ব্যাংকে টাকা আটকে আছে, সঞ্চয়পত্র ভাঙানো যাচ্ছে না, কম্পানির শেয়ার হস্তান্তর হচ্ছে না — আর প্রতিষ্ঠান বলছে “আদালতের সাকসেশন সার্টিফিকেট লাগবে”। এই কাগজটি ওয়ারিশান সনদ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, এবং এটি কী কী কাজে লাগে সেই সীমাটিও আইনে নির্দিষ্ট।

ওয়ারিশান সনদ বনাম সাকসেশন সার্টিফিকেট

ওয়ারিশান সনদসাকসেশন সার্টিফিকেট
কে দেনইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা কাউন্সিলরআদালত
কী প্রত্যয়ন করেকারা ওয়ারিশকে দাবি আদায় করতে পারবেন
আইনি ভিত্তিপ্রশাসনিক প্রত্যয়নSuccession Act, 1925
কোথায় লাগেনামজারি, সাধারণ প্রশাসনিক কাজব্যাংক, সিকিউরিটি ও অন্য পাওনা আদায়

দুটি আলাদা কাগজ, আলাদা কাজ — একটি অন্যটির বদলি নয়।

সার্টিফিকেট কী কী বিষয়ে দেওয়া হয়

Succession Act, 1925-এর ধারা ৩৭০ (শিরোনাম “Restriction on grant of certificates under this Part”)-এর পাঠ থেকে দেখা যায়, এই সার্টিফিকেট দেওয়া হয় debt (পাওনা) ও security (সিকিউরিটি) সংক্রান্ত দাবির জন্য।

আইনের পাঠ অনুযায়ী “security” বলতে যা বোঝায়:

  • সরকারি প্রমিসরি নোট, ডিবেঞ্চার ও স্টক
  • কম্পানির শেয়ার ও ডিবেঞ্চার
  • স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ডিবেঞ্চার ও সিকিউরিটি
  • সরকার গেজেটে ঘোষিত অন্য যেকোনো সিকিউরিটি
অর্থাৎ সাকসেশন সার্টিফিকেট জমির মালিকানা প্রতিষ্ঠার কাগজ নয়। এটি পাওনা ও সিকিউরিটি আদায়ের অধিকার সংক্রান্ত। জমির ক্ষেত্রে যা লাগে তা ওয়ারিশান সনদ, নামজারি ও প্রয়োজনে বণ্টননামা — সাকসেশন সার্টিফিকেট নয়। আইনের ধারা ৩৭০ আরও বলে যে, যেসব দাবির অধিকার probate বা letters of administration দিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, সেগুলো এই সার্টিফিকেটের আওতার বাইরে।

আবেদন কোথায় ও কী কী উল্লেখ করতে হয়

Succession Act, 1925-এর ধারা ৩৭২ (শিরোনাম “Application for certificate”)-এর পাঠ অনুযায়ী আবেদন করতে হয় জেলা জজের (District Judge) কাছে, এবং আবেদনপত্রটি স্বাক্ষরিত ও verified হতে হয় Code of Civil Procedure, 1908-এ আরজি স্বাক্ষর ও verification-এর জন্য যে পদ্ধতি নির্ধারিত আছে সেই পদ্ধতিতে।

আইনের ধারা ৩৭২(১) অনুযায়ী আবেদনে যা উল্লেখ করতে হয় —

  • মৃত্যুর সময়;
  • মৃত্যুর সময় মৃত ব্যক্তির সাধারণ নিবাস, আর সেই নিবাস যে জজের কাছে আবেদন করা হচ্ছে তাঁর এলাকার মধ্যে না হলে — ওই এলাকার মধ্যে থাকা মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির বিবরণ;
  • মৃত ব্যক্তির পরিবার বা নিকট আত্মীয়েরা এবং তাঁদের নিবাস;
  • আবেদনকারী কোন অধিকারে দাবি করছেন;
  • ধারা ৩৭০ বা এই আইনের বা অন্য কোনো আইনের অধীনে সার্টিফিকেট দেওয়ার পথে কোনো বাধা নেই — এই কথাটি;
  • যে debt ও security-র জন্য সার্টিফিকেট চাওয়া হচ্ছে, তার বিবরণ।
verification হালকাভাবে নেওয়ার বিষয় নয়। ধারা ৩৭২(২) অনুযায়ী verified আবেদনে মিথ্যা বক্তব্য দিলে বিষয়টি দণ্ডবিধির ধারা ১৯৮-এর আওতায় পড়ে। তাই ওয়ারিশ ও আত্মীয়ের তালিকা, নিবাস ও দাবির ভিত্তি — সবকিছু আইনজীবীর সঙ্গে মিলিয়ে সঠিকভাবে লেখান।
ধারা ৩৭২(৩) অনুযায়ী মৃত পাওনাদারের প্রাপ্য কোনো একটি বা একাধিক debt, এমনকি তার অংশবিশেষের জন্যও আবেদন করা যায় — অর্থাৎ সব পাওনা একসঙ্গে না হলেও চলে।

কখন এটি দরকার হয়

  • ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা তুলতে — বিশেষত নমিনি না থাকলে বা অঙ্ক বড় হলে।
  • সঞ্চয়পত্র ও ডিপিএস ভাঙাতে বা হস্তান্তর করতে।
  • কম্পানির শেয়ার ও ডিবেঞ্চার ওয়ারিশদের নামে নিতে।
  • প্রভিডেন্ট ফান্ড বা অন্য পাওনা আদায়ে, প্রতিষ্ঠান চাইলে।
  • বিরোধ থাকলে — একাধিক পক্ষ দাবি করলে প্রতিষ্ঠান সাধারণত আদালতের সিদ্ধান্ত ছাড়া টাকা দেয় না।
প্রতিষ্ঠান সাকসেশন সার্টিফিকেট চাইবে কি না, তা অঙ্কের আকার ও তাদের নিজস্ব নীতির উপর নির্ভর করে। আদালতে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান থেকে লিখিতভাবে জেনে নিন ঠিক কী কাগজ তারা চায় — অনেক ক্ষেত্রে ওয়ারিশান সনদ ও অন্য কাগজেই কাজ হয়ে যায়।

আবেদনের জন্য যা লাগে

সাধারণভাবে যে কাগজ ও তথ্য গোছাতে হয়:

  • মৃত ব্যক্তির মৃত্যুসনদ
  • ওয়ারিশান সনদ — সব জীবিত ওয়ারিশের নাম ও সম্পর্কসহ
  • যে পাওনা বা সিকিউরিটির জন্য আবেদন, তার বিস্তারিত বিবরণ — ব্যাংকের নাম ও হিসাব নম্বর, সঞ্চয়পত্রের নম্বর, শেয়ারের বিবরণ
  • আবেদনকারী ও ওয়ারিশদের পরিচয়পত্র
  • মৃত ব্যক্তির সর্বশেষ স্থায়ী ঠিকানার প্রমাণ
আদালত ফি, কোর্ট ফি-র হার, সময় ও আবেদনের বিস্তারিত পদ্ধতি এখানে দেওয়া হচ্ছে না — এগুলো দাবির অঙ্ক ও আদালত অনুযায়ী ভিন্ন হয় এবং সময়ে সময়ে বদলায়। এই আবেদন আদালতে করতে হয়, তাই আইনজীবীর মাধ্যমে এগোনোই বাস্তবসম্মত — তাঁর কাছ থেকেই বর্তমান ফি, সময় ও প্রক্রিয়া জেনে নিন।

সব ওয়ারিশের নাম দেওয়া জরুরি

আবেদনে সব জীবিত ওয়ারিশের নাম থাকা দরকার। কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিয়ে সার্টিফিকেট নিলে সেটি পরে চ্যালেঞ্জ হতে পারে, এবং টাকা তুলে নেওয়া হয়ে গেলেও বাদ পড়া ওয়ারিশের দাবি শেষ হয় না। তথ্য গোপন করা আইনি ঝুঁকিও তৈরি করে।

সার্টিফিকেট পাওয়ার পর

সাকসেশন সার্টিফিকেট আপনাকে পাওনা আদায় করার অধিকার দেয় — কিন্তু আদায় করা টাকার মালিকানা নির্ধারণ করে ফারায়েজ। অর্থাৎ টাকা তুলে নেওয়ার পর সেটি সব ওয়ারিশের মধ্যে তাঁদের প্রাপ্য অনুপাতে ভাগ করতে হবে।

যিনি সার্টিফিকেট নিয়ে টাকা তুলছেন, তিনি ওই টাকার একক মালিক হয়ে যান না। ভাগের হিসাবটি আগেই করে রাখুন এবং সবার সম্মতিতে লিখিতভাবে নিষ্পত্তি করুন।

যেখানে সবচেয়ে বেশি ভুল হয়

  • ভুল ১ — ওয়ারিশান সনদ আর সাকসেশন সার্টিফিকেট এক ভাবা। প্রথমটি স্থানীয় সরকারের, দ্বিতীয়টি আদালতের।
  • ভুল ২ — জমির মালিকানার জন্য সাকসেশন সার্টিফিকেট নিতে যাওয়া। এটি পাওনা ও সিকিউরিটি সংক্রান্ত কাগজ।
  • ভুল ৩ — ব্যাংকের সঙ্গে কথা না বলেই আদালতে যাওয়া। অনেক ক্ষেত্রে অন্য কাগজেই কাজ হয়ে যায়।
  • ভুল ৪ — কোনো ওয়ারিশের নাম বাদ দিয়ে আবেদন করা।
  • ভুল ৫ — টাকা তুলে নিজের কাছে রেখে দেওয়া। সার্টিফিকেট আদায়ের অধিকার দেয়, মালিকানা দেয় না।
  • ভুল ৬ — আইনজীবী ছাড়া নিজে আদালতে প্রক্রিয়া শুরু করা। আবেদনের ভুলে মাস চলে যেতে পারে।

আদায় করা টাকার ভাগ হিসাব করে নিন

সার্টিফিকেট দিয়ে টাকা তোলার পর কে কত পাবেন — ওয়ারিশদের তালিকা দিয়ে আগেই জেনে রাখুন।

ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

আদালতের দেওয়া একটি সার্টিফিকেট, যা মৃত ব্যক্তির পাওনা (debt) ও সিকিউরিটি আদায় করার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। আইনি ভিত্তি Succession Act, 1925।
না, সম্পূর্ণ আলাদা। ওয়ারিশান সনদ দেন ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা কাউন্সিলর এবং সেটি প্রত্যয়ন করে কারা ওয়ারিশ। সাকসেশন সার্টিফিকেট দেন আদালত এবং সেটি নির্ধারণ করে কে পাওনা আদায় করতে পারবেন।
না। Succession Act, 1925-এর ধারা ৩৭০-এর পাঠ অনুযায়ী এই সার্টিফিকেট পাওনা ও সিকিউরিটি সংক্রান্ত। জমির ক্ষেত্রে লাগে ওয়ারিশান সনদ, নামজারি এবং প্রয়োজনে বণ্টননামা দলিল।
ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা তুলতে (বিশেষত নমিনি না থাকলে বা অঙ্ক বড় হলে), সঞ্চয়পত্র ভাঙাতে, কম্পানির শেয়ার ও ডিবেঞ্চার হস্তান্তরে, এবং একাধিক পক্ষের দাবি থাকলে। আদালতে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে লিখিতভাবে জেনে নিন কী কাগজ তারা চায়।
এই পাতায় ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো অঙ্ক বা সময় দেওয়া হয়নি — এগুলো দাবির পরিমাণ ও আদালত অনুযায়ী ভিন্ন হয় এবং সময়ে সময়ে বদলায়। আইনজীবীর কাছ থেকে বর্তমান তথ্য জেনে নিন।
সার্টিফিকেট আদায়ের অধিকার দেয়, মালিকানা নয়। আদায় করা টাকা ফারায়েজ অনুযায়ী সব ওয়ারিশের মধ্যে তাঁদের প্রাপ্য অনুপাতে ভাগ হবে।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। প্রতিটি পরিবারের অবস্থা আলাদা এবং ছোট একটি তথ্য পুরো হিসাব বদলে দিতে পারে। দলিল, নামজারি বা বণ্টননামার আগে স্থানীয় আলেম ও আইনজীবীর সঙ্গে মিলিয়ে নিন।