ফারায়েজের ভুল প্রায়ই মন্দ উদ্দেশ্য থেকে হয় না — হয় অভ্যাস, শোনা কথা আর অসম্পূর্ণ জানা থেকে। নিচের বারোটি ভুল বাংলাদেশের পারিবারিক বণ্টনে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, এবং প্রতিটির পাশেই সঠিক নিয়মটি দেওয়া আছে।
ভুল ১ — ঋণ ও দেনমোহর বাদ না দিয়ে ভাগ শুরু করা
ফারায়েজের ভাগ চতুর্থ ধাপ, প্রথম নয়। আগে দাফন-কাফনের খরচ, তারপর সব ঋণ — অপরিশোধিত দেনমোহরসহ, তারপর বৈধ ওসিয়ত। এই তিনটির পর যা থাকে, তা-ই ভাগ হয়। ঋণ বাদ না দিলে প্রত্যেকের অংশই ভুল হয়ে যায়।
ভুল ২ — একমাত্র মেয়েকে অর্ধেক দিয়ে বাকিটা চাচাকে দেওয়া
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় এই ভুলে। মৃতের পিতা, ভাই বা ভাইয়ের বংশধর কেউ জীবিত না থাকলে চাচা অবশিষ্ট পান — সেটি ঠিক:
কিন্তু চাচাও না থাকলে, অর্থাৎ কোনো আসাবা জীবিত না থাকলে, রদের নিয়মে পুরো সম্পত্তিই মেয়ের:
ভুল ৩ — উমারিয়্যা মাসআলা না জানা
মৃতের সন্তান নেই, কিন্তু স্বামী বা স্ত্রী ও মা-বাবা আছেন। এই অবস্থায় মাতা মোট সম্পত্তির ১/৩ পান না — তিনি পান স্বামী বা স্ত্রীর অংশ বাদ দেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে তার ১/৩:
স্বামী ১/২ নেওয়ার পর অবশিষ্ট ১/২; তার ১/৩ অর্থাৎ মোটের ১/৬ পেলেন মাতা। ভুল করে মোটের ১/৩ দিলে পিতা মাতার চেয়ে কম পেতেন।
ভুল ৪ — গোষ্ঠীর মোট অংশকে জনপ্রতি ভাবা
হিসাবের তালিকায় “দুই ছেলে — ৭/১০” লেখা থাকলে সেটি দুজনের মোট, একজনের নয়। এই একটি ভুলে একজনের অংশ দ্বিগুণ হয়ে যায় আর অন্যরা কম পান। তালিকায় জনপ্রতি হিসাব আলাদা করে দেখানো থাকলে সেটিই দেখুন।
ভুল ৫ — পুত্র থাকা সত্ত্বেও ভাই-বোনদের ভাগ দেওয়া
মৃতের একটি পুত্র জীবিত থাকলে তাঁর ভাই-বোন, সৎ ভাই-বোন, চাচা ও ভাতিজা — সবাই হাজবের নিয়মে বাদ পড়েন। তাঁরা কিছুই পান না। স্বেচ্ছায় কিছু দিতে চাইলে সেটি দান, ফারায়েজের অংশ নয়।
ভুল ৬ — রদে স্বামী বা স্ত্রীর অংশ বাড়িয়ে দেওয়া
রদে অবশিষ্ট সম্পত্তি ফিরে যায় কেবল রক্তসম্পর্কের নির্দিষ্ট অংশধারীদের মধ্যে। স্বামী বা স্ত্রী তাঁর নির্দিষ্ট অংশটুকুই পান — এক পয়সা বেশি নয়। আউলে অবশ্য তাঁদের অংশও কমে; দুটি নিয়ম আলাদা।
ভুল ৭ — মেয়ে থাকলে ভাই-বোনদের বাদ দেওয়া
কন্যা পুত্রের মতো সবাইকে সরাতে পারেন না। মৃতের শুধু মেয়ে থাকলে সহোদর বোন আসাবা মা'আল গাইর হিসেবে অবশিষ্ট পান, আর সহোদর ভাইও অবশিষ্টভোগী হিসেবে আসতে পারেন। “সন্তান আছে মানেই ভাই-বোন বাদ” — এটি ভুল।
ভুল ৮ — দাদি ও নানিকে ১/৬ করে দেওয়া
১/৬ ভগ্নাংশটি এই প্রজন্মের জন্য মোট। একজন থাকলে তিনি একা ১/৬ পান; দুজনেই থাকলে জনপ্রতি ১/১২। আর মাতা জীবিত থাকলে দুজনেই বাদ পড়েন, আর পিতা শুধু দাদির পথ আটকান — নানির নয়।
ভুল ৯ — স্ত্রীর নিজের গয়না ভাগে ফেলা
দেনমোহর হিসেবে পাওয়া, উপহার, বাবার বাড়ি থেকে আনা বা নিজের কেনা গয়না স্ত্রীর নিজের সম্পত্তি — স্বামীর মৃত্যুতে সেটি ভাগ হয় না। প্রশ্নটি “কে টাকা দিয়েছিল” নয়, “মালিকানা হস্তান্তর হয়েছিল কি না”।
ভুল ১০ — আগে মারা যাওয়া ওয়ারিশের অংশ মুছে দেওয়া
বাবার মৃত্যুর পর কিন্তু ভাগ হওয়ার আগে যদি এক ভাই বা বোন মারা যান, তাঁর অংশ বাতিল হয় না — বাবার মৃত্যুর মুহূর্তেই সেটি তাঁর হয়ে গিয়েছিল। এখন সেই অংশটি তাঁর নিজের ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ হবে। দুটি আলাদা হিসাব করতে হয়, এক ধাপে নয়।
ভুল ১১ — মেয়েদের একেবারে বাদ দেওয়া
“মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি, যৌতুক দিয়েছি, তাই আর অংশ নেই” — এই যুক্তির কোনো শরিয়াহ বা আইনি ভিত্তি নেই। কন্যার অংশ আইন থেকে আসে। মেয়ে স্বেচ্ছায়, বুঝেশুনে ও চাপমুক্তভাবে নিজের অংশ ছেড়ে দিলে সেটি আলাদা বিষয় — কিন্তু ধরে নেওয়া যাবে না।
ভুল ১২ — রেকর্ডকে মালিকানার চূড়ান্ত প্রমাণ ভাবা
খতিয়ানে নাম থাকা মানেই মালিক নন, আর নাম না থাকা মানেই অধিকার শেষ নয়। একজন একা নামজারি করিয়ে ফেললেও অন্য ওয়ারিশদের অধিকার মুছে যায় না — উত্তরাধিকার আইন থেকেই আসে। তবে দেরি করলে বাস্তব জটিলতা বাড়ে।
ভুল এড়াতে চেকলিস্ট
- সব জীবিত ওয়ারিশের পূর্ণ তালিকা — মেয়ে, বোন ও দূরের কেউ বাদ যেন না পড়েন।
- মৃত্যুর ক্রম নিশ্চিত করুন — কে আগে মারা গেছেন, কে পরে।
- দাফন-কাফনের খরচ, সব ঋণ ও অপরিশোধিত দেনমোহর আগে বাদ দিন।
- কোন সম্পত্তি তরিকার অংশ আর কোনটি নয় — আলাদা করুন (স্ত্রীর গয়না, বৈধ হেবা করা সম্পত্তি)।
- গোষ্ঠীর মোট আর জনপ্রতি অংশ আলাদা করে দেখুন।
- আউল বা রদ হচ্ছে কি না মিলিয়ে নিন।
- হিসাব লিখিতভাবে সবাইকে দিন, এবং শেষে বণ্টননামা করে রেজিস্ট্রি করান।
- কোনো বিন্দুতে সন্দেহ থাকলে আলেম ও আইনজীবীর সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
ভুল ছাড়া হিসাব করে নিন
ওয়ারিশদের তালিকা দিন — হাজব, আউল ও রদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধরা পড়বে, সঙ্গে জনপ্রতি হিসাবও পাবেন।
ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →