প্রশ্নটি সাধারণত এভাবে আসে — “আমার বোন মারা গেছেন, তাঁর জমি ও টাকা এখন কে পাবে?” উত্তরটি বোনের নিজের পরিবারের গঠনের উপর নির্ভর করে, এবং অনেকের ধারণার চেয়ে ভিন্ন হয়। একটি কথা গোড়াতেই পরিষ্কার হওয়া দরকার: মৃত মহিলার সম্পত্তির হিসাব পুরুষের মতোই একই নিয়মে হয় — আলাদা কোনো নিয়ম নেই।

প্রথমে দেখতে হয় তাঁর নিজের ঘরে কে আছেন

ফারায়েজে ওয়ারিশের একটি ক্রম আছে। বোনের সম্পত্তিতে ভাই-বোনেরা সবার শেষে আসেন — তাঁর নিজের স্বামী, সন্তান ও মা-বাবার হিসাব আগে হয়।

মৃত বোনের যা আছেভাই-বোনেরা কী পাবেন
ছেলে আছেকিছুই পাবেন না — পুত্র সবাইকে সরিয়ে দেন
পিতা জীবিত আছেনকিছুই পাবেন না — পিতাও ভাই-বোনদের সরিয়ে দেন
শুধু মেয়ে আছে, ছেলে নেইমেয়েদের অংশের পর অবশিষ্টটুকু পাবেন
সন্তান নেই, পিতাও নেইউল্লেখযোগ্য অংশ পাবেন

অর্থাৎ ভাই-বোনদের প্রশ্নটি ওঠে তখনই, যখন মৃত বোনের পুত্র নেই এবং পিতাও নেই।

অবিবাহিত বোন, সন্তান নেই

এটিই সবচেয়ে সাধারণ পরিস্থিতি — অবিবাহিত বোন মারা গেলেন, পিতা আগেই মারা গেছেন, মাতা জীবিত। ভাই ও বোনেরা আছেন। ধরুন দুই ভাই ও এক বোন:

মাতা নির্দিষ্ট অংশ হিসেবে ১/৬ পাচ্ছেন (দুই বা তার বেশি ভাই-বোন থাকায় ১/৩ থেকে কমে গেছে)। অবশিষ্টটুকু ভাই-বোনদের মধ্যে ২ঃ১ অনুপাতে ভাগ হচ্ছে — ভাইরা আসাবা হিসেবে।

মা-বাবা কেউ নেই, শুধু ভাই-বোন

দুই ভাই ও তিন বোন, সম্পত্তি ২৪ লাখ টাকা। পুরোটাই ভাই-বোনদের মধ্যে ২ঃ১ অনুপাতে ভাগ হয়:

শুধু বোনেরা আছেন, কোনো ভাই নেই

দুই বোন থাকলে তাঁদের নির্দিষ্ট অংশ ২/৩। কিন্তু অবশিষ্ট ১/৩ নেওয়ার মতো কোনো আসাবা না থাকলে রদের নিয়মে পুরোটাই তাঁদের হয়ে যায়:

এখানে দুই বোন মিলে পুরো সম্পত্তি পাচ্ছেন — জনপ্রতি অর্ধেক। তবে মৃত বোনের চাচা, ভাতিজা বা অন্য কোনো আসাবা জীবিত থাকলে হিসাব ভিন্ন হবে, কারণ তখন অবশিষ্টটুকু সেই আসাবা পাবেন এবং রদ প্রয়োগ হবে না।

বিবাহিত বোন — স্বামী ও সন্তান থাকলে

বিবাহিত বোন মারা গেলে তাঁর স্বামী ওয়ারিশ হন — সন্তান থাকলে ১/৪, সন্তান না থাকলে ১/২। সন্তানরা সবার আগে আসেন।

স্বামী, এক মেয়ে ও এক ভাই

মেয়ে থাকলেও ভাই বাদ পড়েন না — কন্যা পুত্রের মতো সবাইকে সরাতে পারেন না। সম্পত্তি ২৪ লাখ টাকা:

স্বামী ১/৪, কন্যা ১/২ — অবশিষ্ট ১/৪ ভাই আসাবা হিসেবে পাচ্ছেন। মৃত বোনের একটি ছেলে থাকলে ভাই এই ১/৪-ও পেতেন না।

স্বামী আছেন, সন্তান নেই

স্বামী সন্তান না থাকায় ১/২ পাচ্ছেন। অবশিষ্ট ১/২ ভাই-বোনদের মধ্যে ২ঃ১ অনুপাতে ভাগ হচ্ছে।

মৃত বোনের নিজের সম্পত্তি বলতে কী বোঝায়

অনেক পরিবারে ধরে নেওয়া হয় মেয়ের তো নিজের কিছু নেই। বাস্তবে একজন মহিলার নিজের সম্পত্তি একাধিক পথে তৈরি হয়:

  • বাবার সম্পত্তি থেকে পাওয়া অংশ — নামজারি হয়ে থাকুক বা না থাকুক, অধিকার আইন থেকেই এসেছে।
  • দেনমোহর — নগদ বা স্বর্ণ, পরিশোধিত হোক বা অপরিশোধিত।
  • স্বামী বা অন্য কারো দেওয়া উপহার ও হেবা, যার মালিকানা তাঁকে দেওয়া হয়েছিল।
  • নিজের আয়, সঞ্চয়, ব্যাংকের টাকা ও নিজের কেনা জিনিস।
  • বাবার বাড়ি থেকে পাওয়া স্বর্ণালংকার।
অপরিশোধিত দেনমোহরও তাঁর সম্পত্তির অংশ। বোন মারা গেলে স্বামীর কাছে পাওনা দেনমোহর মুছে যায় না — সেটি তাঁর তরিকায় যোগ হয় এবং তাঁর ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় — স্বামী নিজেও সেই ওয়ারিশদের একজন।

বাবার সম্পত্তি ভাগ হওয়ার আগেই বোন মারা গেলে

এটি খুব সাধারণ একটি জটিলতা। বাবার সম্পত্তি কাগজে-কলমে ভাগ হয়নি, কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর বোনও মারা গেছেন। এই ক্ষেত্রে বোনের অংশটি মুছে যায় না — কারণ বাবার মৃত্যুর মুহূর্তেই সেই অংশ তাঁর হয়ে গিয়েছিল। এখন সেই অংশটি তাঁর নিজের ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ হবে।

দুটি আলাদা হিসাব করতে হয়: প্রথমে বাবার সম্পত্তিতে বোনের অংশটি কত, সেটি বের করুন। তারপর সেই অংশটিকে আলাদা একটি সম্পত্তি ধরে বোনের নিজের ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ করুন। এক ধাপে হিসাব করার চেষ্টা করলে ভুল হবে।

যেখানে সবচেয়ে বেশি ভুল হয়

  • ভুল ১ — বোন মারা গেলে তাঁর সম্পত্তি স্বাভাবিকভাবেই ভাইদের — এই ধারণা। স্বামী, সন্তান ও মা-বাবার হিসাব আগে হয়।
  • ভুল ২ — বিবাহিত বোনের সম্পত্তি পুরোটাই স্বামীর ভাবা। সন্তান থাকলে স্বামী ১/৪, সন্তান না থাকলে ১/২ — পুরোটা নয়।
  • ভুল ৩ — বাবার সম্পত্তি ভাগ না হওয়ায় বোনের অংশ বাতিল ধরে নেওয়া। অধিকার তৈরি হয় মৃত্যুর মুহূর্তে, কাগজ হওয়ার দিনে নয়।
  • ভুল ৪ — মৃত বোনের গয়না ও দেনমোহর হিসাবের বাইরে রাখা। দুটোই তাঁর সম্পত্তির অংশ।
  • ভুল ৫ — শুধু বোনেরা থাকলে তাঁদের ২/৩ দিয়ে বাকিটা দূরের আত্মীয়কে দেওয়া। আসাবা কেউ জীবিত না থাকলে রদের নিয়মে পুরোটাই বোনেদের।

বোনের সম্পত্তির ভাগ হিসাব করুন

মৃত বোনের স্বামী, সন্তান, মা-বাবা ও ভাই-বোনদের তালিকা দিন — প্রত্যেকের প্রাপ্য অংশ পেয়ে যাবেন।

ফ্রি ক্যালকুলেটর খুলুন →

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

আগে তাঁর নিজের ঘরের ওয়ারিশরা — স্বামী, সন্তান ও মা-বাবা। ভাই-বোনেরা আসেন তখনই, যখন মৃত বোনের পুত্র নেই এবং পিতাও জীবিত নেই।
মা-বাবা ও অন্য নিকটতর ওয়ারিশদের অংশ দেওয়ার পর অবশিষ্টটুকু ভাই-বোনেরা ২ঃ১ অনুপাতে পান। তবে পিতা জীবিত থাকলে ভাই-বোনেরা কিছুই পান না।
না। সন্তান থাকলে স্বামী ১/৪ পান, সন্তান না থাকলে ১/২। বাকিটা সন্তান, মা-বাবা ও প্রয়োজনে ভাই-বোনদের মধ্যে ভাগ হয়।
দুই বা তার বেশি বোনের নির্দিষ্ট অংশ ২/৩। মৃতের চাচা, ভাতিজা বা অন্য কোনো আসাবা জীবিত না থাকলে রদের নিয়মে অবশিষ্ট ১/৩-ও তাঁরা পান, অর্থাৎ পুরো সম্পত্তি।
অংশটি মুছে যায় না — বাবার মৃত্যুর মুহূর্তেই তা তাঁর হয়ে গিয়েছিল। এখন সেই অংশটি তাঁর নিজের ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ হবে। দুটি আলাদা হিসাব করতে হয়।
হ্যাঁ, যদি গয়নার মালিকানা তাঁর ছিল — দেনমোহর, উপহার, বাবার বাড়ি থেকে পাওয়া বা নিজের কেনা। এটি তাঁর তরিকার অংশ এবং তাঁর ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ হবে।

সম্পর্কিত লেখা

বি.দ্র. এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। প্রতিটি পরিবারের অবস্থা আলাদা এবং ছোট একটি তথ্য পুরো হিসাব বদলে দিতে পারে। দলিল, নামজারি বা বণ্টননামার আগে স্থানীয় আলেম ও আইনজীবীর সঙ্গে মিলিয়ে নিন।