"নিঃসন্তান" বলতে ফারায়েজে কী বোঝায়

ফারায়েজে সন্তান বলতে শুধু নিজের গর্ভের সন্তান বোঝায় না। নিচের যেকোনো একজন বেঁচে থাকলেই মৃত ব্যক্তিকে নিঃসন্তান ধরা হবে না:

  • নিজের ছেলে বা মেয়ে — এই স্ত্রীর গর্ভের হোক বা আগের স্ত্রীর
  • ছেলের ছেলে বা ছেলের মেয়ে (পৌত্র-পৌত্রী), যত নিচেই হোক

কিন্তু মেয়ের সন্তান এই হিসাবে ধরা হয় না — তাঁরা থাকলেও মৃত ব্যক্তি নিঃসন্তানই গণ্য হবেন, কারণ হানাফি ফিকহে মেয়ের সন্তানেরা জাবিল আরহাম শ্রেণীর, নিকটতম ওয়ারিশ নন।

আর দত্তক বা পালিত সন্তান ফারায়েজের দৃষ্টিতে ওয়ারিশ নন। কাগজে-কলমে যতই সন্তান হিসেবে লেখা থাকুক, উত্তরাধিকারের হিসাবে ওই দম্পতি নিঃসন্তানই।

জীবিত সঙ্গী কত পাবেন

এটিই একমাত্র জায়গা যেখানে সন্তান না থাকার সরাসরি লাভ পান স্বামী বা স্ত্রী। কোরআনে (সূরা নিসা, আয়াত ১২) এই দুটি অংশ স্পষ্ট নির্দিষ্ট করা আছে:

একাধিক স্ত্রী থাকলেও এই মোট অংশ বাড়ে না — সবাই মিলে ওই ১/৪ অংশই সমান ভাগে নেবেন। এ নিয়ে বিস্তারিত আছে স্ত্রীর অংশের হিসাবে

বাকি সম্পত্তি কারা পান — এখানেই ভুলটা হয়

বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটি হলো — "সন্তান নেই, তাই সবকিছু স্বামী বা স্ত্রীই পাবেন।" এটি সম্পূর্ণ ভুল। সঙ্গী তাঁর নির্দিষ্ট অংশটুকুই পান, বাকিটা যায় মৃত ব্যক্তির রক্তের আত্মীয়দের কাছে, এই ক্রমে:

  • মাতা — সাধারণত ১/৩, তবে দুই বা তার বেশি ভাই-বোন থাকলে ১/৬
  • পিতা — অবশিষ্ট সম্পূর্ণ অংশ আসাবা হিসেবে
  • পিতা না থাকলে — দাদা, তারপর সহোদর ভাই-বোন, তারপর বৈমাত্রেয় ভাই-বোন, এরপর ভাইয়ের ছেলে, চাচা, চাচাতো ভাই — এই ক্রমে

অর্থাৎ নিঃসন্তান একজন পুরুষ মারা গেলে তাঁর সম্পত্তির বড় অংশ প্রায়ই যায় তাঁর পিতা-মাতা বা ভাই-বোনদের কাছে, স্ত্রীর কাছে নয়। বিধবা স্ত্রী শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে দিলে বাস্তবে অনেক সময় তিনি তাঁর প্রাপ্য ১/৪ অংশও পান না — এটি একটি বড় সামাজিক সমস্যা।

উমারিয়্যা মাসআলা — যেখানে মায়ের নিয়ম বদলে যায়

উপরের হিসাবটি খেয়াল করলে দেখবেন মা পুরো সম্পত্তির ১/৩ পাননি। এটিই উমারিয়্যা মাসআলা — ফারায়েজের সবচেয়ে কম জানা অথচ সবচেয়ে বেশি ভুল হওয়া নিয়মগুলোর একটি।

ওয়ারিশ যখন কেবল তিনজন — স্বামী বা স্ত্রী, পিতা এবং মাতা, তখন মা পুরো সম্পত্তির ১/৩ পান না; পান সঙ্গীর অংশ বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্টের ১/৩

উপরের উদাহরণে স্ত্রী ১/৪ (২৫%) নেওয়ার পর অবশিষ্ট থাকে ৭৫%। তার এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ২৫% পান মা, আর বাকি ৫০% পান পিতা। সাধারণ নিয়মে হিসাব করলে মা পেতেন ৩৩.৩৩% — পার্থক্যটা কম নয়।

এই নিয়মটি হযরত উমর (রা.)-এর রায় থেকে এসেছে, তাই নামই "উমারিয়্যা"। যুক্তি হলো — একই শ্রেণীর ওয়ারিশ হিসেবে পিতা মায়ের দ্বিগুণ পাবেন, এই ভারসাম্য রক্ষা করা। নিয়মটি কেবল ওই তিনজন ওয়ারিশ থাকলেই খাটে; চতুর্থ কেউ যোগ হলেই সাধারণ নিয়ম ফিরে আসে।

ভাই-বোন থাকলে মায়ের অংশ কমে

মৃত ব্যক্তির দুই বা তার বেশি ভাই-বোন থাকলে মায়ের অংশ ১/৩ থেকে কমে ১/৬ হয়ে যায়। এখানে দুটি কথা মনে রাখা জরুরি:

  • ভাই-বোন যেকোনো ধরনের হতে পারেন — সহোদর, বৈমাত্রেয় বা বৈপিত্রেয়। কোনটি কেমন তা জানতে দেখুন সৎ ভাই-বোনের অংশের হিসাব
  • মাত্র একজন ভাই বা বোন থাকলে মায়ের অংশ কমবে না, ১/৩-ই থাকবে।

সবচেয়ে অদ্ভুত দিকটি হলো — পিতা বেঁচে থাকলে ওই ভাই-বোনেরা নিজেরা এক পয়সাও পান না, তবু তাঁদের কেবল উপস্থিতিই মায়ের অংশ অর্ধেক করে দেয়। কেন এমন হয়, তার পূর্ণ ব্যাখ্যা আছে বাবা বেঁচে থাকলে ভাই-বোনের অবস্থানে

পিতা-মাতা কেউ না থাকলে

নিঃসন্তান দম্পতির ক্ষেত্রে বয়স বেশি হলে প্রায়ই পিতা-মাতা কেউ বেঁচে থাকেন না। তখন সঙ্গীর নির্দিষ্ট অংশ বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি যায় ভাই-বোনদের কাছে — সহোদররা আগে, তাঁরা না থাকলে বৈমাত্রেয়রা। ভাই ও বোন একসাথে থাকলে ২ঃ১ অনুপাতে ভাগ করেন।

ভাই-বোনও না থাকলে ক্রমটি এগিয়ে যায় ভাইয়ের ছেলে, চাচা, চাচাতো ভাইয়ের দিকে। এই পূর্ণ ক্রমটি দেখুন ছেলে না থাকলে ভাই কী পাবেন — সেই হিসাবে

একেবারে কোনো ওয়ারিশ না থাকলে

যদি জীবিত সঙ্গী ছাড়া আর কোনো ওয়ারিশই না থাকেন, তখন কী হবে — এ নিয়ে ফুকাহাদের মধ্যে মতভেদ আছে, তাই দুই মত-ই জানা দরকার:

  • ক্লাসিক হানাফি মত: স্বামী বা স্ত্রীর ওপর রদ নীতি খাটে না। তাই তাঁদের নির্দিষ্ট অংশের বেশি তাঁরা পান না, অবশিষ্ট সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে (বায়তুল মাল) যায়।
  • পরবর্তী ফকীহদের ও প্রচলিত মত: কার্যকর বায়তুল মাল ব্যবস্থা না থাকলে অবশিষ্ট অংশও সঙ্গীকেই দেওয়া হয়। বাংলাদেশে বাস্তবে এই মতই অনুসরণ করা হয় এবং আদালতও সাধারণত এভাবেই সিদ্ধান্ত দেন।

এমন পরিস্থিতিতে অবশ্যই একজন আলেম ও একজন আইনজীবীর সাথে আলাদা করে পরামর্শ করুন।

আপনার নিজের পরিবারের হিসাব করুন

ওয়ারিশদের নাম ও সম্পদের পরিমাণ দিন — মুহূর্তেই পাবেন বিস্তারিত বণ্টন তালিকা, হিসাবের ধাপ এবং প্রিন্টযোগ্য রিপোর্ট।

ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →

নিঃসন্তান দম্পতি যা আগেই করে রাখতে পারেন

ফারায়েজের নিয়ম বদলানো যায় না, কিন্তু জীবিত অবস্থায় বৈধ পথে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। প্রচলিত তিনটি উপায়:

  • হেবা বা দানপত্র: জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি হস্তান্তর করে দখল বুঝিয়ে দিলে তা কার্যকর হয়, কারণ তখন সেটি আর উত্তরাধিকারের সম্পত্তি থাকে না। অনেক নিঃসন্তান স্বামী স্ত্রীর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য বসতবাড়িটি এভাবে দিয়ে যান।
  • ওসিয়ত: সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত, এবং যিনি ইতিমধ্যেই ওয়ারিশ তাঁর পক্ষে নয়। তাই স্ত্রীর পক্ষে ওসিয়ত চলে না, কিন্তু পালিত সন্তান বা এতিমখানার পক্ষে চলে। শর্তগুলো দেখুন ওসিয়তের নিয়মে
  • দেনমোহর নিষ্পত্তি: অপরিশোধিত দেনমোহর ঋণ হিসেবে বণ্টনের আগেই পরিশোধ হয়, তাই স্ত্রীর জন্য এটি বাড়তি সুরক্ষা।

যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়

  • "সন্তান নেই, তাই সব স্ত্রীর" — না। শ্বশুর, শাশুড়ি বা দেবর-ননদ থাকলে তাঁরাও ওয়ারিশ।
  • "মা সবসময় ১/৩ পাবেন" — না। উমারিয়্যা মাসআলায় হিসাব ভিন্ন, আর দুইয়ের বেশি ভাই-বোন থাকলে ১/৬।
  • "পালিত সন্তান থাকলে নিঃসন্তান নয়" — ফারায়েজে তিনি ওয়ারিশ নন, দম্পতি নিঃসন্তানই গণ্য।
  • "স্ত্রীর নিজের সম্পত্তিও একসাথে ভাগ হবে" — না, সেটি সম্পূর্ণ আলাদা হিসাব। দেখুন নারীর নিজের সম্পত্তি বণ্টনের নিয়ম
  • বণ্টনের আগে ঋণ বাদ না দেওয়া — দাফন-কাফনের খরচ, ঋণ ও ওসিয়ত বাদ দেওয়ার পরেই ভাগ শুরু হয়। ধাপগুলো আছে ঋণ থাকলে সম্পত্তি বণ্টনের নিয়মে

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

না, যদি অন্য কোনো ওয়ারিশ থাকেন। স্ত্রী এক-চতুর্থাংশ পাবেন এবং বাকিটা মৃতের পিতা-মাতা, ভাই-বোন বা অন্য নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বণ্টিত হবে। একেবারে কোনো ওয়ারিশ না থাকলে বাংলাদেশের প্রচলিত ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ সম্পত্তি স্ত্রী পান।
সাধারণত হ্যাঁ। তবে ওয়ারিশ যদি হন কেবল স্বামী বা স্ত্রী, পিতা ও মাতা — তখন উমারিয়্যা মাসআলা প্রযোজ্য হয়ে মা পান স্বামী/স্ত্রীর অংশ বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্টের এক-তৃতীয়াংশ, পুরো সম্পত্তির নয়।
মায়ের অংশ এক-তৃতীয়াংশ থেকে কমে এক-ষষ্ঠাংশ হয়ে যায়। মজার বিষয় হলো, পিতা বেঁচে থাকলে ওই ভাই-বোনেরা নিজেরা এক পয়সাও পান না, তবু তাঁদের উপস্থিতিই মায়ের অংশ কমিয়ে দেয়।
ফারায়েজের দৃষ্টিতে দত্তক সন্তান ওয়ারিশ নন, তাই সেই দম্পতি নিঃসন্তানই গণ্য হবেন। তবে তাঁদের জন্য ওসিয়ত করে সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত রেখে যাওয়া যায়।
সেটি স্বামীর সম্পত্তির অংশ নয়। স্ত্রী মারা গেলে তাঁর নিজের সম্পত্তি তাঁর নিজের ওয়ারিশদের মধ্যে আলাদাভাবে বণ্টিত হবে — স্বামী সেখানে একজন ওয়ারিশ মাত্র।
জীবিত অবস্থায় হেবা বা দানপত্রের মাধ্যমে দিলে তা কার্যকর হয়, কারণ তখন সেটি আর উত্তরাধিকারের সম্পত্তি থাকে না। কিন্তু মৃত্যুর পর কার্যকর হবে এমন ওসিয়ত দিয়ে ওয়ারিশকে অতিরিক্ত দেওয়া যায় না।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। প্রতিটি পরিবারের অবস্থা আলাদা এবং ছোট একটি তথ্যেও ফলাফল বদলে যেতে পারে। চূড়ান্ত বণ্টনের আগে একজন বিজ্ঞ আলেম ও অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিন।