পরিবারের একজন প্রবাসে, আর দেশে সম্পত্তি ভাগ হচ্ছে। প্রশ্ন দুই দিক থেকেই আসে — প্রবাসী ভাবছেন “আমার অংশ ঠিকভাবে পাব কি”, আর দেশে থাকা পরিবার ভাবছে “সই ছাড়া তো কাগজ হচ্ছে না”। প্রথমেই একটি কথা পরিষ্কার: বিদেশে থাকা অধিকার কমায় না, এক পয়সাও নয়।

অধিকার অপরিবর্তিত

দেশে থাকা বা বিদেশে থাকা — ফারায়েজের ভগ্নাংশে কোনো পার্থক্য করে না। নাগরিকত্ব, কতদিন দেশে আসেননি, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ কেমন — কোনোটিই অংশ বদলায় না। তিন ছেলে ও দুই মেয়ের পরিবারে একজন ছেলে বিদেশে থাকলেও তাঁর অংশ অন্য ছেলেদের সমান।

মূল সমস্যা — সই ও উপস্থিতি

সমস্যাটি অধিকারে নয়, প্রক্রিয়ায়। নামজারি, বণ্টননামা, হেবা বা বিক্রি — সবগুলোতেই ব্যক্তিগত উপস্থিতি বা সই দরকার হয়। প্রবাসে থাকলে এই জায়গাটিই আটকে যায়।

পাওয়ার অব অ্যাটর্নি

সাধারণ সমাধান হলো পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (আমমোক্তারনামা) — যার মাধ্যমে বিশ্বস্ত কেউ আপনার পক্ষে নির্দিষ্ট কাজ করতে পারেন। বাংলাদেশে এই বিষয়ে আলাদা আইন আছে — পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২

বিদেশে সম্পাদিত পাওয়ার অব অ্যাটর্নির জন্য অতিরিক্ত ধাপ থাকে — সত্যায়ন ও বাংলাদেশে ব্যবহারের উপযোগী করার প্রক্রিয়া। এই পাতায় সেই ধাপগুলোর বিবরণ, ফি বা কোন কার্যালয়ে কী করতে হবে তা ইচ্ছাকৃতভাবে দেওয়া হয়নি, কারণ এগুলো দেশভেদে ভিন্ন এবং সময়ে সময়ে বদলায়। আপনার দেশে বাংলাদেশের মিশনে এবং সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জিজ্ঞেস করে বর্তমান প্রয়োজনীয়তা লিখিতভাবে জেনে নিন, এবং একজন আইনজীবীর মাধ্যমে দস্তাবেজটি তৈরি করুন।

পাওয়ার অব অ্যাটর্নিতে যা সতর্কভাবে লিখতে হয়

সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুলটি এখানে হয় — প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ক্ষমতা দিয়ে ফেলা। “সব কাজ করার ক্ষমতা” লিখে দিলে তার মধ্যে জমি বিক্রির ক্ষমতাও চলে আসতে পারে। ক্ষমতা যত সংকীর্ণ ও নির্দিষ্ট, তত নিরাপদ।
  • ঠিক কোন কাজগুলোর জন্য — নামজারির আবেদন? বণ্টননামায় সই? খাজনা দেওয়া? প্রতিটি আলাদা করে লিখুন।
  • বিক্রির ক্ষমতা দিচ্ছেন কি না — না দিতে চাইলে স্পষ্টভাবে বাদ দিন।
  • কোন নির্দিষ্ট সম্পত্তির জন্য — দাগ ও খতিয়ান নম্বর উল্লেখ করুন।
  • মেয়াদ — একটি সময়সীমা দিলে ঝুঁকি কমে।
  • প্রত্যাহারের ব্যবস্থা — প্রয়োজনে বাতিল করার পথ খোলা রাখুন এবং কীভাবে করবেন তা আগেই জেনে রাখুন।

প্রবাসে থেকে নিজের অবস্থান শক্ত রাখা

  • ওয়ারিশান সনদে নিজের নাম আছে কি না নিশ্চিত করুন। সনদের একটি কপি চেয়ে নিন এবং নিজে পড়ে দেখুন।
  • খতিয়ান ও দলিলের কপি সংগ্রহ করে রাখুন — প্রয়োজনে ই-পর্চার মাধ্যমে অনলাইনেও খতিয়ানের কপি পাওয়া যায়।
  • নামজারিতে নিজের নাম উঠেছে কি না দেখে নিন।
  • নিজের অংশের খাজনা দিন — রসিদ একটি কার্যকর প্রমাণ হিসেবে থাকে।
  • আপত্তি থাকলে লিখিতভাবে পাঠান — ইমেইল বা কুরিয়ারে, প্রমাণসহ। ফোনে বলা কথার কোনো রেকর্ড থাকে না।
  • একজন আইনজীবী ঠিক করে রাখুন — দেশে গিয়ে হঠাৎ খুঁজতে গেলে দেরি হয়ে যায়।

দেশে থাকা পরিবারের জন্য

উল্টো দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী ওয়ারিশকে বাদ দিয়ে কাগজ করে ফেলা তাৎক্ষণিকভাবে সহজ মনে হয়, কিন্তু সেটি পুরো প্রক্রিয়াটিকেই ভঙ্গুর করে দেয়।

কোনো ওয়ারিশকে বাদ দিয়ে ওয়ারিশান সনদ, নামজারি বা বণ্টননামা করলে তা চ্যালেঞ্জযোগ্য থাকে। বছর পরে সেই ওয়ারিশ বা তাঁর সন্তানরা এলে পুরো ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়তে পারে — এমনকি ইতিমধ্যে বিক্রি হয়ে যাওয়া জমিও বিরোধে জড়াতে পারে। প্রবাসীর সঙ্গে যোগাযোগ করে, সময় দিয়ে, ঠিকভাবে কাগজ করাই দীর্ঘমেয়াদে সবার জন্য নিরাপদ।
  • আগে হিসাব পাঠান — প্রবাসী ওয়ারিশকে লিখিতভাবে জানান তাঁর অংশ কত এবং কী প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।
  • কাগজের ছবি বা স্ক্যান পাঠান — খতিয়ান, দলিল, ওয়ারিশান সনদ।
  • সিদ্ধান্তের জন্য যুক্তিসঙ্গত সময় দিন।
  • যোগাযোগ নথিবদ্ধ রাখুন — কখন কী পাঠিয়েছেন তার রেকর্ড রাখুন।

প্রবাসী ওয়ারিশ দীর্ঘদিন যোগাযোগ না করলে

যোগাযোগ না থাকা কারো অধিকার শেষ করে না। তাঁর অংশ অন্যদের মধ্যে ভাগ করে ফেলা যায় না। অংশটি আলাদা করে চিহ্নিত রেখে যোগাযোগের চেষ্টা নথিবদ্ধ করুন, এবং কী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যায় তা আইনজীবীর কাছ থেকে জেনে নিন।

যেখানে সবচেয়ে বেশি ভুল হয়

  • ভুল ১ — “দেশে থাকে না, তাই অংশ কম” — এই ধারণা। প্রবাস ভগ্নাংশ বদলায় না।
  • ভুল ২ — পাওয়ার অব অ্যাটর্নিতে ঢালাওভাবে “সব ক্ষমতা” দিয়ে দেওয়া। বিক্রির ক্ষমতাও তাতে ঢুকে যেতে পারে।
  • ভুল ৩ — প্রবাসী ওয়ারিশকে বাদ দিয়ে কাগজ করা। পুরো ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জযোগ্য থাকে।
  • ভুল ৪ — ফোনে সম্মতি নিয়ে কাগজ করা। লিখিত প্রমাণ ছাড়া সেটি কাজে লাগে না।
  • ভুল ৫ — বিদেশে সম্পাদিত পাওয়ার অব অ্যাটর্নির অতিরিক্ত ধাপগুলো না জেনে দস্তাবেজ পাঠিয়ে দেওয়া — পরে সেটি গ্রহণযোগ্য না হলে সব সময় নষ্ট হয়।
  • ভুল ৬ — প্রবাসে থেকে কাগজের কোনো কপি না রাখা।

নিজের অংশ প্রবাস থেকেই জেনে নিন

ওয়ারিশদের তালিকা বসান — আপনার ভগ্নাংশ ও জমির পরিমাণ দুটোই পেয়ে যাবেন, প্রিন্ট করে পাঠানোর মতো করে।

ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

না, একটুও নয়। দেশে থাকা বা বিদেশে থাকা, নাগরিকত্ব, কতদিন দেশে আসেননি — কোনোটিই ফারায়েজের ভগ্নাংশ বদলায় না।
সাধারণত পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে বিশ্বস্ত কেউ আপনার পক্ষে কাজ করেন। বাংলাদেশে এই বিষয়ে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২ আছে। বিদেশে সম্পাদিত দস্তাবেজের জন্য অতিরিক্ত ধাপ থাকে — আপনার দেশে বাংলাদেশের মিশন ও সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে বর্তমান প্রয়োজনীয়তা লিখিতভাবে জেনে নিন।
প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ক্ষমতা দেবেন না। ঠিক কোন কাজের জন্য, কোন নির্দিষ্ট সম্পত্তির জন্য, বিক্রির ক্ষমতা দিচ্ছেন কি না, মেয়াদ কত — প্রতিটি স্পষ্টভাবে লিখুন। ঢালাও “সব ক্ষমতা” লিখলে বিক্রির ক্ষমতাও তাতে ঢুকে যেতে পারে।
করলে সেটি চ্যালেঞ্জযোগ্য থাকে। বছর পরে তিনি বা তাঁর সন্তানরা এলে পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে — এমনকি বিক্রি হয়ে যাওয়া জমিও বিরোধে জড়াতে পারে।
ওয়ারিশান সনদে নিজের নাম আছে কি না যাচাই করুন, খতিয়ান ও দলিলের কপি সংগ্রহ করে রাখুন, নামজারিতে নাম উঠেছে কি না দেখুন, নিজের অংশের খাজনা দিন, আপত্তি থাকলে লিখিতভাবে পাঠান, আর একজন আইনজীবী আগেই ঠিক করে রাখুন।
অন্যদের মধ্যে ভাগ করবেন না — যোগাযোগ না থাকা অধিকার শেষ করে না। অংশটি আলাদা চিহ্নিত রেখে যোগাযোগের চেষ্টা নথিবদ্ধ করুন এবং আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। প্রতিটি পরিবারের অবস্থা আলাদা এবং ছোট একটি তথ্য পুরো হিসাব বদলে দিতে পারে। দলিল, নামজারি বা বণ্টননামার আগে স্থানীয় আলেম ও আইনজীবীর সঙ্গে মিলিয়ে নিন।