প্রশ্নটি আসলে কী

বাংলাদেশে যেসব পরিবারে দুই বা ততোধিক স্ত্রী আছেন, স্বামীর মৃত্যুর পর সেখানে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি ওঠে তা হলো — "প্রত্যেক স্ত্রী কি আলাদা করে ১/৮ পাবেন?" অনেকে ধরে নেন, দুই স্ত্রী মানে দুই গুণ, অর্থাৎ ১/৪। এই ধারণা থেকেই পরিবারে বড় বিরোধ তৈরি হয়, কারণ এতে সন্তানদের প্রাপ্য অংশ কমে যায়।

উত্তরটি পরিষ্কার: স্ত্রীর সংখ্যা যতই হোক, স্ত্রীদের জন্য নির্ধারিত মোট অংশ একটুও বাড়ে না। নিয়মটি কেন এমন, তা কোরআনের শব্দচয়নেই স্পষ্ট।

কোরআন কী বলছে

সূরা নিসার ১২ নম্বর আয়াতে স্ত্রীদের অংশ সম্পর্কে বলা হয়েছে — তোমাদের সন্তান না থাকলে তারা পাবে তোমাদের রেখে যাওয়া সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ, আর সন্তান থাকলে পাবে এক-অষ্টমাংশ।

এখানে খেয়াল করার বিষয় হলো আয়াতে স্ত্রীদের বোঝাতে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু অংশ বলা হয়েছে একটিমাত্র — ১/৪ অথবা ১/৮। অর্থাৎ ভাষাটিই বলে দিচ্ছে, অংশটি একজন স্ত্রীর জন্য নয়, বরং স্ত্রী শ্রেণির জন্য। শ্রেণিতে যতজন থাকবেন, ওই এক অংশই তাঁদের মধ্যে ভাগ হবে। ঠিক একই কারণে একাধিক মেয়ে থাকলেও তাঁরা মিলে ২/৩ পান, প্রত্যেকে আলাদা ২/৩ নয়।

মৌলিক নিয়মটি একজন স্ত্রীর ক্ষেত্রে যেমন, এখানেও তেমনই থাকে — শুধু ভাগকারীর সংখ্যা বদলায়। এক স্ত্রীর ক্ষেত্রে অংশ কীভাবে ঠিক হয় তা বিস্তারিত দেখুন স্বামী মারা গেলে স্ত্রী কত অংশ পাবেন লেখায়।

মূল নিয়ম দুই লাইনে

অবস্থাসব স্ত্রী মিলে২ স্ত্রী হলে প্রত্যেকে৩ স্ত্রী হলে প্রত্যেকে৪ স্ত্রী হলে প্রত্যেকে
মৃত ব্যক্তির সন্তান বা পুত্রের সন্তান আছে১/৮ (১২.৫%)১/১৬ (৬.২৫%)১/২৪ (৪.১৭%)১/৩২ (৩.১৩%)
কোনো সন্তান নেই১/৪ (২৫%)১/৮ (১২.৫%)১/১২ (৮.৩৩%)১/১৬ (৬.২৫%)

এখানে "সন্তান" মানে শুধু ছেলে নয় — এক মেয়ে থাকলেও স্ত্রীদের অংশ ১/৪ থেকে নেমে ১/৮ হয়ে যাবে। পুত্রের ছেলে বা মেয়ে (নাতি-নাতনি) থাকলেও একই ফল।

উদাহরণ ১: ২ স্ত্রী, ২ ছেলে ও ১ মেয়ে — সম্পত্তি ৮০ লাখ টাকা

ধরা যাক করিম সাহেব মারা গেছেন। তাঁর দুই স্ত্রী জীবিত, প্রথম স্ত্রীর ঘরে দুই ছেলে এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে এক মেয়ে। দাফন-কাফন ও ঋণ পরিশোধের পর বণ্টনযোগ্য সম্পত্তি ৮০,০০,০০০ টাকা।

ধাপ ১ — সন্তান আছেন, তাই স্ত্রীদের মোট অংশ ১/৮। ৮০ লাখের ১/৮ = ১০,০০,০০০ টাকা। এটি দুজনে সমান ভাগ করবেন, অর্থাৎ প্রত্যেকে ৫,০০,০০০ টাকা বা মোট সম্পত্তির ১/১৬ অংশ।

ধাপ ২ — অবশিষ্ট ৭/৮ অংশ, অর্থাৎ ৭০,০০,০০০ টাকা সন্তানদের মধ্যে ভাগ হবে। ছেলে মেয়ের দ্বিগুণ পাবেন, তাই ভাগের একক দাঁড়ায় ২ + ২ + ১ = ৫। এক এককের মান ৭০,০০,০০০ ÷ ৫ = ১৪,০০,০০০ টাকা।

ওয়ারিশভিত্তিঅংশ৮০ লাখ টাকায়
প্রথম স্ত্রীনির্দিষ্ট ১/৮-এর অর্ধেক৫/৮০৫,০০,০০০
দ্বিতীয় স্ত্রীনির্দিষ্ট ১/৮-এর অর্ধেক৫/৮০৫,০০,০০০
প্রথম ছেলেআসাবা — ২ একক২৮/৮০২৮,০০,০০০
দ্বিতীয় ছেলেআসাবা — ২ একক২৮/৮০২৮,০০,০০০
মেয়েআসাবা — ১ একক১৪/৮০১৪,০০,০০০
মোট৮০/৮০ = ১৮০,০০,০০০

যোগ করে মিলিয়ে নিন — ভগ্নাংশে ৫ + ৫ + ২৮ + ২৮ + ১৪ = ৮০, অর্থাৎ ৮০/৮০ = ১। আর টাকায় ৫ + ৫ + ২৮ + ২৮ + ১৪ = ৮০ লাখ। দুটোই মিলে গেলে বুঝবেন হিসাব ঠিক আছে।

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় — মেয়েটি দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান হলেও ছেলেদের সঙ্গে একই নিয়মে ভাগ পাচ্ছেন। কোন স্ত্রীর গর্ভে জন্ম, তা সন্তানের অংশে কোনো প্রভাব ফেলে না। ছেলে ও মেয়ের মধ্যে এই ২ঃ১ অনুপাতের পেছনের যুক্তি জানতে পড়ুন ছেলে ও মেয়ের অংশ ২ঃ১ কেন

উদাহরণ ২: ৪ স্ত্রী ও ১ ছেলে — সম্পত্তি ৯৬ লাখ টাকা

এবার এমন একটি পরিবার ধরুন যেখানে মৃত ব্যক্তির চারজন স্ত্রী এবং একটিমাত্র ছেলে আছেন। বণ্টনযোগ্য সম্পত্তি ৯৬,০০,০০০ টাকা।

সন্তান থাকায় চার স্ত্রী মিলে পাবেন ১/৮ = ১২,০০,০০০ টাকা। এটি চারজনে ভাগ করলে প্রত্যেকে পাবেন ৩,০০,০০০ টাকা, অর্থাৎ মোট সম্পত্তির মাত্র ১/৩২ অংশ। অবশিষ্ট ৭/৮ = ৮৪,০০,০০০ টাকা একমাত্র ছেলে আসাবা হিসেবে পাবেন।

মিলিয়ে দেখুন: ৩ + ৩ + ৩ + ৩ + ৮৪ = ৯৬ লাখ টাকা। ভগ্নাংশে ১/৩২ × ৪ + ৭/৮ = ৪/৩২ + ২৮/৩২ = ৩২/৩২ = ১।

আপনার পরিবারের হিসাব নিজে করে দেখুন

স্ত্রীর সংখ্যা, সন্তান, বাবা-মা ও অন্য ওয়ারিশদের তথ্য দিন — মুহূর্তেই পাবেন প্রত্যেকের অংশ, টাকার হিসাব ও প্রিন্টযোগ্য রিপোর্ট।

ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →

উদাহরণ ৩: ৩ স্ত্রী, বাবা ও মা — সন্তান নেই, সম্পত্তি ২৪ লাখ টাকা

মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান নেই, কিন্তু তিন স্ত্রী এবং বাবা-মা দুজনই জীবিত। সম্পত্তি ২৪,০০,০০০ টাকা।

সন্তান না থাকায় স্ত্রীদের মোট অংশ এবার দ্বিগুণ — ১/৪ = ৬,০০,০০০ টাকা। তিনজনে ভাগ করলে প্রত্যেকে ২,০০,০০০ টাকা, অর্থাৎ ১/১২ অংশ।

এরপর একটি বিশেষ নিয়ম কাজ করে, যার নাম উমারিয়্যা মাসআলা। স্ত্রী ও বাবা একসাথে থাকলে এবং সন্তান বা ভাই-বোন না থাকলে মা পুরো সম্পত্তির ১/৩ পান না; বরং স্ত্রীদের অংশ বাদ দেওয়ার পর যা থাকে তার ১/৩ পান। এখানে অবশিষ্ট ১৮,০০,০০০ টাকার ১/৩ = ৬,০০,০০০ টাকা মায়ের। বাকি ১২,০০,০০০ টাকা বাবা আসাবা হিসেবে নেবেন।

ওয়ারিশভিত্তিঅংশ২৪ লাখ টাকায়
তিন স্ত্রী (মোট)নির্দিষ্ট ১/৪৩/১২৬,০০,০০০
মাঅবশিষ্টের ১/৩ (উমারিয়্যা)৩/১২৬,০০,০০০
বাবাআসাবা — অবশিষ্ট৬/১২১২,০০,০০০
মোট১২/১২২৪,০০,০০০

মায়ের এই বিশেষ হিসাবের কারণেই নিঃসন্তান পরিবারের বণ্টন আলাদা হয়ে যায়। পুরো চিত্রটি দেখতে পড়ুন নিঃসন্তান দম্পতির সম্পত্তি কে পাবে

দেনমোহর — উত্তরাধিকারের সঙ্গে মেলাবেন না

এটি একাধিক স্ত্রীর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গোলমাল করে। মনে রাখুন:

  • অপরিশোধিত দেনমোহর ঋণ — উত্তরাধিকার নয়। তাই তা বণ্টনের আগেই পুরো সম্পত্তি থেকে শোধ হবে।
  • প্রত্যেক স্ত্রীর দেনমোহর আলাদা এবং যাঁর যতটুকু বাকি তিনি ততটুকুই পাবেন। এটি ভাগ হয় না।
  • দেনমোহর পাওয়ার পরেও প্রত্যেক স্ত্রী তাঁর উত্তরাধিকারের অংশ আলাদাভাবে পাবেন — একটি অন্যটি থেকে কাটা যাবে না।
  • ঋণ ও দেনমোহর শোধের পর আসে ওসিয়ত, তারপর ওয়ারিশদের ভাগ। ক্রমটি জানতে দেখুন মৃত ব্যক্তির ঋণ থাকলে সম্পত্তি কীভাবে ভাগ হবে

যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়

  • প্রত্যেক স্ত্রীকে আলাদা ১/৮ দেওয়া। দুই স্ত্রী থাকলে ২/৮ নয়, মোট ১/৮-ই। এই ভুলে সন্তানদের অংশ কমে যায়।
  • যে স্ত্রীর সন্তান বেশি তাঁকে বেশি দেওয়া। স্ত্রীদের ভাগ সবসময় সমান — সন্তানসংখ্যার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
  • নিঃসন্তান স্ত্রীকে ১/৪ থেকে ভাগ দেওয়া, অথচ অন্য স্ত্রীর সন্তান আছে। মৃত ব্যক্তির যেকোনো সন্তান থাকলে সব স্ত্রীর হিসাবই ১/৮-এর ভিত্তিতে হবে।
  • দেনমোহর অংশের ভেতর থেকে কাটা। দেনমোহর আগে ঋণ হিসেবে শোধ হয়, তারপর ভাগ শুরু হয়।
  • স্বামীর আগে মারা যাওয়া স্ত্রীকে ওয়ারিশ ধরা। মৃত্যুর মুহূর্তে যিনি জীবিত ছিলেন না, তিনি ওয়ারিশ নন। তবে তাঁর সন্তানেরা পূর্ণ ওয়ারিশ।
  • স্ত্রীর নিজের সম্পত্তি স্বামীর সম্পত্তির সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা। স্ত্রীর নিজের নামের জমি, গয়না বা আয় তাঁরই থাকে; তা পরে মায়ের সম্পত্তি বণ্টনের নিয়মে ভাগ হবে।

মতভেদ কোথায়

স্ত্রীদের মোট অংশ ১/৮ বা ১/৪ এবং তা সমান ভাগ হওয়া — এ নিয়ে চার মাযহাবের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। মতভেদ দেখা যায় পাশের কয়েকটি প্রশ্নে:

  • তালাক দেওয়ার পর স্ত্রী ওয়ারিশ থাকেন কি না — তালাকের ধরন ও ইদ্দতের অবস্থার উপর তা নির্ভর করে, এবং মাযহাবভেদে বিধান আলাদা। বিস্তারিত দেখুন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী কি সম্পত্তি পাবেন
  • বিবাহের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে — সাক্ষী, নিবন্ধন বা অন্য কোনো কারণে বিবাহের বৈধতা নিয়ে বিরোধ থাকলে ওয়ারিশ স্বীকৃতির বিষয়টি আলেম ও আদালতের সিদ্ধান্তের উপর যায়। এখানে স্বয়ংক্রিয় কোনো সূত্র প্রয়োগ করা যায় না।
  • কাফনের খরচ স্বামীর দায়িত্ব কি না — স্ত্রীর দাফন-কাফনের খরচ স্বামী দেবেন, নাকি স্ত্রীর নিজের সম্পত্তি থেকে যাবে, এ নিয়ে হানাফি ফিকহের ভেতরেই দুই মত আছে। দেখুন দাফন-কাফনের খরচ কে দেবে

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি ব্যবহারিক পরামর্শ

একাধিক স্ত্রীর পরিবারে ওয়ারিশান সনদ ও নামজারির সময় সবচেয়ে বেশি জটিলতা হয় দুটি কারণে — বিবাহের প্রমাণপত্র (কাবিননামা) না থাকা, এবং কোন সন্তান কোন স্ত্রীর তা নিয়ে বিভ্রান্তি। বণ্টনের আগে প্রত্যেক স্ত্রীর কাবিননামা, প্রত্যেক সন্তানের জন্মনিবন্ধন এবং মৃত ব্যক্তির মৃত্যুসনদ সংগ্রহ করে রাখুন। কাগজ ঠিক থাকলে হিসাবটি খুব সহজ — জটিলতা তৈরি হয় কাগজের অভাবে, নিয়মের কারণে নয়।

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

না। স্ত্রীর সংখ্যা অংশের পরিমাণ বদলায় না। সন্তান থাকলে সব স্ত্রী মিলে মোট ১/৮ এবং সন্তান না থাকলে মোট ১/৪ পাবেন — দুইজন হোক বা চারজন। ওই মোট অংশটিই তাঁদের মধ্যে সমান ভাগ হবে।
সমান পাবেন। কার কত সন্তান, কে আগে বিয়ে হয়েছেন, কে কত বছর সংসার করেছেন — ফারায়েজে এর কোনোটিই অংশ কমায় বা বাড়ায় না। মোট অংশকে স্ত্রীর সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলেই প্রত্যেকের ভাগ পাওয়া যায়।
অংশ আলাদা হবে না, তবে দুজনেরই অংশ কমে যাবে। মৃত ব্যক্তির যেকোনো সন্তান — যে স্ত্রীর গর্ভেই হোক — থাকলেই স্ত্রীদের মোট অংশ ১/৪ থেকে নেমে ১/৮ হয়। নিঃসন্তান স্ত্রীও তখন ওই ১/৮ থেকেই সমান ভাগ পাবেন।
না। দেনমোহর প্রত্যেক স্ত্রীর নিজস্ব পাওনা এবং তা উত্তরাধিকার নয়, ঋণ। প্রত্যেকের অপরিশোধিত দেনমোহর আলাদাভাবে পুরো সম্পত্তি থেকে পরিশোধ হবে, তারপর অবশিষ্ট সম্পত্তি থেকে বণ্টন শুরু হবে।
ওয়ারিশ হওয়ার শর্ত হলো মৃত্যুর মুহূর্তে জীবিত থাকা। স্বামীর আগে যে স্ত্রী মারা গেছেন তিনি ওয়ারিশ নন, তাই পুরো ১/৮ বা ১/৪ জীবিত স্ত্রীই একা পাবেন। তবে মৃত স্ত্রীর সন্তানেরা বাবার সম্পত্তিতে পূর্ণ ওয়ারিশ থাকেন।
ইসলামে একসাথে সর্বোচ্চ চারজন স্ত্রী রাখা যায়। এর বেশি বা শরীয়াহসম্মতভাবে অবৈধ কোনো বিবাহের ক্ষেত্রে ওয়ারিশ স্বীকৃতি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয় এবং তা আদালত ও আলেমের সিদ্ধান্তের বিষয়। এমন অবস্থায় নিজে হিসাব না করে পরামর্শ নিন।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। প্রতিটি পরিবারের অবস্থা আলাদা এবং ছোট একটি তথ্যেও ফলাফল বদলে যেতে পারে। চূড়ান্ত বণ্টনের আগে একজন বিজ্ঞ আলেম ও অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিন।