সন্তান মারা গেলে জীবিত মা-বাবা কী পাবেন — এই প্রশ্নটি অনেক পরিবারে এড়িয়ে যাওয়া হয়, অথচ ফারায়েজে পিতা ও মাতা দুজনেই স্থায়ী ওয়ারিশ। তাঁরা কখনো সম্পূর্ণ বঞ্চিত হন না। তবে তাঁদের অংশ কত হবে তা নির্ভর করে একটি বিষয়ের উপর — মৃতের সন্তান আছে কি নেই।
এক নজরে
| পরিস্থিতি | মাতা | পিতা |
|---|---|---|
| মৃতের সন্তান বা পৌত্র-পৌত্রী আছে | ১/৬ | ১/৬ (কন্যা-ই থাকলে অবশিষ্টও পান) |
| সন্তান নেই, দুই বা বেশি ভাই-বোন আছে | ১/৬ | অবশিষ্ট পুরোটা |
| সন্তান নেই, ভাই-বোনও নেই, স্বামী/স্ত্রীও নেই | ১/৩ | অবশিষ্ট পুরোটা |
| সন্তান নেই, কিন্তু স্বামী বা স্ত্রী আছেন | অবশিষ্টের ১/৩ (উমারিয়্যা) | বাকি অবশিষ্ট |
মাতার অংশ ভগ্নাংশে নির্দিষ্ট; পিতা প্রায়ই নির্দিষ্ট অংশ ও অবশিষ্ট — দুই ভূমিকাতেই থাকেন।
সন্তান থাকলে দুজনেই ১/৬
মৃতের পুত্র বা কন্যা জীবিত থাকলে মা-বাবা প্রত্যেকে ১/৬ পান। এটিই সবচেয়ে সাধারণ পরিস্থিতি। এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে যাওয়া একজনের সম্পত্তি ৩৬ লাখ টাকার হিসাব:
মা-বাবার ১/৬ + ১/৬ = ১/৩ আগে সরে যায়। অবশিষ্ট ২/৩ ছেলে ও মেয়ের মধ্যে ২ঃ১ অনুপাতে ভাগ হয় — তাই ছেলে ৪/৯ আর মেয়ে ২/৯ পাচ্ছেন।
সন্তান না থাকলে ছবিটা বদলে যায়
সন্তান না থাকলে মাতার অংশ ১/৬ থেকে বেড়ে ১/৩ হয়ে যায়, আর পিতা আসাবা হিসেবে অবশিষ্ট পুরোটা নেন। শুধু মা-বাবা জীবিত থাকলে:
লক্ষ করুন, এখানে ২ঃ১ অনুপাতটি আবার দেখা যাচ্ছে — কিন্তু কারণটি ভিন্ন। মাতা ১/৩ পাচ্ছেন নির্দিষ্ট অংশ হিসেবে, আর পিতা ২/৩ পাচ্ছেন অবশিষ্টভোগী হিসেবে। দুটি সম্পূর্ণ আলাদা পথ, ফলটি কাকতালীয়ভাবে মিলে গেছে।
দুই বা তার বেশি ভাই-বোন থাকলে মাতার অংশ কমে
এটি অনেকে জানেন না। মৃতের সন্তান না থাকলেও, যদি দুই বা তার বেশি ভাই-বোন জীবিত থাকেন, তাহলে মাতার অংশ ১/৩ থেকে কমে ১/৬ হয়ে যায়। মজার বিষয় — যে ভাই-বোনদের উপস্থিতিতে মাতার অংশ কমছে, তাঁরা নিজেরা পিতার উপস্থিতিতে কিছুই না-ও পেতে পারেন। নিচে পিতা নেই, তাই ভাইয়েরা পাচ্ছেন:
উমারিয়্যা মাসআলা — স্বামী বা স্ত্রী থাকলে
ফারায়েজের সবচেয়ে ভুল-বোঝা হিসাবটি এখানেই। মৃতের সন্তান নেই, কিন্তু স্বামী বা স্ত্রী এবং মা-বাবা — এই তিনজন আছেন। এই অবস্থায় মাতা মোট সম্পত্তির ১/৩ পান না; তিনি পান স্বামী বা স্ত্রীর অংশ বাদ দেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে তার ১/৩। খলিফা উমর (রা.)-এর সিদ্ধান্ত থেকে এই নিয়মটি প্রচলিত, তাই এর নাম উমারিয়্যা মাসআলা।
স্বামী জীবিত থাকলে — ২৪ লাখ টাকার সম্পত্তিতে:
স্বামী ১/২ নিলেন। অবশিষ্ট রইল ১/২। তার ১/৩ অর্থাৎ মোটের ১/৬ পেলেন মাতা, বাকি ১/৩ পেলেন পিতা। মাতাকে যদি ভুল করে মোটের ১/৩ দেওয়া হতো, তাহলে পিতা মাতার চেয়ে কম পেতেন — যা এই নিয়মের উদ্দেশ্যের বিপরীত।
স্ত্রী জীবিত থাকলে অঙ্কটি আলাদা হয়, কারণ স্ত্রীর অংশ ১/৪:
পিতার দুই ভূমিকা
পিতা ফারায়েজের একটি বিশেষ ওয়ারিশ — তিনি একই সঙ্গে নির্দিষ্ট অংশধারী ও অবশিষ্টভোগী হতে পারেন। মৃতের কেবল কন্যা থাকলে পিতা প্রথমে ১/৬ নেন, তারপর কন্যার অংশের পরও কিছু অবশিষ্ট থাকলে সেটিও তিনি পান:
কন্যা একা থাকায় ১/২ নিলেন, মাতা ১/৬। অবশিষ্ট ২/৬ ছিল — পিতা তাঁর নির্দিষ্ট ১/৬-এর সঙ্গে অতিরিক্ত অবশিষ্টটিও পেয়ে মোট ১/৩ পাচ্ছেন।
মা-বাবা থাকলে দাদা-দাদি-নানি বাদ পড়েন
পিতা জীবিত থাকলে দাদা বাদ পড়েন, আর মাতা জীবিত থাকলে দাদি ও নানি দুজনেই বাদ পড়েন — কারণ মা-বাবা তাঁদের চেয়ে নিকটতর। তাই মা-বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় দাদা-দাদির অংশ নিয়ে হিসাব করার দরকার পড়ে না।
বাংলাদেশের আইনে বিশেষ বিধান
বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ধারা ৪ কেবল মৃতের ছেলে বা মেয়ের সন্তানদের প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে প্রযোজ্য। মা-বাবার নিজের অংশের ক্ষেত্রে এই ধারা কোনো পরিবর্তন আনে না — পিতা ও মাতার হিসাব হানাফি ফারায়েজের সাধারণ নিয়মেই হয়।
যেখানে সবচেয়ে বেশি ভুল হয়
- ভুল ১ — স্বামী বা স্ত্রী থাকলেও মাতাকে মোট সম্পত্তির ১/৩ দিয়ে দেওয়া। সঠিক হিসাব অবশিষ্টের ১/৩ — উমারিয়্যা মাসআলা।
- ভুল ২ — সন্তান থাকা অবস্থায় মাতাকে ১/৩ দেওয়া। সন্তান থাকলে ১/৬।
- ভুল ৩ — ভাই-বোনের সংখ্যা গোনায় ভুল। দুই বা তার বেশি হলেই মাতার অংশ কমে; একজন ভাই বা একজন বোন থাকলে কমে না।
- ভুল ৪ — মা-বাবাকে ওয়ারিশের তালিকা থেকেই বাদ দেওয়া, বিশেষ করে যখন মৃতের সন্তান আছে। এমন ধারণা ভুল — সন্তান থাকলেও মা-বাবা ১/৬ করে পান।
- ভুল ৫ — মাতাকে সম্পত্তির বদলে নগদ বা ভরণপোষণ দিয়ে হিসাব মিটিয়ে ফেলা। তিনি সম্মত হলে ভিন্ন কথা, কিন্তু তাঁর অংশ আইনত সম্পত্তিতেই।
আপনার নিজের পরিবারের হিসাব করুন
ওয়ারিশদের নাম ও সম্পদের পরিমাণ দিন — মুহূর্তেই পাবেন বিস্তারিত বণ্টন তালিকা, হিসাবের ধাপ এবং প্রিন্টযোগ্য রিপোর্ট।
ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →