ফারায়েজের বণ্টন শুরু হয় একটি নির্দিষ্ট দল দিয়ে — যাঁদের অংশ কোরআনে সরাসরি সংখ্যায় বলা আছে। এঁদের বলা হয় জাবিল ফুরুজ, অর্থাৎ নির্ধারিত অংশের অধিকারী। বণ্টনে সবার আগে এঁরা নিজেদের ভাগ নেন, তারপর যা থাকে তা যায় অন্যদের কাছে।

ছয়টি ভগ্নাংশ — এর বাইরে কিছু নেই

কোরআনে উত্তরাধিকারের জন্য মোট ছয়টি ভগ্নাংশ ব্যবহৃত হয়েছে। তিনটি একটি ধারায়, আরও তিনটি তার অর্ধেক করে:

ভগ্নাংশশতকরাকারা পেতে পারেন
১/২৫০%স্বামী · একমাত্র মেয়ে · একমাত্র সহোদর বোন · পুত্রের একমাত্র মেয়ে
১/৪২৫%স্বামী (সন্তান থাকলে) · স্ত্রী (সন্তান না থাকলে)
১/৮১২.৫%স্ত্রী (সন্তান থাকলে)
২/৩৬৬.৬৭%দুই বা তার বেশি মেয়ে · দুই বা তার বেশি সহোদর বোন
১/৩৩৩.৩৩%মা (সন্তান ও একাধিক ভাই-বোন না থাকলে) · একাধিক বৈপিত্রেয় ভাই-বোন
১/৬১৬.৬৭%পিতা · মাতা · দাদা · দাদি-নানি · একজন বৈপিত্রেয় ভাই বা বোন

লক্ষ করুন — ১/২, ১/৪, ১/৮ একটি ধারা; আর ২/৩, ১/৩, ১/৬ আরেকটি ধারা। প্রতিটি পরেরটি আগেরটির অর্ধেক।

কে কোন অবস্থায় কত পান

একই ওয়ারিশের অংশ পরিবারভেদে বদলায়। নিচের টেবিলে শর্তসহ দেওয়া হলো:

ওয়ারিশশর্তঅংশ
স্বামীমৃত স্ত্রীর সন্তান নেই১/২
সন্তান আছে১/৪
স্ত্রীমৃত স্বামীর সন্তান নেই১/৪
সন্তান আছে১/৮
মেয়েএকজন, কোনো ভাই নেই১/২
দুই বা তার বেশি, ভাই নেইসবাই মিলে ২/৩
ভাই আছেনির্দিষ্ট অংশ নয় — আসাবা হয়ে ২ঃ১ অনুপাতে
মাতাসন্তান বা একাধিক ভাই-বোন আছে১/৬
সন্তান নেই, একাধিক ভাই-বোনও নেই১/৩
পিতাসন্তান আছে১/৬
সন্তান নেই১/৬ + অবশিষ্ট, বা পুরো অবশিষ্ট
দাদি বা নানিমা জীবিত নেই১/৬ (একাধিক হলে ভাগ করে)
বৈপিত্রেয় ভাই/বোনসন্তান ও পিতা কেউ নেই, একজন১/৬
একাধিকসবাই মিলে ১/৩ — নারী-পুরুষ সমান

স্ত্রী একাধিক হলে তাঁরা মিলে উপরের অংশটিই পান, প্রত্যেকে আলাদা করে নয়।

একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম — মেয়ে ও বোন

মেয়ে ও সহোদর বোন সবসময় জাবিল ফুরুজ থাকেন না। ভাই উপস্থিত থাকলে মেয়ে তাঁর নির্দিষ্ট ১/২ বা ২/৩ হারান — তখন তিনি ভাইয়ের সঙ্গে অবশিষ্ট ভাগ করে নেন, ২ঃ১ অনুপাতে। একইভাবে মেয়ের উপস্থিতিতে সহোদর বোনও অবশিষ্টভোগী হয়ে যান।

তাই “মেয়ে কত পাবেন” প্রশ্নের একক উত্তর নেই — পরিবারে আর কে কে আছেন তার উপর নির্ভর করে।

পিতা — একইসঙ্গে দুই ভূমিকায়

পিতার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ ব্যাপার ঘটে। মৃত ব্যক্তির ছেলে থাকলে পিতা কেবল নির্দিষ্ট ১/৬ পান। কিন্তু সন্তান শুধু মেয়ে হলে পিতা ১/৬ নেন নির্দিষ্ট অংশ হিসেবে, আর অবশিষ্টটুকুও নেন আসাবা হিসেবে — অর্থাৎ একই সঙ্গে দুই শ্রেণীতে।

উপরের হিসাবে মেয়ে পাচ্ছেন ১/২, মা ১/৬ — যোগফল ৪/৬। অবশিষ্ট ২/৬ পিতার কাছে যাচ্ছে, তাই তাঁর মোট দাঁড়াচ্ছে ১/৩। এখানে মায়ের অংশ ১/৬ হয়েছে কারণ মৃত ব্যক্তির সন্তান আছে।

যোগফল না মিললে কী হয়

নির্দিষ্ট অংশগুলো যোগ করলে সবসময় ঠিক ১ হয় না। দুই দিকেই সমস্যা হতে পারে:

অবস্থানামসমাধান
যোগফল ১-এর বেশিআউলসবার অংশ একই অনুপাতে কমে যায়
যোগফল ১-এর কম, আসাবা নেইরদঅবশিষ্ট একই অনুপাতে ফেরত যায়
যোগফল ১-এর কম, আসাবা আছেস্বাভাবিকঅবশিষ্ট আসাবা নেন

নিচের উদাহরণে আউল কাজ করছে। স্ত্রী, পিতা, মাতা ও দুই মেয়ে — সবার নির্দিষ্ট অংশ যোগ করলে ১-এর বেশি হয়ে যায়, তাই সবার অংশ আনুপাতিক হারে কমেছে:

দুই মেয়ের সারিটি খেয়াল করুন। সেখানে যে অংশ দেখানো হচ্ছে তা দুজনের মোট, একজনের নয়। জনপ্রতি অংশ তার অর্ধেক। একাধিক মেয়ে, ছেলে, স্ত্রী বা ভাই-বোনের ক্ষেত্রে এই নিয়ম সবসময় প্রযোজ্য।

রদ — অবশিষ্ট যখন ফিরে আসে

নির্দিষ্ট অংশের ওয়ারিশরা ভাগ নেওয়ার পর যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে অথচ নেওয়ার মতো কোনো আসাবা না থাকেন, তখন সেই অবশিষ্টটুকু ওয়ারিশদের কাছেই একই অনুপাতে ফিরে যায়।

এখানে স্বামী ১/৪, মা ১/৬ ও মেয়ে ১/২ — যোগফল ১১/১২, অবশিষ্ট ১/১২। আসাবা কেউ নেই। তাই অবশিষ্টটুকু ফিরে গেছে, তবে স্বামীর অংশ বাড়েনি — রদে স্বামী বা স্ত্রীর অংশ কখনো বাড়ে না, এটি একটি কঠোর নিয়ম।

বাংলাদেশের আইনে বিশেষ বিধান

উপরের তালিকা ক্লাসিক হানাফি ফারায়েজের। বাংলাদেশে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৪ ধারা অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির আগে মারা যাওয়া ছেলে বা মেয়ের সন্তানরাও অংশ পান। তাঁরা জাবিল ফুরুজের ওই ছয় ভগ্নাংশের কোনোটি পান না — বরং তাঁদের বাবা বা মা জীবিত থাকলে যা পেতেন, সেটিই শাখা অনুযায়ী ভাগ হয়।

আপনার নিজের পরিবারের হিসাব করুন

ওয়ারিশদের নাম ও সম্পদের পরিমাণ দিন — মুহূর্তেই পাবেন বিস্তারিত বণ্টন তালিকা, হিসাবের ধাপ এবং প্রিন্টযোগ্য রিপোর্ট।

ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

শাস্ত্রে সাধারণত বারো শ্রেণীর কথা বলা হয় — স্বামী, স্ত্রী, মেয়ে, পুত্রের মেয়ে, পিতা, মাতা, দাদা, দাদি-নানি, সহোদর বোন, বৈমাত্রেয় বোন, এবং বৈপিত্রেয় ভাই ও বোন। তবে সবাই একসঙ্গে এক পরিবারে থাকেন না।
না। ভাই না থাকলে মেয়ে নির্দিষ্ট অংশ পান — একজন হলে ১/২, একাধিক হলে মিলে ২/৩। কিন্তু ভাই থাকলে তিনি আর নির্দিষ্ট অংশ পান না, অবশিষ্টভোগী হয়ে ২ঃ১ অনুপাতে ভাগ নেন।
সূরা আন-নিসার ১২ নম্বর আয়াতে তাঁদের অংশ আলাদাভাবে নির্ধারিত হয়েছে এবং সেখানে নারী-পুরুষের মধ্যে পার্থক্য করা হয়নি। ২ঃ১ অনুপাত সন্তান ও সহোদর ভাই-বোনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
আসাবা থাকলে তিনি পান। কেউ না থাকলে রদ নীতিতে অবশিষ্টটুকু নির্দিষ্ট অংশের ওয়ারিশদের কাছেই একই অনুপাতে ফিরে যায় — তবে স্বামী বা স্ত্রীর অংশ কখনো বাড়ে না।
মৃত ব্যক্তির সন্তান বা পুত্রের সন্তান না থাকলে এবং দুই বা তার বেশি ভাই-বোনও না থাকলে মা পান ১/৩। এর যেকোনো একটি থাকলে অংশ কমে ১/৬ হয়ে যায় — ভাই-বোনেরা নিজেরা কিছু না পেলেও।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। প্রতিটি পরিবারের অবস্থা আলাদা এবং ছোট একটি তথ্য পুরো হিসাব বদলে দিতে পারে। দলিল, নামজারি বা বণ্টননামার আগে স্থানীয় আলেম ও আইনজীবীর সঙ্গে মিলিয়ে নিন।