ফারায়েজ নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন ও সবচেয়ে বেশি ভুল ব্যাখ্যা হয় এই একটি নিয়মকে ঘিরে — “ছেলে দ্বিগুণ কেন?” প্রশ্নটি অনেকে সরল কৌতূহল থেকে করেন, কেউ কেউ আপত্তি থেকে। আবার বাংলাদেশের বহু পরিবারে এই নিয়মটিকেই ঢাল বানিয়ে মেয়েদের প্রাপ্য অংশ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত করা হয়, যা নিয়মটির সম্পূর্ণ উল্টো প্রয়োগ।

এই লেখায় হানাফি মাযহাব অনুযায়ী অনুপাতটির ভিত্তি, এর পেছনের যুক্তি, কোথায় এটি প্রযোজ্য নয়, এবং বাস্তব হিসাবের উদাহরণ ধাপে ধাপে দেখানো হলো।

কুরআনে কী বলা হয়েছে

সূরা আন-নিসার ১১ নম্বর আয়াতের শুরুতেই সন্তানদের বিষয়ে নির্দেশ এসেছে — আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে নির্দেশ দিচ্ছেন: এক পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সমান। একই আয়াতে এরপর বলা হয়েছে, কন্যা দুই বা তার বেশি হলে তারা মিলে পাবে দুই-তৃতীয়াংশ, আর কন্যা একজন হলে সে পাবে অর্ধেক।

অর্থাৎ ২ঃ১ অনুপাতটি প্রযোজ্য তখনই, যখন ছেলে ও মেয়ে একসঙ্গে ওয়ারিশ হন। ছেলে না থাকলে মেয়ের জন্য আলাদা নির্দিষ্ট অংশ নির্ধারিত — সেই হিসাব দেখুন একমাত্র মেয়ে থাকলে সম্পত্তি কে কত পাবে লেখায়।

যুক্তি এক: আর্থিক দায়িত্ব কার উপর

ইসলামি পারিবারিক আইনে অর্থের দায়িত্ব ও অর্থের মালিকানা আলাদা দুটি বিষয়। বণ্টনের অনুপাত বোঝার জন্য দায়িত্বের দিকটি আগে দেখা দরকার:

  • মোহর — বিয়েতে পুরুষকে স্ত্রীকে মোহর দিতে হয়। এটি স্ত্রীর প্রাপ্য ঋণ, উপহার নয়।
  • ভরণপোষণ (নাফাকা) — স্ত্রী ও সন্তানের খাওয়া-পরা, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার খরচ স্বামীর উপর বাধ্যতামূলক। স্ত্রীর নিজের আয় বা সম্পত্তি থাকলেও এই দায়িত্ব কমে না।
  • নিকট আত্মীয়ের খরচ — অসচ্ছল বাবা-মা বা বোনের ভরণপোষণের দায়িত্বও প্রথমে পুরুষ আত্মীয়ের উপর বর্তায়।

অন্যদিকে একজন নারী উত্তরাধিকার, মোহর বা নিজের আয় থেকে যা পান তার পুরোটাই তাঁর নিজের। সংসারের খরচ চালানো তাঁর উপর বাধ্যতামূলক নয়; স্বামী, বাবা বা ভাই কারও তাঁর সম্পত্তিতে অধিকার নেই। ফলে ভাই যে বাড়তি অংশ পান, তার সঙ্গে একটি খরচের দায়ও যুক্ত থাকে — আর বোনের অংশ থাকে দায়মুক্ত।

যুক্তি দুই: এটি “মূল্যের” নয়, “ভূমিকার” পার্থক্য

অনুপাতটি নারী-পুরুষের মর্যাদার তারতম্য নির্দেশ করে না। একই ফারায়েজে মা ও বাবা সন্তান থাকলে প্রত্যেকে সমান ১/৬ পান — এখানে কোনো ২ঃ১ নেই। আবার বৈপিত্রেয় (একই মা, ভিন্ন বাবা) ভাই-বোনের ক্ষেত্রে সূরা নিসার ১২ নম্বর আয়াত অনুযায়ী ভাই ও বোন সমান অংশ পান। অর্থাৎ অনুপাতটি লিঙ্গভিত্তিক সাধারণ নিয়ম নয়, বরং নির্দিষ্ট সম্পর্ক ও দায়িত্বভিত্তিক।

আপনার নিজের পরিবারের হিসাব করুন

আপনার পরিবারে ছেলে-মেয়ের প্রকৃত অংশ কত হবে দেখে নিন।

উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটরে হিসাব করুন →

উদাহরণ: দুই ছেলে, এক মেয়ে ও স্ত্রী

মৃত ব্যক্তির বণ্টনযোগ্য সম্পত্তি ৯০ লাখ টাকা (দাফন খরচ ও ঋণ বাদ দেওয়ার পর)। ওয়ারিশ — স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে।

  1. স্ত্রী সন্তান থাকায় পাবেন ১/৮ = ১১,২৫,০০০ টাকা।
  2. অবশিষ্ট থাকল ৭৮,৭৫,০০০ টাকা।
  3. সন্তানদের ভাগ হবে ২ + ২ + ১ = ৫ ভাগে। প্রতি ভাগ = ১৫,৭৫,০০০ টাকা।
ওয়ারিশভিত্তিভাগটাকায়
স্ত্রীনির্দিষ্ট ১/৮১১,২৫,০০০
ছেলে (১ম)আসাবা২ ভাগ৩১,৫০,০০০
ছেলে (২য়)আসাবা২ ভাগ৩১,৫০,০০০
মেয়েআসাবা১ ভাগ১৫,৭৫,০০০
মোট৯০,০০,০০০

স্ত্রীর অংশ কেন ১/৮ আর কখন ১/৪ হয়, তা বিস্তারিত আছে স্বামী মারা গেলে স্ত্রী কত অংশ পাবেন লেখায়।

যেসব ক্ষেত্রে বোন ভাইয়ের সমান বা বেশি পান

“মেয়ে সবসময় ভাইয়ের অর্ধেক পায়” — এই ধারণাটি ভুল। কয়েকটি বাস্তব হিসাব দেখুন। ধরা যাক প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পত্তি ২৪ লাখ টাকা।

অবস্থামেয়ে/বোনভাইফল
মৃত ব্যক্তির এক মেয়ে ও তাঁর এক সহোদর ভাই ১/২ = ১২,০০,০০০ অবশিষ্ট ১/২ = ১২,০০,০০০ সমান
এক মেয়ে, স্ত্রী ও এক সহোদর ভাই ৪/৮ = ১২,০০,০০০ ৩/৮ = ৯,০০,০০০ মেয়ে বেশি
দুই মেয়ে ও এক সহোদর ভাই ২/৩ = ১৬,০০,০০০ (প্রত্যেকে ৮,০০,০০০) ১/৩ = ৮,০০,০০০ প্রতি মেয়ে ভাইয়ের সমান
বৈপিত্রেয় এক ভাই ও এক বোন (সন্তান-পিতা কেউ নেই) ১/৬ = ৪,০০,০০০ ১/৬ = ৪,০০,০০০ সমান

এখানে দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারিতে মেয়ে বা বোন নির্দিষ্ট অংশ পাচ্ছেন, আর ভাই পাচ্ছেন কেবল অবশিষ্টটুকু — তাই অনুপাত পাল্টে যাচ্ছে। ভাই কখন অবশিষ্ট পান আর কখন কিছুই পান না, দেখুন ছেলে না থাকলে ভাই কি সম্পত্তি পাবে লেখায়।

নিয়ম আর বাস্তবতার ফারাক

বাংলাদেশের বহু পরিবারে সমস্যাটি অনুপাত নিয়ে নয় — সমস্যা হলো মেয়েরা তাঁদের ওই এক ভাগও পান না। গ্রামে-শহরে বহু জায়গায় বোনকে বলা হয়, “তোমার বিয়ে দিয়েছি, খরচ করেছি, আর কী চাও?” কোথাও আবার কাগজে সই নিয়ে নেওয়া হয় এই বলে যে সম্পর্ক নষ্ট হবে।

শরীয়তের দৃষ্টিতে এটি নিয়ম মানা নয়, নিয়ম ভাঙা। কুরআন মেয়ের অংশকে ন্যূনতম হিসেবে নিশ্চিত করেছে — সর্বোচ্চ সীমা হিসেবে নয়। কেউ চাইলে জীবিত অবস্থায় মেয়েকে বেশি দিতে পারেন, কিন্তু কম দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

আইনের দিক থেকেও বোন তাঁর অংশ দাবি করতে পারেন। ওয়ারিশান সনদে নাম ওঠানো, নামজারি বা মিউটেশনে নিজের অংশ অন্তর্ভুক্ত করা, এবং প্রয়োজনে বণ্টননামা দলিল করা — এই তিনটি ধাপ সম্পন্ন থাকলে পরবর্তীতে বিরোধ হওয়ার আশঙ্কা অনেক কমে যায়।

যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়

  1. ২ঃ১ নিয়মকে সব ওয়ারিশের উপর চাপিয়ে দেওয়া। স্ত্রী, মা, দাদি বা বৈপিত্রেয় বোনের অংশ এই অনুপাতে হিসাব হয় না — তাঁদের অংশ আলাদাভাবে নির্ধারিত।
  2. “মেয়ে তো অর্ধেকই পায়, তাই কিছু না দিলেও চলে” — এই যুক্তি। নিয়মটি মেয়ের অংশ নিশ্চিত করেছে, বাদ দেওয়ার সুযোগ দেয়নি। বঞ্চিত করা সরাসরি হারাম।
  3. বিয়ের খরচ বা যৌতুককে “ভাগ দেওয়া হয়ে গেছে” বলা। বিয়ের সময় দেওয়া উপহার-খরচ উত্তরাধিকারের বিকল্প নয়।
  4. মেয়ের অংশ ভাইয়ের হাতে “রেখে দেওয়া”। বুঝিয়ে না দিলে সেটি আত্মসাৎ। মেয়ে চাইলে নিজের অংশ বুঝে নিয়ে পরে দান করতে পারেন — সেটি তাঁর সিদ্ধান্ত।
  5. দাফন খরচ ও ঋণ বাদ না দিয়েই ভাগ শুরু করা। ধাপগুলো দেখুন মৃত ব্যক্তির ঋণ থাকলে সম্পত্তি কীভাবে ভাগ হবে লেখায়।
  6. মেয়ের প্রাপ্ত সম্পত্তিতে স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির দাবি মেনে নেওয়া। মেয়ের অংশ সম্পূর্ণ তাঁর নিজের; অন্য কারও অনুমতি লাগে না।

মতভেদ কোথায়

ছেলে-মেয়ের ২ঃ১ অনুপাত সুস্পষ্ট আয়াত দ্বারা নির্ধারিত হওয়ায় চার মাযহাবের কোথাওই এ নিয়ে মতভেদ নেই — উত্তরাধিকারে অনুপাত বদলানোর সুযোগ ফিকহে স্বীকৃত নয়।

তবে আধুনিক সময়ে অনেক পরিবারে প্রশ্ন ওঠে — মেয়ে যদি নিজেই সংসার চালান বা বাবা-মায়ের দেখাশোনা করেন, তাহলে কী হবে? এখানে দুটি বিষয় আলাদা রাখতে হয়। উত্তরাধিকারের অনুপাত পরিবর্তন করা যায় না। কিন্তু বাবা জীবিত অবস্থায় হেবার মাধ্যমে সন্তানদের মধ্যে সমান বা প্রয়োজনমতো বণ্টন করতে পারেন — এবং অনেক হানাফি ফকীহর মতে দানে সন্তানদের সমান দেওয়াই উত্তম। এই পথটির শর্ত ও সীমা বিস্তারিত আছে জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি বণ্টন করা যায় কি লেখায়।

আপনার নিজের পরিবারের হিসাব করুন

ওয়ারিশদের নাম বসিয়ে সঠিক ভাগ মিলিয়ে নিন — সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।

এখনই হিসাব করুন →

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

প্রথমে ফারায়েজ অনুযায়ী কার কত প্রাপ্য তা নির্ধারণ করতে হবে। এরপর কোনো ভাই স্বেচ্ছায় নিজের অংশ থেকে বোনকে দিতে চাইলে তা তাঁর দান হিসেবে গণ্য হবে — বণ্টনের নিয়ম বদল নয়।
উত্তরাধিকারের অংশ এতে বাড়ে না। তবে বাবা-মা জীবিত অবস্থায় হেবা করে বা ওসিয়তের সীমার মধ্যে থেকে বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।
না। স্ত্রীর সম্পত্তি সম্পূর্ণ তাঁর নিজের। বিক্রি, ভাড়া বা দান — সব সিদ্ধান্ত তিনি একাই নিতে পারেন।
সূরা নিসার ১২ নম্বর আয়াতে বৈপিত্রেয় ভাই-বোনের অংশ আলাদাভাবে নির্ধারিত হয়েছে এবং সেখানে পুরুষ-নারীর মধ্যে পার্থক্য করা হয়নি।
না। ছেলে না থাকলে মেয়ে নির্দিষ্ট অংশ পান — একজন হলে ১/২, দুই বা তার বেশি হলে সবাই মিলে ২/৩।
পুত্রের ছেলে ও পুত্রের মেয়ে একসঙ্গে ওয়ারিশ হলে তাঁদের মধ্যেও একই ২ঃ১ অনুপাত প্রযোজ্য হয়।
উত্তরাধিকারের সীমা লঙ্ঘন সম্পর্কে সূরা নিসার ১৩-১৪ নম্বর আয়াতে কঠোর সতর্কবাণী রয়েছে। প্রাপ্য অংশ আটকে রাখা অন্যের হক নষ্ট করার শামিল।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখাটি হানাফি মাযহাব ও বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের ভিত্তিতে সাধারণ তথ্য হিসেবে দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত বণ্টনের আগে সব ওয়ারিশের তালিকা, ঋণ ও ওসিয়ত মিলিয়ে একজন যোগ্য আলেম এবং প্রয়োজনে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।