওয়াক্‌ফ বৈধ হবে।

ওয়াক্‌ফ আসলে কী করে

ওয়াক্‌ফ মানে সম্পত্তি স্থায়ীভাবে আল্লাহর নামে ধর্মীয় বা জনহিতকর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা। এর ফলে মালিকানা ব্যক্তির হাত থেকে সরে যায় — সম্পত্তিটি আর বিক্রি, দান বা উত্তরাধিকারের বিষয় নয়। শুধু তার আয় বা উপকার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়।
হেবাওয়াক্‌ফ
মালিকানা যায়নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তির কাছেকারো ব্যক্তিগত মালিকানায় নয়
পরে বিক্রিগ্রহীতা করতে পারেনসাধারণত করা যায় না
উত্তরাধিকারগ্রহীতার মৃত্যুতে তাঁর ওয়ারিশরা পানপ্রশ্নই ওঠে না
উদ্দেশ্যযেকোনোধর্মীয় বা জনহিতকর

দুটিই সম্পত্তিকে তরিকার বাইরে নিয়ে যায়, কিন্তু পথ ও ফল আলাদা।

জীবিত অবস্থায় ওয়াক্‌ফ — সীমা নেই

মালিক জীবিত থাকতে নিজের সম্পত্তি যতটুকু চান ওয়াক্‌ফ করতে পারেন — এমনকি পুরোটাই। হেবার মতোই এখানেও পরিমাণের কোনো শরিয়াহ সীমা নেই, কারণ মালিক তাঁর নিজের সম্পত্তি নিয়েই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

মৃত্যুর পর কার্যকর ওয়াক্‌ফ — এক-তৃতীয়াংশের সীমা

ওসিয়তের মাধ্যমে ওয়াক্‌ফ করলে ওসিয়তের সীমাই প্রযোজ্য হয় — অর্থাৎ সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ। এর বেশি ওয়াক্‌ফ করতে চাইলে ওয়ারিশদের সম্মতি লাগবে। একইভাবে মৃত্যুশয্যায় করা ওয়াক্‌ফও ফিকহে ওসিয়তের নিয়মে বিবেচিত হয়।
কখন করা হলোসীমা
জীবিত অবস্থায়, সুস্থ থাকতেসীমা নেই — পুরো সম্পত্তিও সম্ভব
ওসিয়তের মাধ্যমে, মৃত্যুর পর কার্যকরসর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ
মৃত্যুশয্যায়ওসিয়তের নিয়মে — এক-তৃতীয়াংশ

এই একটি পার্থক্যই বহু পারিবারিক বিরোধের কারণ।

ওয়ারিশদের বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে ওয়াক্‌ফ

ওয়াক্‌ফ একটি পুণ্যের কাজ — কিন্তু ওয়ারিশদের, বিশেষ করে মেয়েদের, অধিকার থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে ওয়াক্‌ফ করা প্রশ্নবিদ্ধ। মৃত্যুর ঠিক আগে পুরো সম্পত্তি ওয়াক্‌ফ করে দেওয়া হলে সেটি মৃত্যুশয্যার বিবেচনায় চ্যালেঞ্জযোগ্য হতে পারে। উদ্দেশ্য ও সময় দুটোই গুরুত্বপূর্ণ।

পারিবারিক ওয়াক্‌ফ — ওয়াক্‌ফ আল-আওলাদ

ওয়াক্‌ফের একটি ধরন আছে যেখানে আয়ের একটি অংশ ওয়াক্‌ফকারীর নিজের বংশধরদের জন্য নির্দিষ্ট থাকে, আর শেষে সেটি ধর্মীয় বা জনহিতকর কাজে যায় — এটিকে বলা হয় ওয়াক্‌ফ আল-আওলাদ। এতে সম্পত্তি এক জায়গায় থেকে যায় এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভাগ হয়ে ছোট হয়ে যায় না।

পারিবারিক ওয়াক্‌ফ কীভাবে করতে হবে, তার বৈধতার শর্ত, এবং বাংলাদেশে এর আইনি স্বীকৃতির বর্তমান অবস্থা — এই পাতায় সেসব দেওয়া হচ্ছে না, কারণ এগুলো এখানে যাচাই করা যায়নি এবং বিষয়টি জটিল। এই পথে যেতে চাইলে আলেম ও আইনজীবীর সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিন।

বাংলাদেশে ওয়াক্‌ফের আইনি দিক

বাংলাদেশে ওয়াক্‌ফ সম্পত্তির প্রশাসন ও তালিকাভুক্তির জন্য আলাদা আইনি ব্যবস্থা ও একটি সরকারি কার্যালয় আছে — ওয়াক্‌ফ প্রশাসকের কার্যালয়। ওয়াক্‌ফ করা সম্পত্তির নিবন্ধন ও তদারকি এই ব্যবস্থার আওতায় পড়ে।

এছাড়া রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮-এর ধারা ১৭-এর দফা (খ) অনুযায়ী রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক সেসব দস্তাবেজের জন্য যেগুলো স্থাবর সম্পত্তিতে কোনো অধিকার, স্বত্ব বা স্বার্থ “create, declare, assign, limit or extinguish” করে। স্থাবর সম্পত্তির ওয়াক্‌ফনামা এই বিবরণের আওতায় আসে।

ওয়াক্‌ফ আইনের ধারা নম্বর, নিবন্ধনের নির্দিষ্ট শর্ত, ফি বা সময়সীমা এখানে দেওয়া হচ্ছে না — এগুলো এই লেখায় যাচাই করা যায়নি। ওয়াক্‌ফ করার আগে ওয়াক্‌ফ প্রশাসকের কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে বর্তমান প্রয়োজনীয়তা নিশ্চিত করে নিন, এবং আইনজীবীর মাধ্যমে দস্তাবেজ তৈরি করুন।

ওয়াক্‌ফ করা সম্পত্তি তরিকার বাইরে

বণ্টনের হিসাব করার সময় মনে রাখতে হবে — বৈধভাবে ওয়াক্‌ফ করা সম্পত্তি তরিকার অংশ নয়। মোট সম্পত্তি থেকে সেটি বাদ দিয়ে বাকি অংশের উপর ফারায়েজের হিসাব করতে হয়। দাফন-কাফনের খরচ, ঋণ ও ওসিয়ত বাদ দেওয়ার নিয়মটিও একইভাবে প্রযোজ্য।

বিরোধ হলে যা দেখা হয়

  • ওয়াক্‌ফনামা আছে কি না এবং তা নিবন্ধিত কি না।
  • কখন করা হয়েছিল — সুস্থ অবস্থায় জীবিত থাকতে, নাকি মৃত্যুর কাছাকাছি।
  • দখল ও ব্যবস্থাপনা বাস্তবে ওয়াক্‌ফের উদ্দেশ্যে হস্তান্তরিত হয়েছিল কি না।
  • ওয়াক্‌ফ প্রশাসকের কার্যালয়ে তালিকাভুক্ত কি না।
  • উদ্দেশ্য ধর্মীয় বা জনহিতকর ছিল কি না।

যেখানে সবচেয়ে বেশি ভুল হয়

  • ভুল ১ — ওসিয়তের মাধ্যমে এক-তৃতীয়াংশের বেশি ওয়াক্‌ফ করা। ওয়ারিশদের সম্মতি ছাড়া তা কার্যকর হয় না।
  • ভুল ২ — মৌখিকভাবে ওয়াক্‌ফ করে কোনো দস্তাবেজ না করা। পরে প্রমাণ করার কিছু থাকে না।
  • ভুল ৩ — ওয়াক্‌ফনামা করে নিবন্ধন ও তালিকাভুক্তি না করানো।
  • ভুল ৪ — ওয়াক্‌ফ করা সম্পত্তিকে তরিকার সঙ্গে যোগ করে ভাগ করা। সেটি আর মৃতের সম্পত্তি নয়।
  • ভুল ৫ — ওয়ারিশদের বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে মৃত্যুর ঠিক আগে ওয়াক্‌ফ করা। এটি চ্যালেঞ্জযোগ্য এবং শরিয়াহর দৃষ্টিতেও প্রশ্নবিদ্ধ।
  • ভুল ৬ — ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি বিক্রি বা বন্ধক দেওয়ার চেষ্টা করা।

ওয়াক্‌ফ বাদ দিয়ে বাকি অংশ হিসাব করুন

বৈধভাবে ওয়াক্‌ফ করা সম্পত্তি বাদ দিয়ে অবশিষ্ট পরিমাণটি বসান — তার উপরেই ফারায়েজের হিসাব হবে।

ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

না। বৈধ ওয়াক্‌ফের পর সম্পত্তিটি আর কারো ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকে না, তাই উত্তরাধিকারের প্রশ্নই ওঠে না। বণ্টনের হিসাবে সেটি বাদ দিয়ে বাকি অংশ ধরতে হয়।
জীবিত অবস্থায় সুস্থ থাকতে করলে সীমা নেই — পুরোটাও সম্ভব। কিন্তু ওসিয়তের মাধ্যমে বা মৃত্যুশয্যায় করলে ওসিয়তের সীমাই প্রযোজ্য, অর্থাৎ সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ; এর বেশি হলে ওয়ারিশদের সম্মতি লাগে।
হেবায় মালিকানা নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তির কাছে যায় এবং তিনি পরে সেটি বিক্রি বা হস্তান্তর করতে পারেন, আর তাঁর মৃত্যুতে তা তাঁর ওয়ারিশরা পান। ওয়াক্‌ফে সম্পত্তি কারো ব্যক্তিগত মালিকানায় যায় না — শুধু তার আয় বা উপকার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়।
রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮-এর ধারা ১৭-এর দফা (খ) অনুযায়ী স্থাবর সম্পত্তিতে অধিকার সৃষ্টি, ঘোষণা বা বিলোপ করে এমন দস্তাবেজের রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক, এবং স্থাবর সম্পত্তির ওয়াক্‌ফনামা সেই বিবরণের আওতায় আসে। নির্দিষ্ট প্রয়োজনীয়তা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও ওয়াক্‌ফ প্রশাসকের কার্যালয় থেকে নিশ্চিত করে নিন।
ওয়াক্‌ফ পুণ্যের কাজ, কিন্তু ওয়ারিশদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে করা ওয়াক্‌ফ শরিয়াহর দৃষ্টিতে প্রশ্নবিদ্ধ। মৃত্যুর ঠিক আগে করা হলে সেটি মৃত্যুশয্যার বিবেচনায় চ্যালেঞ্জযোগ্যও হতে পারে।
ওয়াক্‌ফ আল-আওলাদ — যেখানে আয়ের একটি অংশ ওয়াক্‌ফকারীর নিজের বংশধরদের জন্য নির্দিষ্ট থাকে এবং শেষে তা ধর্মীয় বা জনহিতকর কাজে যায়। এর বৈধতার শর্ত ও বাংলাদেশে আইনি অবস্থা জটিল — আলেম ও আইনজীবীর সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিন।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। প্রতিটি পরিবারের অবস্থা আলাদা এবং ছোট একটি তথ্য পুরো হিসাব বদলে দিতে পারে। দলিল, নামজারি বা বণ্টননামার আগে স্থানীয় আলেম ও আইনজীবীর সঙ্গে মিলিয়ে নিন।